সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানুষের জীবনে রিজিক একটি মৌলিক বাস্তবতা। রিজিক মানে কেবল অর্থ-সম্পদ নয়; বরং জীবিকা, সুস্থতা, জ্ঞান, মানসিক প্রশান্তি; সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। কোরআন আমাদের শিখিয়েছে, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা প্রশস্ত করেন, যাকে ইচ্ছা সীমিত করেন।
তবে ইসলাম আমাদের এও শিক্ষা দেয় যে, কিছু আমল এমন আছে, যা আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। রিজিক বৃদ্ধির প্রশ্নটি তাই কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি আধ্যাত্মিক সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
প্রথমত তাকওয়া

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দেবেন” (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)। তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়; বরং সচেতন আনুগত্য।
হারাম থেকে বেঁচে থাকা, হালাল উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকা, গোপন ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে স্মরণ করা—এসবই তাকওয়ার অংশ। যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে, আল্লাহ তার জন্য এমন দরজা খুলে দেন, যা সে কল্পনাও করেনি।
দ্বিতীয়ত তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা
সুরা তালাকে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট” (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)। তাওয়াক্কুল মানে কর্মবিমুখতা নয়।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন; উটকে বেঁধে তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে। অর্থাৎ চেষ্টা ও পরিকল্পনার সঙ্গে অন্তরের নির্ভরতা একমাত্র আল্লাহর ওপর রাখা। যে ব্যক্তি এ ভারসাম্য বজায় রাখে, তার হৃদয় দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয় এবং আল্লাহ তার কাজ সহজ করে দেন।
তৃতীয়ত দান-সদকা:
আল্লাহ বলেন, “কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন” (সুরা বাকারা , আয়াত : ২৪৫)। দান কখনও সম্পদ কমায় না; বরং বরকত আনে।
হাদিসে এসেছে, সদকা সম্পদ হ্রাস করে না (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বিরর ওয়াস্ সিলা ওয়াল আদাব, হাদিস : ২৫৮৮)। মানুষের দৃষ্টিতে যা কমে যায়, আল্লাহর কাছে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। দান মানুষের অন্তরকে প্রশস্ত করে, লোভ কমায় এবং সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা গড়ে তোলে—যা সামগ্রিক কল্যাণের পথ খুলে দেয়।
চতুর্থত কৃতজ্ঞতা
আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব” (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৭)। কৃতজ্ঞতা কেবল মুখের শব্দ নয়; বরং নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার। চোখের শুকরিয়া হলো ভালো কাজে তা ব্যবহার করা, সম্পদের শুকরিয়া হলো বৈধ পথে ব্যয় করা। যে বান্দা প্রাপ্তির স্বীকৃতি দেয়, তার জীবনে বরকত বাড়ে।
পঞ্চমত ইস্তিগফার:
সুরা নূহে নবী নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর কওমকে বলেছেন, “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর অজস্র বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন…” (সুরা নুহ, আয়াত : ১০-১২)। ইস্তিগফার গুনাহ মুছে দেয়, আর গুনাহই অনেক সময় বরকত হ্রাসের কারণ হয়। অন্তরের পাপ দূর হলে রিজিকের পথও প্রশস্ত হয়।
ষষ্ঠত আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে কামনা করে তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে” (বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)। পারিবারিক সম্পর্ক কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ইবাদতও বটে। সম্পর্ক রক্ষা সমাজে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে, যা বাস্তব জীবনেও কল্যাণ বয়ে আনে।
রিজিক বৃদ্ধির প্রসঙ্গে একটি কথা সতর্কতার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য। কখনও কখনও কিছু নির্দিষ্ট সুরা পাঠকে সরাসরি রিজিক বৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে প্রচার করা হয়। কোরআনুল কারীম অবশ্যই বরকতের উৎস এবং নিয়মিত তিলাওয়াত অন্তরে প্রশান্তি আনে। তবে নির্দিষ্ট সময় ধরে কোনো সুরা পাঠ করলে রিজিক বৃদ্ধি হবে—এ মর্মে সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদিস নেই। তাই আমলের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ দলিলের ওপর নির্ভর করাই উত্তম।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, রিজিকের প্রকৃত প্রশস্ততা কেবল অঙ্কের বৃদ্ধি নয়; বরং বরকত। অনেকের সম্পদ কম, কিন্তু তাতে শান্তি আছে। আবার কারও সম্পদ বেশি, কিন্তু তাতে অশান্তি। আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া, হালাল উপার্জন, নৈতিক জীবনযাপন—এসবই রিযিককে অর্থবহ করে তোলে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, কৃতজ্ঞতা, দান ও ইস্তিগফারের জীবন দান করুন এবং আমাদের রিযিকে বরকত দিন। আমীন।
লেখক: শিক্ষিকা, এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, নারায়ণগঞ্জ।









