অর্থ ও বাণিজ্য

‘কালো টাকা সাদা’ করার সুযোগ

নিউজ ডেস্ক১৪ জুন ২০১৯৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকাকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনে কালো টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। এক্ষেত্রে মাত্র ১০ শতাংশ আয়কর দিলে অর্থের উৎস সম্পর্কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো প্রশ্ন করবে না।

২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এ সুযোগ বহাল থাকবে। অর্থ আইনের মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ে কালো টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। নির্ধারিত হারে ট্যাক্স পরিশোধ করলে, সে টাকার উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে না সরকার।

ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে কয়েক বছর ধরে খরা থাকলেও সরকার আশা করছে, এ সুযোগ দেয়া হলে দেশ থেকে অর্থ পাচার কমবে এবং উদ্যোক্তারা স্থানীয় শিল্প স্থাপনে আরও উৎসাহিত হবেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে দুটি নিয়ম চালু আছে।

প্রথমত, আয়কর অধ্যাদেশের ১৯ই ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত করের অতিরিক্ত জরিমানা দিয়ে যে কোনো খাতের কালো টাকা বিনিয়োগ করা যায়। দ্বিতীয়ত, আয়কর অধ্যাদেশের ১৯বিবিবিবিবি অনুযায়ী, প্লট-ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের জন্য নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ২০০৩-০৪ অর্থবছরের বাজেটে প্রচলিত আয়কর অধ্যাদেশের ধারা ১৯(এএএ) অনুযায়ী নির্ধারিত কর দিয়ে প্রথমবারের মতো ২ বছরের জন্য যে কোনো শিল্পে কালো টাকা বিনিয়োগ করে সাদা করার সুযোগ দেন।

অবশ্য নানা সমালোচনা ও বির্তকের পরিপ্রেক্ষিতে পরে এ সুযোগ বাতিল করা হয়। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পর বিদ্যমান আইনের সেই ধারা পুনরুজ্জীবিত করে আবারও সুযোগ দিল বর্তমান সরকার।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনে অপ্রদর্শিত আয় থেকে বিনিয়োগ করা অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিলে ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে আয়কর বিভাগ থেকে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে না।

১১ জুন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের পরিপন্থী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে- ঘুষ, অনুপার্জিত আয়, কালো টাকা, পেশিশক্তির মাধ্যমে উপার্জন করা, সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে। তাই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হলে তা আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ব্যত্যয় ঘটবে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া উচিত হবে না বলে মনে করি।

অবকাঠামো ও শিল্প স্থাপনে কর অবকাশ : প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্প স্থাপনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্প স্থাপনের জন্য আলাদা হারে কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হয়েছে।

আবাসন খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ : প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসিক প্রয়োজনে বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ে কালো টাকা বিনিয়োগ সহজতর করা হয়েছে। নির্ধারিত হারে ট্যাক্স পরিশোধ করলে বিনিয়োগ করা টাকার উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে না সরকার।

কালো টাকা বিনিয়োগ করে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, দিলকুশা এলাকায় প্রতি ২০০ বর্গমিটার আয়তনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটার ফ্ল্যাটের কর ৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর ২০০ বর্গমিটারের অধিক আয়তনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের কর ৭ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর প্রতি বর্গমিটার জমির ক্ষেত্রে ১৫ হাজার টাকা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে।

আর ঢাকা মহানগরীর ধানমণ্ডি, ডিওএইচএস, মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, সেগুনবাগিচা, নিকুঞ্জ এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকার ২০০ বর্গমিটার আয়তনের প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের কর ৪ হাজার টাকার স্থলে ৩ হাজার টাকা করা হয়েছে।

২০০ বর্গমিটারের অধিক আয়তনের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটার ফ্ল্যাটের কর ৫ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। প্রতি বর্গমিটার জমির ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে।

উল্লিখিত এলাকা ব্যতীত ঢাকা, চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অন্যান্য এলাকা এবং অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রতি ২০০ বর্গমিটার আয়তনের মধ্যে প্রতি বর্গমিটার ফ্ল্যাটের কর ২ হাজার টাকার স্থলে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর ২০০ বর্গমিটারের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গমিটারের কর ৩ হাজার টাকার স্থলে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। প্রতি বর্গমিটার জমির ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে।

জেলা সদরে অবস্থিত পৌরসভার ২০০ বর্গমিটার আয়তনের প্রতি বর্গমিটার ফ্ল্যাটের ট্যাক্স ১ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে। আর ২০০ বর্গমিটারের অধিক আয়তনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের ট্যাক্স ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। আর প্রতি বর্গমিটার জমির ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে।

এসব এলাকার বাইরের অন্য এলাকার ক্ষেত্রে ২০০ বর্গমিটার আয়তনের ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গমিটারের ট্যাক্স ৭০০ টাকার পরিবর্তে ৩০০ টাকা করা হয়েছে। ২০০ বর্গমিটারের বেশি প্রতি বর্গমিটার ফ্ল্যাটের ট্যাক্স ১ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে। আর প্রতি বর্গমিটার জমির ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে আবাসন খাত : এসব প্রস্তাবনা চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাত মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আবাসন খাতের মন্দাবস্থা কাটাতে স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি কমিয়ে আনা হবে। কেননা, স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি বেশি হওয়ায় দেশের আবাসন খাত বিকশিত হচ্ছে না।

তিনি বলেন, স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি বেশি হওয়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে কালো টাকার পরিমাণ বাড়ছে। নতুন বাজেটে এ দুটি খাতের ট্যাক্স কমিয়ে দিলে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি কালো টাকার পরিমাণও কমবে। এ উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা- ‘সবার জন্য আবাসন কেউ থাকবে না গৃহহীন’ বাস্তবায়ন সহজতর করবে।

এ প্রসঙ্গে আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট কামাল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, ‘এবারের বাজেটে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়ন ঘটেছে। কালো টাকা বিনিয়োগের বিশেষ সুবিধা, স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো হলে এ খাতের দীর্ঘদিনের মন্দাবস্থা কেটে যাবে। এবারের বাজেটে আবাসন খাতের সমস্যা সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।’

ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের বর্তমান ট্যাক্স : বর্তমানে ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট রেজিস্ট্রেশনে পাঁচটি খাতে ১৪-১৬ ভাগ ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- গেইন ট্যাক্স-৪ ভাগ, স্ট্যাম্প ডিউটি ৩ ভাগ, রেজিস্ট্রেশন ২ ভাগ, স্থানীয় সরকার কর ২ ভাগ এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ৩-৪.৫ ভাগ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্ট্যাম্প ডিউটি এবং রেজিস্ট্রেশ ফি কমানোর কথা বলা হয়েছে। তবে কত ভাগ কমানো হবে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।