সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
একটি পতাকা এক খণ্ড কাপড় নয়, বরং একটি পতাকা মানে একটি আলাদা স্বাধীন ভূখণ্ড। পতাকা হলো গণমানুষের মর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক। একটি পতাকা মানে একটি শক্তি, একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি। একটি পতাকা মানে একটি আমানত। এটি একটি গুরুদায়িত্বের নাম। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করে সব ধর্মাবলম্বীকে সঙ্গে নিয়ে নতুন একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আধুনিক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি ও সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি যেসব সামরিক অভিযান পরিচালনা করতেন অথবা সামরিক বাহিনী প্রেরণ করতেন, সেগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে পতাকা ব্যবহার করতেন। তিনি সামরিক বাহিনীপ্রধান কিংবা কমান্ডারের হাতে যুদ্ধের পতাকা তুলে দিতেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) হোদায়বিয়ার সন্ধির পর থেকে মক্কা বিজয় (জানুয়ারি ৬৩০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মোট ১৭টি অভিযান পরিচালনা করেন। পতাকার গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.)-এর তিনটি অভিযান উল্লেখযোগ্য।

খায়বার যুদ্ধ
সপ্তম হিজরিতে খায়বার যুদ্ধে যখন মুসলমানরা ইহুদিদের হাতে চরম মার খাচ্ছিল তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কাল আমি পতাকা এমন এক পুরুষের হাতে দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসে এবং যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) ভালোবাসেন।’ সকালে সবাই রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির হলো। প্রত্যেকের ধারণা ছিল যে পতাকা তার হাতে আসবে। এমন সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আলী কোথায়?’ সবাই বলল, চোখের অসুখের কারণে তিনি পেছনে পড়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তার কাছে লোক পাঠাও।’ অতঃপর তাঁকে আনা হলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ মুখের লালা হজরত আলী (রা.)-এর চোখে লাগিয়ে দিলেন এবং তাঁর জন্য সুস্থতার দোয়া করলেন। ফলে তিনি এমনভাবে সুস্থ হলেন যেন এর আগে তাঁর চোখে কোনো অসুখ ছিল না। অতঃপর তাঁর হাতে পতাকা দিয়ে বললেন, ‘ধীরে-সুস্থে এগিয়ে যাও ও তাদের মুখোমুখি অবস্থান নাও।’ (বুখারি : ৪২১০)। এ যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের বিজয় দান করেন।
মুতার যুদ্ধ
অষ্টম হিজরিতে রোমিও সামন্তরাজ মোরাহবিল মুতা নামক স্থানে মুহাম্মদ (সা.) প্রেরিত মুসলিম রাজদূতকে হত্যা করে। মুহাম্মদ (সা.) তখন বাধ্য হয়ে মুতার উদ্দেশে বাহিনী গঠন করেন এবং হজরত জায়েদ বিন হারেসাকে বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করে তাঁর হাতে পতাকা অর্পণ করেন। এরপর ঘোষণা করেন, ‘জায়েদের পর যুদ্ধ পরিচালনা করবে জাফর ইবনে আবু তালেব। তারপর যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা।’ মুতার প্রান্তরে মুসলিম বাহিনী পৌঁছার পর হজরত জায়েদ ইবনে হারেসা পতাকা হাতে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি শহীদ হলে পতাকা গ্রহণ করেন হজরত জাফর ইবনে আবু তালেব। যুদ্ধের তীব্রতা ও শত্রুর আক্রমণে তিনি এক হাত হারিয়ে ফেললে অপর হাতে পতাকা ধরে রাখেন। পরে যখন তাঁর দ্বিতীয় হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখন তিনি দুই পা দিয়ে পতাকা উঁচু করে রাখেন। শত্রুরা তাঁর পা কেটে ফেললে তিনি মুখ দিয়ে কামড় দিয়ে পতাকা সমুন্নত রাখেন। তাঁর চার হাত-পা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তিনি নিজে মাটিতে পড়ে গেছেন; কিন্তু পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি। শত্রুর সর্বশেষ আঘাত যখন তাঁর দেহকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে তখন পরবর্তী কমান্ডার আব্দুল্লাহ পতাকা গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে তৃতীয় কমান্ডার আব্দুল্লাহ শহীদ হয়ে যান। তখন আরেক সাহাবি হজরত সাবেত ইবনে আরকাম নিজে উদ্যোগী হয়ে পতাকা রক্ষায় এগিয়ে আসেন এবং রাসুলের পতাকা উঁচু করে রাখেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর উদ্দেশে বলতে থাকেন, তোমরা তাড়াতাড়ি চতুর্থ কমান্ডার মনোনীত করো। উপস্থিত সাহাবিদের পরামর্শে হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) সেনাধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করে বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন। আল্লাহ তাআলার রহমতে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর হাতে মুতা প্রান্তরে মুসলমানদের অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জিত হয়। (বুখারি, হাদিস : ৪০১৪)
ঐতিহাসিক মুতার যুদ্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় তিনজন সাহাবি জীবন দিয়ে বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে গেছেন কিভাবে নিজেদের পতাকাকে ভূলুণ্ঠিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হয় এবং কিভাবে প্রাণের বিনিময়ে পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে হয়।
মক্কা বিজয়
পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে পতাকা ছিনিয়ে নেওয়ার দৃষ্টান্তও ইসলামের ইতিহাসে রয়েছে। মক্কা বিজয়ের দিন আনসারদের পতাকা ছিল খাজরাজ নেতা সাদ বিন উবাদা (রা.)-এর হাতে। তিনি আবু সুফিয়ানকে শুনিয়ে বলেন, ‘আজ হলো মারপিটের দিন, আজ কাবাকে হালাল করা হবে।’ অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই স্থান অতিক্রম করার সময় আবু সুফিয়ান বলে উঠলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি শুনেছেন সাদ কী বলেছে?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন কী বলেছে? তখন তাঁকে সেই কথা বলা হলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাদ মিথ্যা বলেছে, বরং আজ হলো সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা কাবাকে সম্মানিত করবেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৪২৮০)
তখন হজরত ওসমান ও আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, আমরা সাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নই, হয়তো সে কুরাইশদের মারপিট শুরু করে দেবে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) একজনকে পাঠিয়ে সাদের কাছ থেকে পতাকা নিয়ে তাঁর পুত্র কায়েসকে দিলেন। তবে কারো কারো মতে, পতাকাটি জুবায়ের (রা.)-কে প্রদান করা হয়। (জাদুল মাআদ : ৩/৩৫৬)









