সিল্কসিটিনিউজ ডেস্খ: সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ীর আতিয়া মহলে নিহত জঙ্গিদের মধ্যে নব্য জেএমবির অন্যতম শীর্ষ নেতা মাঈনুল ইসলাম মুসাও রয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এ ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত বলে জানিয়েছে।
সিটিটিসির উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বলেন, ‘সিলেটের জঙ্গিঘাঁটি থেকে উদ্ধার করা লাশগুলো ক্ষতবিক্ষত, অনেক অংশ পুড়েও গেছে। তাই চেহারা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে আমাদের কাছে থাকা মুসার ছবির সঙ্গে একটি লাশের অনেক মিল রয়েছে। ডিএনএ টেস্টের পর পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে। ’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা অনেকটাই নিশ্চিত যে আতিয়া মহলে নিহত জঙ্গিদের একজন মাঈনুল ইসলাম মুসা।

গতকাল আরো কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আতিয়া মহলে নিহত জঙ্গিদের একজনের সঙ্গে মুসার চেহারার যথেষ্ট মিল পাওয়া গেছে। তার মুসা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিশেষ করে মুসা যে ছবি দিয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন সে ছবির সঙ্গে পুলিশের কাছে থাকা ছবির অনেক মিল পাওয়া গেছে।
ওই কর্মকর্তারা বলেন, আতিয়া মহলে অভিযানের আগে তাঁদের কাছে তথ্য ছিল, ওই জঙ্গি আস্তানায়ই মুসা অবস্থান করছেন। তবে তাঁর ব্যাপারে নিশ্চিত হতে লাশের ডিএনএ পরীক্ষা এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। তাঁর পরিবার রাজশাহীর বাগমারার গ্রামের বাড়িতে থাকে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মুসার প্রকৃত নাম মাঈনুল ইসলাম। তাঁর একাধিক ছদ্ম নাম রয়েছে। নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর থেকে তাঁকে খোঁজা হচ্ছিল। কারণ তখন থেকে সংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি। গত ২৪ ডিসেম্বর তাঁর নেতৃত্বে রাজধানীর আশকোনার ‘সূর্য ভিলা’য় ঘাঁটি গেড়েছিল নব্য জেএমবি। ওই বাসা ইমতিয়াজ পরিচয়ে ভাড়া নিয়েছিলেন মুসা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের আগে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। মুসা গুলশান হামলার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। আশকোনার আগে রাজধানীর বারিধারা, আজিমপুর ও উত্তরা এলাকায়ও বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন তিনি। মুসা তাঁর সাংগঠনিক ছদ্ম নাম হয়ে থাকতে পারে।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের কাছে তথ্য ছিল, আশকোনার আস্তানা থেকে পালিয়ে মুসা চট্টগ্রামে চলে যান। সেখানেও তাঁর জঙ্গি আস্তানা ছিল। চট্টগ্রামে কয়েকটি জঙ্গিঘাঁটির সন্ধান পাওয়া যায়। সেসব ঘাঁটি থেকে অনেক জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে মুসাকে পাওয়া যায়নি। এরপর মুসা সিলেটে চলে যান।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি টিম ১৫ দিন ধরে চেষ্টা করে সিলেটে মুসার খোঁজ পায়। এরপর তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে তারা। পাশাপাশি সিটিটিসির কর্মকর্তারাও তৎপরতা চালান। তাঁরা আতিয়া মহলে মুসার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। এরপর ওই বাড়ি কড়া নজরে রাখা হয়। অন্য জঙ্গিদের সন্ধানও পাওয়া যায়।
আরো জানা গেছে, মুসা ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায়ও জড়িত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ) তাঁকে খুঁজছে। ২০১৪ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহীর বাগমারায় সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের হাত ধরে জেএমবিতে যোগ দেন তিনি। তখন বাগমারার তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র ছিলেন মুসা। পরে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হলেও বেশি দিন থাকেননি। একপর্যায়ে সেখান থেকে ঢাকা কলেজে এসে ভর্তি হন। ইংরেজিতে মাস্টার্স করেন। এরপর রাজধানীর উত্তরার লাইফ স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এর আগে মিরপুরের রূপনগরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত সাবেক মেজর জাহিদের হাত ধরে নব্য জেএমবিতে যোগ দেন তিনি।
মাঈনুল ইসলাম মুসার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারার গণিপুর রনিপাড়ায়। বাবার নাম আবুল কালাম মোল্লা। ১৯৮৮ সালের ২০ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন মসজিদের মুয়াজ্জিন। বাগমারার বাসুপাড়া ইউনিয়নের সাঁইপাড়া গ্রামের আব্দুস সামাদের মেয়ে তৃষামনিকে বিয়ে করেন মুসা। বিয়ের পর প্রথমে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়িতে ওঠেন। ওই বাড়িতে তখন ভাড়া থাকতেন সাবেক মেজর জাহিদ। তিনি জাহিদের সন্তানদের পড়াতেন।
সিলেটের আতিয়া মহলে নিহত চার জঙ্গির লাশই পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহতদের একজনের নাম মর্জিনা বেগম ওরফে মর্জিনা। তিনি মুসার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। নিহত অন্য দুজনের একজনের নাম সোহেল ওরফে ফাহিম। আরেকজন কাউসার। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
মুসার মৃত্যু স্বস্তিদায়ক
সিলেটের আতিয়া মহলে নিহত চার জঙ্গির মধ্যে নব্য জেএমবির সমন্বয়ক মাঈনুল ইসলাম মুসাও রয়েছেন বলে জানা গেছে। আর নিহত নারী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের মোনজি আরা (অন্য সূত্রে জানা গেছে তাঁর নাম মর্জিনা বেগম ওরফে মর্জিনা)।
এ খবর স্বস্তিদায়ক বলে মন্তব্য করেছে চট্টগ্রামের পুলিশ। কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, মুসা যদি নিহত হয়ে থাকেন তাহলে তা অবশ্যই স্বস্তিকর সংবাদ। তবে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার জন্য বলেছেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কয়েকজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে মারা যাওয়ার পর হাল ধরেছিলেন মুসা। তিনি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি গিয়ে বেশ কয়েকজনকে দলে টানেন। চট্টগ্রামসহ কয়েকটি জেলায় জঙ্গিদের আস্তানাও গড়েন তিনি। এমন তথ্য পুলিশের কাছে আছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সাধন কুটির ও ছায়ানীড়ের জঙ্গি আস্তানা দুটিও মুসার তত্ত্বাবধানে জঙ্গিরা তৈরি করেছিল বলে পুলিশ জেনেছে। এ দুটি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিলেও মুসার নাগাল পায়নি চট্টগ্রামের পুলিশ। চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে সিলেটে গিয়ে আস্তানা গেড়েছিলেন মুসা এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জেনেছে পুলিশ। তবে ডিএনএ পরীক্ষার আগে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না বলে জানান কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, ‘অভিযান সিলেটে হয়েছে, আমরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। আমরাও আপনাদের (সাংবাদিক) মতো জেনেছি, ওই আস্তানায় মুসা ও এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তারা সত্যিই মুসা ও মোনজি আরা কি না তা নিশ্চিত করবে সেখানকার পুলিশ। ’
সিলেট অফিস জানিয়েছে, দক্ষিণ সুরমার আতিয়া মহলে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত চার জঙ্গির মধ্যে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাঈনুল ইসলাম ওরফে মুসাও রয়েছেন বলে ধারণা করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এখন পর্যন্ত উদ্ধারকৃত দুটি লাশ ঝলসে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ডিএনএ নমুনা ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যায় আতিয়া মহল পুলিশকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভবনের ভেতর থাকা দুই জঙ্গির লাশও পুলিশকে বুঝিয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এম রোকন উদ্দিন বলেন, ‘বিকেল ৫টায় কাগজপত্রে আমরা ভবনটি বুঝে পেয়েছি। লাশ দুটি এখনো ভবনের ভেতর রয়েছে। সেখানে প্রচুর বিস্ফোরকও রয়েছে। বোমা নিষ্ক্রিয়করণ টিম এগুলো নিষ্ক্রিয় করার পর আমরা ভেতরে যাব এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নেব। ’
সিলেট পুলিশ জানায়, আগের লাশ দুটি কাউসার আলী ও মর্জিনা বেগমের। তারা তিন মাস আগে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওই ভবনের নিচতলা ভাড়া নেয়। তবে নাম সঠিক নয় বলেই তাঁদের ধারণা। ফলে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে লাশ দুটির ময়নাতদন্ত করা হয়েছে বলে জানান কোতোয়ালি থানার ওসি সোহেল আহাম্মদ। তিনি জানান, লাশ দুটি ওসমানী হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, কাউসার আলী পরিচয়ে যে ব্যক্তি আতিয়া মহলে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন তিনি জঙ্গি নেতা মুসা। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেই ছবির সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে থাকা মুসার ছবির অনেক মিল রয়েছে। লাশ দেখে শনাক্ত করার মতো অবস্থা নেই বলে তাঁরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছেন না। এ জন্য ডিএনএ নমুনা ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়েছে। সূত্র: কালের কণ্ঠ









