সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে নবুয়তের ধারা সমাপ্ত হয়েছে। আর দ্বিন ইসলামকে চূড়ান্ত জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাই পরকালে মুক্তিকামী মানুষকে ইসলামের ছায়াতলেই আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণতা দান করেছি, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহরাজি পূর্ণ করেছি এবং তোমাদের জন্য দ্বিন (জীবনবিধান) হিসেবে মনোনীত করেছি ইসলামকে।
’
(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩)

কোরআনে আল্লাহ তাঁর মনোনীত দ্বিনকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার এবং সব বিভক্তি থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কোরো এবং পরস্পর বিছিন্ন হয়ে পোড়ো না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৩)
আল্লাহ তাআলা শুধু মুমিনদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেননি, বরং তিনি মুসলিম জাতিকে দ্বিনের ব্যাপারে নানা মত ও মতবাদ সৃষ্টি এবং নিজেদের বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের দ্বিনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে।
প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উত্ফুল্ল।’
(সুরা : রোম, আয়াত : ৩২)
মহান আল্লাহর নির্দেশ থাকার পরও মুসলিম সমাজে নানা ধরনের ধর্মীয় মতপার্থক্য বিদ্যমান এবং তাদের প্রত্যেকেই নিজেদের মুক্তিপ্রাপ্ত বলে জ্ঞান করে থাকে। প্রশ্ন হলো, মুসলিম উম্মাহর ভেতর মুক্তিপ্রাপ্ত দল কারা? এই প্রশ্নের উত্তরই আজকের লেখার মূল বিষয়। তবে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের একটি বিষয় জেনে নেওয়া জরুরি; তা হলো মতভিন্নতা মানেই দলচ্যুতি নয়।
মুসলিম সমাজের ধর্মীয় মতভিন্নতাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—১. কোরআন ও হাদিসের মৌলিক বিশ্বাস ও বিধানের ক্ষেত্রে কোনো মতবিরোধ নেই, মতবিরোধ শাখাগত বিষয়ে অথবা বিধানের প্রয়োগ পদ্ধতিতে। যেমন চার মাজহাবের মতভিন্নতা, আশআরি ও মাতুরিদিদের মতভিন্নতা। এমন মতভিন্নতা কোরআনে নিন্দিত বিভক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে প্রশস্ততার উপলক্ষ। এদের সবাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত।
২. কোরআন ও হাদিসের মৌলিক বিশ্বাস ও বিধানে মতভিন্নতা।
এমন মতভিন্নতা, যা মানুষকে ঈমানি বিশুদ্ধতার সীমার বাইরে নিয়ে যায়। কোরআনে এমন বিভক্তিরই নিন্দা করা হয়েছে। যেমন—খারেজি, রাফেজি, জাবরিয়া, কদরিয়া ও মুতাজিলা সম্প্রদায়ের চিন্তা ও বিশ্বাস।
সাধারণ মুসলমানের দায়িত্ব হলো ইসলামের নামে ঈমান ও ইসলামের নামে প্রচলিত বিভ্রান্ত ও বিচ্যুত দলগুলো থেকে দূরে থাকা এবং নিজেকে বিশুদ্ধ মতাদর্শের অধিকারী কোনো একটি দলের অন্তর্ভুক্ত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের আল্লাহভীতি এবং নেতার নেতৃত্ব মান্য ও আনুগত্য করতে অসিয়ত করছি; যদিও তোমাদের নেতা একজন হাবশি ক্রীতদাস হয়। যেহেতু তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আমার মৃত্যুর পরও জীবিত থাকবে সে বহু মতভেদ দেখতে পাবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নত এবং সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদিনের সুন্নত অবলম্বন কোরো, তা শক্ত করে ধারণ কোরো এবং দাঁত দ্বারা দৃঢ়ভাবে ধরো। আর নব-উদ্ভাবিত বিষয় থেকে দূরে থেকো। যেহেতু প্রত্যেক অভিনব কর্ম বিদআত, প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতা জাহান্নামে নিয়ে যায়।’
(সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৬০৭)
মুসলিম সমাজে ধর্মীয় বিভক্তি ও মতবিরোধ নিয়ে এক প্রকার হতাশা ও অনুযোগ শোনা যায়। অনেকে এই বিভক্তিকে দ্বিন থেকে দূরে থাকার উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করে। অথচ তাদের স্মরণে থাকা উচিত সীমার মধ্যে হোক অথবা সীমা লঙ্ঘন করে হোক—মুসলমানদের এই বিভক্তি আল্লাহর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনার বাইরে নয়। এ বিষয়ে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী হলো, ‘ইহুদিরা ৭১ দলে ও খ্রিস্টানরা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছে, আর এই উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে; তাদের ৭২টি দল জাহান্নামে যাবে এবং একটি যাবে জান্নাতে আর সেটি হলো জামা‘আত।’
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৯৩)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘শুধু একটি দল ছাড়া সব জাহান্নামে যাবে; যে দলটি আমি ও আমার সাহাবার মতানুসারী হবে।’
(সহিহুল জামে, হাদিস : ৫২১৯)
হাদিসে মুক্তিপ্রাপ্ত যে দলের কথা মহানবী (সা.) বলেছেন, তারই নাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত। এই নামের মধ্যেই আছে তাদের মূলনীতি ও পরিচয়। তা হলো সুন্নাত ও জামা‘আত। আকিদার বিষয়ে হুবহু কোরআন ও সুন্নাতের অনুসরণ করা, সুন্নাতের অতিরিক্ত বা ব্যতিক্রম কিছুই না বলা। আর জামা‘আত দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর নবীর সাহাবিগণ ও তাঁদের অনুসারী তাবেঈ, তাবে-তাবেঈদের অনুসরণ করা ও উম্মতের ঐক্য বজায় রাখার চেষ্টা করা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসের বর্ণনা থেকেও এমনটি ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) আমাদের জন্য স্বহস্তে একটি রেখা টানলেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘এটি আল্লাহর সরল পথ।’ অতঃপর ওই রেখার ডানে ও বাঁয়ে কতগুলো রেখা টেনে বললেন, এগুলো বিভিন্ন পথ। এই পথগুলোর প্রত্যেটির ওপর একটি করে শয়তান আছে, যে ওই পথের প্রতি মানুষকে আহবান করে। অতঃপর তিনি আল্লাহর এই বাণী পাঠ করলেন, ‘এবং নিশ্চয়ই এটি আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ কোরো এবং বিভিন্ন পথের অনুসরণ কোরো না। করলে তা তোমাদের তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা সাবধান হও।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫৩;
সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৫৯)
শায়খ আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতই ফিরকায়ে নাজিয়াহ বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল।
(গুনয়াতুত তালিবিন)
সুতরাং মুসলমানদের উচিত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অনুসরণ করা এবং সব ভ্রান্ত ও বিদআতি ধারা থেকে দূরে থাকা। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দিন। আমিন।









