ধর্ম

ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যের অধিকার হরণ

নিউজ ডেস্ক২৯ মার্চ ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

অন্যায় ভোগাকাঙ্ক্ষা অপরের ভোগান্তির অনুষঙ্গ। অসত্যের চূড়ান্ত পরিণতি ধ্বংস। পাপ-পতনের পথে সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ, অসৎ পন্থাবলম্বন মোনাফেকি ও কবিরা গুনাহ। সুরা বাকারার ৪২ নম্বর আয়াত—তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ো না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন কোরো না।

’
অন্যদিকে অপরাধী অনুতপ্ত না হয়ে ছলচাতুরী করে বলেই মহান আল্লাহর নির্দেশ, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ গ্রাস কোরো না এবং জানা সত্ত্বেও অসৎ উপায়ে অপরের সম্পদ গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকের বিবেচনায় উত্থাপন কোরো না।’ (সুরা : বাকার, আয়াত : ১৮৮)

তিনিই বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না…।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২০)

প্রাচুর্যের মোহ মানুষের সহজাত—‘পরিতাপ প্রত্যেক পশ্চাতে নিন্দুকের জন্য, যে সম্পদ জমা করে, গণনা করে এবং ধারণা করে এটাই তাকে অমর করবে।’ (সুরা : হুমাজাহ , আয়াত : ০১-০৩)

আবারও আছে—

‘মনোরম করা আছে কামনা অপার

মানুষের কাছে যাহা অধিক চাওয়ার

সন্তান নারী আর সোনা ও রুপার

অশ্ব পশুরাজি ক্ষেত ও খামার।

’ (কাব্যানুবাদ, সুরা আল- ইমরান, আয়াত : ১৪)
মানুষের দুরন্ত বাসনার জিহ্বা শান্তির পৃথিবীতে অশান্তির জ্বলন্ত শিখায় ফুঁক দেয়। ভূমিহীন যারা, তারাও মাটির পৃথিবীতেই বিচরণ করে, আবার ভূমির দাবি দখলের জন্য আপনজনের ভূমিকায় অন্তরের উচ্চারণ—‘মাটি কেন দুভাগ হয় না!’ অথচ মহান আল্লাহ বলেন, ‘ইন্নাল আরদা লিল্লাহ… নিশ্চয়ই ভূমির মালিক আল্লাহ, তিনি তার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকার দান করেন।’

মৃত ব্যক্তির ঋণ, অসিয়ত ও দাফনের খরচের পর অবশিষ্ট সম্পদ উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে বণ্টনের জন্য সুরা নিসার ৭, ১২, ১৭৭ নম্বর আয়াতসহ বিভিন্ন আয়াতে সুস্পষ্ট বিধান আছে।

জীবিকার্জন ফরজ।

যার পদ্ধতি হবে—‘হালালান্ তাইয়্যেবা’ বা ‘বৈধ ও পবিত্র’। শুধু মনে রাখতে হবে, মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবননাট্যের মঞ্চ হলো মাটি এবং মাটিতেই তাকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে :
‘মাটি হতে তোমাদের সৃষ্টি করিয়া

মাটিতেই তোমাদের নিব ফিরাইয়া

মাটি হতে পুনরায় আনব বের করিয়া।’

(কাব্যানুবাদ, সুরা ত্ব-হা, আয়াত : ৫৫)

চোখের সামনেই বিশাল সম্পত্তি নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে, বাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়, দুর্ঘটনায় যায় গাড়ি ও জীবন দুটোই! অথচ স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষ হয় অন্ধ এবং করতে চায় কৌশলে অন্যের ওপর আধিপত্য। মানুষের ভোগলিপ্সা প্রসঙ্গে Machiavelli, ‘The Prince’ গ্রন্থে বলেছেন ‘Men sooner forget the death of their father than the loss of their patrimony’।

অনেকেই আমরা উদাসীন অপরের অধিকারের ব্যাপারে।

অথচ একদা প্রিয় নবী (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা জানো কি দেউলিয়া কে? …তিনি বলেন, উম্মতের মধ্যে ওই ব্যক্তি দেউলিয়া, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, জাকাতসহ অসংখ্য সৎকর্ম নিয়ে উপস্থিত হবে এবং এর সঙ্গে সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ গ্রাস করেছে, কারো রক্তপাত (হত্যা) করেছে, কাউকে মারধর করেছে ইত্যাদি অপরাধও নিয়ে আসবে। তখন তার সৎকর্ম থেকে এই ব্যক্তি কিছু নেবে, ওই ব্যক্তি কিছু নিয়ে যাবে। এভাবে সম্পূর্ণ বিনিময় নেওয়ার আগেই তার সৎকর্ম নিঃশেষ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে… (তিরমিজি)
অবৈধ দখলদারির বিরুদ্ধে প্রিয় নবী (সা.)-এর কঠোর উচ্চারণ, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে অপরের এক বিঘত জমি আত্মসাৎ করবে। কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তবক জমি ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘কেউ অপরের ক্ষতি করলে আল্লাহও তার ক্ষতিসাধন করবেন। কেউ অযৌক্তিকভাবে কারো বিরোধিতা করলে আল্লাহ তার বিরোধী হবেন।’ (আবু দাউদ)

বস্তুত কারো অধিকার নষ্ট করে হয়তো দুনিয়ায় কেউ পার পেয়ে যাবে! তবে পরকালে মিলবেই অন্যায় বৈষম্য বেইনসাফির শেষ প্রতিফল :

‘পৃথিবীতে কতো দ্বন্দ্ব কতো সর্বনাশ,

নতুন নতুন কতো গড়ে ইতিহাস-

রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে

সোনার মুকুট কতো ফুটে আর টুটে।

সভ্যতার নব নব কতো তৃষ্ণা ক্ষুধা-

উঠে কতো হলাহল, উঠে কতো সুধা।’

(খেয়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর