ধর্ম

আল-আকসার প্রতি ফিলিস্তিনিদের ভালোবাসা ও ইসরায়েলি প্রহসন

নিউজ ডেস্ক২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

৭১ বছর বয়সী ফাতিমা কাদির নিজেকে ‘জেরুজালেমের কন্যা’ বলতে ভালোবাসেন। তাঁর শৈশব কেটেছে আল-আকসা প্রাঙ্গণে নামাজ পড়ে, এর খিলানের নিচে ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের শেষ সময়টুকুও কাটবে এই পবিত্র স্থানেই। কিন্তু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আবারও তাঁর ওপর মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

তিনি মনে করেন, ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা আল-আকসার জন্য হুমকিস্বরূপ।
টানা দ্বিতীয় রমজানেও ফাতিমা আল-আকসায় প্রবেশ করতে পারেননি। প্রথমবার তাকে সাত মাস দশ দিনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার দিনই তিনি ‘লাইলাতুল মিরাজ’ উপলক্ষে মসজিদে যান।

কিন্তু সেদিনই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আবারও সাত মাসের নতুন নিষেধাজ্ঞা ধরিয়ে দেওয়া হয়।
সেই রাতে তিনি শহীদ ও মৃত মুসলমানদের রুহের মাগফিরাতের জন্য মসজিদের প্রাঙ্গণে বিতরণের উদ্দেশ্যে মামুল পিঠা ও নানা মিষ্টি প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু দুই রাকাত নামাজ শেষ করা বা খাবার বিতরণ কোনোটাই তিনি করতে পারেননি। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তাকে ঘিরে ফেলেন।

কিভাবে আগের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি ঢুকলেন, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, আমি হেলিকপ্টারে করে এসেছি। পরে তাকে ওয়েস্টার্ন ওয়ালের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নিষেধাজ্ঞার আদেশ ধরিয়ে দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে আল-আকসা মসজিদ থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব আদেশ আসে হঠাৎ করেই, কখনো সরাসরি হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়, কখনো হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় পাঠানো হয়। জেরুজালেম গভর্নরের মুখপাত্র বাহা বারাকাতের অনুমান, হয়রানি, গ্রেপ্তার বা নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ার ভয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ জেরুজালেমবাসী তাদের নিষেধাজ্ঞার কথা প্রকাশ করেন না।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি বহু বছরের একটি ধারাবাহিক নীতির অংশ, যার মাত্রা এখন বেড়েছে। ২০২৪ সালে ওয়াদি হিলওয়ে ইনফরমেশন সেন্টার জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চার শর বেশি বহিষ্কার আদেশ নথিভুক্ত করে। যার লক্ষ্য ছিল মসজিদ, পুরনো শহর, নির্দিষ্ট মহল্লা বা পুরো পশ্চিম তীর। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় সপ্তাহেই ২৫০টি আদেশ জারি হওয়ায় এ বছর আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নিজাম আবু রুমুজ জানান, রমজানের দুই সপ্তাহ আগে তিনিও নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন, তার ভাই ইসমাইল ও বোন সুয়াদের সঙ্গে। ফাতিমার ছেলে আলা ও মেয়েও কয়েক দিনের ব্যবধানে একই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। নিজাম বলেন, ‘এ নিয়ে ১০ বছর হলো, রমজানে আমি আল-আকসায় ঢুকতে পারছি না।’ তার কাছে এটি এখন প্রতিবছরের বাস্তবতা।

এই নিষেধাজ্ঞা শুধু সাধারণ মুসল্লিদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি বাহিনী আল-আকসা মসজিদের ইমাম শেখ মোহাম্মদ আল আব্বাসিকে গ্রেপ্তার করে, যা ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতিও কঠোরতার ইঙ্গিত দেয়। তবু ফিলিস্তিনিরা ঘরে বসে থাকেন না। নিজাম প্রতিদিন যতদূর যেতে পারেন, হাঁটেন। সাধারণত বাব আল সিলসিলা বা আল-মুজাহিদিন সড়ক পর্যন্ত। সেখানে তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েন অথবা মসজিদের দেয়াল দেখা যায় এমন স্থানে বসে কোরআন তিলাওয়াত করেন। তিনি বলেন, এই বছর আমি আল-মুজাহিদিন সড়কেই তারাবির নামাজ পড়ব। আমাকে পুরোপুরি দূরে রাখতে পারার সন্তুষ্টি আমি তাদের দেব না। নিজামের মতো ফাতিমাও যতটা সম্ভব কাছে গিয়ে নামাজ আদায় করেন। প্রতিদিন তিনি বাব আল আসবাতে গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন। এই নৈকট্য কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দেবে হারানো অনুভূতি।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আল-আকসায় এক নজিরবিহীন অভিযান চালিয়ে এর ২৯ জন কর্মীকে নিষিদ্ধ করেছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রহরী, খাদেম ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী। যারা ইসলামিক ওয়াকফর অধীনে কাজ করতেন। নিরাপত্তাজনিত শঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রহরী বলেন, ‘আমাদের টেনে বের করে নিষিদ্ধ করবে, এটা আমরা ভাবতেই পারিনি। সব তরুণ কর্মী হতভম্ব হয়ে গেছে। রমজানের ঠিক আগে এই নিষেধাজ্ঞাকে তিনি আখ্যা দেন ‘দেহে বিষ ঢেলে দেওয়া’ হিসেবে। তিনি রমজানের সময় ভোর ৬টায় মসজিদের ফটক খুলে দিতেন এবং ইসরায়েলি বিধি-নিষেধ সত্ত্বেও জেরুজালেমে পৌঁছাতে পারা ফিলিস্তিনিদের স্বাগত জানাতেন।

প্রহরীর ভাষ্য, এটাই প্রথমবার এত বড় সংখ্যায় মসজিদের কর্মীদের নির্বাসিত করা হলো। লক্ষ্যবস্তু হওয়া ২৯ জনের সবারই আগে থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত নথি বা নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস ছিল।

ওয়াদি হিলওয়ে ইনফরমেশন সেন্টারের আইনজীবী মুহাম্মদ মাহমুদ বলেন, পবিত্র স্থানে ইবাদতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইন ইসরায়েল মানে না। এসব আদেশ অন্যায় ও নিপীড়নমূলক; নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের ও তাঁদের পরিবারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। রমজানসহ ধর্মীয় উপলক্ষে এ ধরনের আদেশ বেড়ে যায় এবং জেরুজালেমবাসীসহ ফিলিস্তিনি সমাজের সব স্তরকে টার্গেট করা হয়।

-দ্য নিউ আরব অবলম্বনে