তথ্যপ্রযুক্তি

ঈশ্বরকে অস্বীকার করতেন হকিং, দেখিয়েছিলেন মানুষ কীভাবে সর্বশক্তিমান হতে পারে

নিউজ ডেস্ক১৫ মার্চ ২০১৮৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

এক জীবনে ঠিক কতখানি বাঁচা যায়? কতদূর ছড়িয়ে দেওয়া যায় জ্ঞান ও প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য? প্রেরণা হয়ে ওঠা যায় লক্ষ মানুষের, জীবনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে?

একটা ফটো, খুব চেনা, হুইলচেয়ারে বসে রয়েছেন মাথা হেলিয়ে, ঈষৎ উন্মুক্ত অধরোষ্ঠ— শুধু মাত্র এই ছবিটা দেখেই লড়াইয়ে থেকে গিয়েছেন অজস্র মানুষ।

আজ চলে গেলেন। অদ্ভুত সমাপতন, এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন আর এক দিকপাল। মানবসভ্যতার অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী ও দার্শনিক অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। ঘটনাচক্রে আজ ‘পাই দিবস’ও বটে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কিছু বিশেষ গাণিতিক সমীকরণের তাত্ত্বিক সমাধান থেকে পাওয়া যায় কৃষ্ণ গহ্বরের  ধারণা।
কৃষ্ণগহ্বর (ব্ল্যাক হোল) এক অতি আশ্চর্য মহাজাগতিক খাদক। মহাকালের মতো গিলে নেয় যাবতীয় বস্তুকে। বস্তু ও তথ্যের এই একমুখী স্রোত আর কখনওই ফিরে আসতে পারে না কৃষ্ণগহ্বরকে কার্যত ঘিরে রাখা এক আবরণ পেরোলে,  পোশাকি ভাষায় যার নাম ‘ইভেন্ট হরাইজন’। তাদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যায় বহির্জগৎ থেকে। ফেরার কোনও রাস্তা নেই। মনে পড়ে বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ‘মধ্যরাতের হল্ট’-এ কথা। কবি লিখেছিলেন— হারিয়ে যাওয়ার তীব্র আর্তি এক:

এখানে গভীর রাত, এখানে সবাই গভীর ঘুমিয়ে আছে…
এখানে চাকার শব্দ চিরতরে থেমে গেছে,
শেষ ট্রেন চলে গেছে, অমিতাভ তাহলে আমার
কি উপায় হবে বল! তুই বল – তাহলে কখনও আর কোনওদিন তোদের ওখানে
ফেরার উপায় নেই? পথ নেই?
আর কোনো পথ নেই।
এখানে গভীর রাত, এখানে এখন খুব রাত।

কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রয়োগ করে হকিং দেখালেন ঠিক ততটা অন্ধকার বোধহয় নয় কৃষ্ণগহ্বর। কালের গর্ভে বেমালুম হারিয়ে যাওয়াই বস্তু ও শক্তির একমাত্র ভবিতব্য নাও হতে পারে। ইভেন্ট হরাইজনের সন্নিহিত অতি জটিল চরিত্রের স্পেস-টাইম থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বিশেষ ধরনের বিকিরণ, যা পরে পরিচিতি পায় হকিং রেডিয়েশন নামে। ১৯৭৪ সালে নেচার পত্রিকা এবং ১৯৭৫-এ ‘কম্যুনিকেশন ইন ম্যাথামেটিক্যাল ফিজিক্স’এ দুটি অতি বিখ্যাত, প্রায় উপকথা হয়ে যাওয়া গবেষণাপত্রে হকিং তাঁর এই বিষয়ে আবিষ্কারের কথা জনসমক্ষে আনেন।

তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায়, প্রধানত সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, মহাকাশবিজ্ঞান এবং সৃষ্টিতত্ত্বে (কসমোলজি) অজস্র মৌল অবদান তাঁর, কিন্তু এই হকিং রেডিয়েশনের মাধ্যমেই তিনি সাধারণ্যে সবচেয়ে পরিচিত, তাঁর সবথেকে পপুলার থিয়োরি বোধহয় এটাই। তবে এ প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ করা উচিত আর একজনের কথা।  জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক ইয়াকভ বেকেনস্টাইন, কৃষ্ণগহবরের এনট্রপির ওপর যাঁর মৌলিক গবেষণার বিশেষ অবদান আছে হকিং রেডিয়েশনের এর তত্ত্ব আবিস্কারের পেছনে।

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৪২, ইংলন্ডের অক্সফোর্ডে। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার আর এক দিকপাল অধ্যাপক ডেনিস সিয়ামার তত্ত্বাবধানে ডক্টরেট করেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে কেমব্রিজেরই লুকাসিয়ান প্রফেসর অফ ম্যাথমেটিক্স-এর পদ আলোকিত করেন ’৭৯ থেকে ’৯৯ এই কুড়ি বছর— যে পদে কিনা একদা আসীন ছিলেন আইজ্যাক নিউটন স্বয়ং! কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল কসমোলোজির অধিকর্তা ছিলেন শেষদিন পর্যন্ত। অজস্র পদক ও সম্মানে ভূষিত, যার সম্পূর্ণ তালিকা স্বল্পপরিসরের এই লেখায় দেওয়া অসম্ভব।

১৯৬৩ সালে, মাত্র একুশ বছর বয়েসে ধরা পরে তিনি এক দুরারোগ্য স্নায়ুরোগে আক্রান্ত – চিকিৎসা পরিভাষায় যার নাম এমিওট্রফিক ল্যাটারাল স্কেরোসিস, বা গে ল্যুরাকস ডিজিজ। সমস্ত শরীর ধীরে ধীরে অবশ এবং অসাড় হয়ে পড়ে তাঁর, শুধু মাত্র গালের কিছু পেশি সক্ষম ছিলো শেষের দিকে, তা লাগানো ছিল বিশেষ প্রযুক্তি তে তৈরি স্পিচ জেনারেটিং ডিভাইস-এর সঙ্গে- যার মাধ্যমে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি কথা বলেছেন। শারীরিক ঘোরাফেরার পরিধি বলতে বিশেষ ভাবে নির্মিত হুইলচেয়ার একটি, কিন্তু প্রকৃত সৃজনশীল মানুষের মনকে সীমাবদ্ধ রাখবে – সে সাধ্য কি অসুখের!

তিনি মহাবিশ্ব সংক্রান্ত জ্ঞানের সাধনা করে গিয়েছেন জীবনের শেষ দিন পৰ্যন্ত এভাবেই। তিনি তাই সাধারণ মানুষের কাছে হিরো, আইকন! কৃষ্ণগহবর কী তা জানার প্রয়োজন নেই, সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বও না, এমনকী পদার্থবিদ্যায় সামান্য জ্ঞান থাকারও দরকার নেই। শুধু দেখার, মানুষ কীভাবে সর্বশক্তিমান হয়ে উঠতে পারে যাবতীয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। আর তাই তিনি দেশ, সমাজ ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে সার্বজনীন রোল মডেল— প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই দেওয়ার।

এবং প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্কতা— যার ভারী অভাব এমনকী বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের মধ্যেও। অলৌকিকত্ব ও ঈশ্বরের অলীক অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছেন একজন প্রকৃত যুক্তিবাদীর মতো। বলেছেন-

We are each free to believe what we want and it is my view that the simplest explanation is there is no God. No one created the universe and no one directs our fate. This leads me to a profound realization. There is probably no heaven, and no afterlife either. We have this one life to appreciate the grand design of the universe, and for that, I am extremely grateful.

শেষ বক্তব্যটিতে জাঁ পল সার্ত্রের ছায়াপাতের চিন্তা দেখি। কত বড় অস্তিত্ববাদী হলে, জীবনকে কতটা ভালবাসলে এরকম কথা বলা যায় তা ভাবতেও রোমাঞ্চ লাগে।

শুধু জ্ঞানের জগতেরই নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার অপূরণীয় ক্ষতি হল এরকম এক ব্যক্তিত্বের চলে যাওয়ায়।