সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
ফেরেশতাজাতির ওপর বিশ্বাস রাখা ঈমানের একটি আবশ্যকীয় অংশ। নুরের তৈরি অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ফেরেশতাজাতি মহান আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টির অপার নিদর্শন। তাঁদের মধ্যেও আল্লাহর নৈকট্য ও দায়িত্বপূর্ণ পদ বিবেচনায় মর্যাদার তারতম্য রয়েছে। জিবরাঈল (আ.) যাঁদের অন্যতম।
নাম ও উপাধি : জিবরাঈল তাঁর প্রসিদ্ধ নাম হলেও পবিত্র কোরআনে আরো বেশ কিছু সম্মানিত উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে এই মহান ফেরেশতাকে। যেমন সুরা শুয়ারার ১৯৫ নম্বর আয়াতে তাঁকে ‘রুহুল আমিন’ অর্থাৎ সৎ-আত্মা উপাধিতে সম্বোধন করা হয়েছে। অনুরূপভাবে সুরা মারিয়ামের ১৯ নম্বর আয়াতে ‘রসুলু রব্বিকি’ তথা তোমার রবের বার্তাবাহক উপাধিতে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ ও জিবরাঈল (আ.) : নবী (সা.) একদা জিবরাঈল (আ.)-কে উদ্দেশ করে বললেন, ভাই জিবরাঈল! আপনি কি আপনার রব মহান আল্লাহকে কখনো দেখেছেন? এ কথা শুনতেই হজরত জিবরাঈল (আ.) চমকে উঠলেন। বললেন, আমি এবং মহান আল্লাহর মাঝে ৭০টি নুরের পর্দা রয়েছে। আমি যদি এর সামান্য কাছেও যাই, পুড়ে ভস্ম হয়ে যাব। (মু’জামুল আওসাত, হাদিস : ৬৪০৭)
প্রিয় নবীজি ও জিবরাঈল (আ.) : সেই ছোট্ট বয়সে যখন নবীজি (সা.) মা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর ঘরের সদস্য হয়ে বনি সাদ গোত্রে অবস্থানরত ছিলেন তখন জিবরাঈল (আ.) তাঁর বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে জমজমের পানি দিয়ে তাঁর পবিত্র আত্মা ধৌত করেন। এই ছিল জিবরাঈল (আ.)-এর সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর প্রথম সাক্ষাৎ। তারপর হেরা পর্বতে অতর্কিত দর্শন। জিবরাঈল (আ.) তিনবার বুকের মাঝে তাঁকে সজোরে জাপটে ধরেন। বিকট আকৃতির অবয়ব আর এমন আচমকা পরিস্থিতির জন্য নবীজি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি কিছুটা হকচকিত হয়ে পড়লেন, তাঁর শরীরে জ্বর চলে এলো। এরপর মহান প্রভুর সান্নিধ্য অর্জনে মিরাজের সফরে জিবরাঈল (আ.) ছিলেন তাঁর একান্ত সফরসঙ্গী। বদরের যুদ্ধে নবীজির পাশাপাশি থেকে যুদ্ধের সঙ্গী ছিলেন। রমজানে একে অপরকে কোরআন খতম করে শোনানোর সঙ্গী। এ ছাড়া পবিত্র কোরআন এবং ওহি নাজিলের স্বার্থে অজস্রবার নবীজির কাছে তিনি আসা-যাওয়া করেছেন। নবীজির বিষণ্নতার সময় সান্ত্বনা দানকারী হিসেবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শদাতা হিসেবে তাঁর বিশেষ স্বীকৃতি রয়েছে।
পবিত্র কোরআন ও জিবরাঈল (আ.) : পবিত্র কোরআনে ‘জিবরাঈল’ নাম উল্লেখপূর্বক সর্বমোট তিনটি উদ্ধৃতি রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উল্লেখপূর্বক পবিত্র কোরআনের বেশ কিছু স্থানে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত জিবরাঈল (আ.)-এর কিছু বৈশিষ্ট্যের বিবরণ নিম্নরূপ—
প্রিয় নবীজির কাছে জিবরাঈল (আ.) : পবিত্র কোরআনের সুরা নাজমের পঞ্চম আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, তাকে (প্রিয় নবীজিকে) কোরআন শিখিয়েছে এক শক্তিশালী ফেরেশতা অর্থাৎ জিবরাঈল (আ.)।
প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী : এ বিষয়টি কোরআনে কয়েক জায়গায় উদ্ধৃত হয়েছে। সর্বোপরি লুত (আ.)-এর জাতিকে ডানায় করে আসমানে উঠিয়ে সেখান থেকে উল্টিয়ে দেওয়ার ঘটনা এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
মহান আল্লাহর বড় নিদর্শনাবলির অন্যতম : পবিত্র কোরআনের সুরা নাজমের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, যখন সে অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.) তার রবের বড় নিদর্শনাবলি থেকে অন্যতম নিদর্শন দেখল। আর তা ছিল জিবরাঈল (আ.)-এর প্রকৃত অবস্থার দর্শন।
ফেরেশতাকুলের অনুসরণীয় : পবিত্র কোরআনের সুরা তাকউইরয়ের ২১ নম্বর আয়াতে জিবরাঈল (আ.)-এর বৈশিষ্ট্যের বর্ণনায় এসেছে যে তিনি ‘মুত্বা’ অর্থাৎ আসমানবাসীদের কাছে একজন অনুসরণীয় ও মান্যবর ব্যক্তিত্ব। অর্থাৎ সবাই তাঁকে মেনে চলে।
বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন : একই আয়াতের শেষাংশে তাঁর অপর একটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ এসেছে যে তিনি নিতান্তই বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন। কেনই বা হবেন না, ওহি তথা পবিত্র কোরআন ও মহান আল্লাহর প্রত্যাদেশগুলো নবীদের কাছে অবতীর্ণ করার জন্য মহান আল্লাহ তো তাঁকেই নির্বাচন করেছিলেন।
হাদিসে জিবরাঈল (আ.) : হজরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম, এমন সময় সাদা ধবধবে কাপড় ও মিশমিশে কালো কেশধারী একজন লোক আমাদের কাছে হাজির হলেন। তাঁর মধ্যে (আগন্তুকের ন্যায়) ভ্রমণের কোনো চিহ্নও দেখা যাচ্ছিল না। অথচ আমাদের মধ্যে কেউ তাঁকে চিনতেও পারল না। স্থানীয় হলে আমরা তাঁকে নিশ্চয়ই চিনতাম। তিনি নবী করিম (সা.)-এর কাছে এসে বসলেন। অতঃপর রাসুল (সা.)-এর দুই জানুর সঙ্গে নিজের দুই জানু মিশিয়ে এবং নিজের দুই হাত তাঁর দুই ঊরুর ওপর রেখে বললেন, হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন, (ইসলাম কী?) রাসুল (সা.) উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর রাসুল—এ ঘোষণা করবে, নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে, রমজানের রোজা রাখবে এবং বায়তুল্লাহয় হজ করবে—যদি তুমি সেখানে পৌঁছতে সমর্থ হও, এটাই হলো ইসলাম।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক বলেছেন।’ তাঁর প্রশ্নোত্তরে আমরা আশ্চর্য বোধ করলাম। (অজ্ঞ লোকের মতো) প্রশ্নও করেছেন আবার (বিজ্ঞের মতো) তার সমর্থনও করছেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে বলুন, ঈমান কাকে বলে?’ হুজুর (সা.) উত্তর করলেন, ‘আল্লাহতে বিশ্বাস করবে এবং তাঁর ফেরেশতাগণে, তাঁর কিতাবসমূহে, তাঁর নবী-রাসুলগণে ও পরকালে বিশ্বাস করবে এবং তকদিরে, তার ভালোতে ও মন্দতে বিশ্বাস করবে।’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। এখন আমাকে বলুন কিয়ামত সম্পর্কে (তা কবে হবে)।’ রাসুল (সা.) উত্তরে বললেন, ‘এ বিষয়ে যাঁকে প্রশ্ন করা হচ্ছে তিনি তাঁর অপেক্ষা অধিক কিছু জানেন না, যিনি প্রশ্ন করেছেন তাঁর চেয়ে।’ (অর্থাৎ আমি আপনার থেকে অধিক কিছু জানি না।) তিনি বললেন, ‘বাঁদি (দাসী) তার মালিককে জন্ম দেবে এবং (এককালের) উলঙ্গ পা, উলঙ্গ শরীর দরিদ্র মেষপালকদের (পরবর্তীকালে) দালানকোঠা নিয়ে পরস্পর গর্ব করতে দেখবে।’ হজরত ওমর (রা.) বলেন, অতঃপর লোকটি চলে গেল এবং আমি অনেকক্ষণ তথায় অপেক্ষা করলাম। এ সময় হুজুর (সা.) আমাকে বললেন, ‘ওমর! চিনলে প্রশ্নকারী লোকটি কে?’ আমি বললাম, (জি না, হুজুর।) আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই তা জানেন। হুজুর বললেন, ‘তিনি হচ্ছেন হজরত জিবরাঈল (আ.)। তোমাদেরকে তোমাদের দ্বিন শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি তোমাদের কাছে এসেছিলেন।’ (মুসলিম-৮)
মুমিন মুসলমান ও জিবরাঈল (আ.) : পবিত্র কোরআনে ঈমানদারদের সঙ্গে এই মহান ফেরেশতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আলোচনা রয়েছে। যেমন কদরের রাতে জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদের বাহিনী নিয়ে জমিনে অবতরণ করেন এবং ইবাদতকারীদের সঙ্গে সালাম ও মোসাফাহা করেন। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, যারা জিবরাঈল (আ.)-এর শত্রু, তারা মহান আল্লাহর শত্রু। এ ছাড়া হাদিসে এসেছে, যখন মহান আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাঈল (আ.)-কে ডেকে বলেন, ‘আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং জমিনের বুকে ঘোষণা করে দাও যেন সব মাখলুক তাকে ভালোবাসে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৪০)
লেখক : শিক্ষক, ইমদাদুল উলুম রশিদিয়া মাদরাসা, ফুলবাড়ীগেট, খুলনা।









