সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে সম্প্রতি নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সার প্রীতি কাসিরেড্ডি। আর এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ওজন কমানোর এই জনপ্রিয় পদ্ধতি কি নারীদের স্বাস্থ্যের বিরুদ্ধেই কাজ করছে?
কাসিরেড্ডি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে হরমোনের জন্য ‘সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তগুলোর একটি’ বলে উল্লেখ করেন। তার কথায়, এতে তার ‘ফ্রি টি৩’ হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ফলে বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ে।

একই সঙ্গে সকালে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেশি থাকত। তিনি সব সময় ঠাণ্ডা অনুভব করতেন, মাসিকের রক্তস্রাব কমে গিয়েছিল এবং সামগ্রিকভাবে তিনি এটিকে ‘নারীদের জন্য একেবারে বিপদের রেসিপি’ বলে বর্ণনা করেন।
তিনি সকালের নাশতা এড়িয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন। তার মতে, এতে শরীর খাবারের পরিবর্তে কর্টিসলের ওপর নির্ভর করে কাজ চালায়, যা দীর্ঘমেয়াদে থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে এবং প্রজনন স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তার ভাষায়, ‘ব্রেকফাস্ট খাওয়া একটা শক্তিশালী পদক্ষেপ’,। সেই সঙ্গে তিনি অনলাইনে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর ওয়েলনেস পরামর্শেরও বিরোধিতা করেন।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কী, কেন এত জনপ্রিয়
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং মূলত কী খাচ্ছেন, তার চেয়ে কখন খাচ্ছেন, সেটির ওপর জোর দেয়। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো ১৬:৮ মেথড—১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা এবং ৮ ঘণ্টার মধ্যে সব খাবার খাওয়া।
সমর্থকদের দাবি, এতে ডায়েট করা সহজ হয়, ওজন কমে এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্য ভালো হয়। কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণাও দেখিয়েছে, এটি ওজন কমাতে, কোমরের মাপ কমাতে এবং রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যারা ওজনাধিক্য বা টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই উপকারিতা অনেক সময় সাধারণ ক্যালরি নিয়ন্ত্রিত ডায়েটের মতোই। আর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
নারীদের ক্ষেত্রে কী বলেন বিশেষজ্ঞরা
নয়ডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যালায়েড হেলথ সায়েন্স স্কুলের ডিন ডা. সুপ্রিয়া আওয়াস্থির মতে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং সব নারীর জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর নয়।
তবে সবার জন্য নিরাপদও নয়।
তার ব্যাখ্যা, নারীদের হরমোন চক্রের কারণে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার প্রতি তাদের শরীর পুরুষদের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় উপবাসে থাকলে কর্টিসল (শরীরের প্রধান স্ট্রেস হরমোন) বাড়তে পারে। বেশি কর্টিসল মাসিকের অনিয়ম, বিপাকক্রিয়া ধীর হওয়া এবং মুডের পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যাদের পিসিওএস, থাইরয়েডের সমস্যা, অনিয়মিত পিরিয়ড বা উচ্চ মানসিক চাপ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি।
তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত কড়াকড়ি বা দীর্ঘ সময়ের ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নারীদের হরমোন নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যদি তা পরিকল্পনা ছাড়া করা হয়।’ সহজ কথায়, একজনের শরীরে যা কাজ করে, অন্য জনের ক্ষেত্রে তা উল্টো ফল দিতে পারে।
কেন অনেক নারী ফাস্টিংয়ে সমস্যায় পড়েন
পুষ্টিবিদ ও আক্যা ওয়েলনেসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অক্ষিতা সিংলাও একমত যে নারীদের শরীর ক্ষুধা ও কম শক্তি গ্রহণের মতো স্ট্রেসের প্রতি বেশি সংবেদনশীল।
তার মতে, ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং সব সময় ক্ষতিকর নয়, কিন্তু সব নারীর শরীর একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না।’ পুষ্টির চাহিদা পূরণ না হলে ফাস্টিং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এর ফলে পিএমএস বেড়ে যাওয়া, ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা, কর্টিসল বৃদ্ধি, ঘুমের ব্যাঘাত এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
পিসিওএস থাকলে কী করবেন
দুই বিশেষজ্ঞই জোর দিয়ে বলেন, পিসিওএস-এ আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হওয়া দরকার। ডা. আওয়াস্থির মতে, পিসিওএস থাকা অনেক নারীরই আগে থেকেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থাকে, যা ফাস্টিং কখনো কখনো আরো খারাপ করতে পারে।
অক্ষিতা সিংলার মতে, পিসিওএস-এ ওজন কমানো শুধু কম খাওয়ার বিষয় নয়। এতে হরমোনের সমস্যা, প্রদাহ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ জড়িত। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যার মধ্যে পর্যাপ্ত প্রোটিন, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, ভালো ঘুম ও স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। পাশাপাশি হলুদ, আদা, বেরি, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার উপকারী। আর প্রক্রিয়াজাত খাবার, পরিশোধিত তেল ও অতিরিক্ত চিনি কমানো দরকার। প্রয়োজনে ইনোসিটল, ওমেগা-৩ বা ম্যাগনেসিয়ামের মতো সাপ্লিমেন্টও চিকিৎসকের পরামর্শে নেওয়া যেতে পারে।
তবে কি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নারীদের জন্য খারাপ?
সংক্ষেপে উত্তর— সব সময় নয়, তবে এটি সবার জন্য এক সমাধানও নয়।
গবেষণা বলছে, অনেক প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও মাঝারি মাত্রায় কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যাদের হরমোনজনিত সমস্যা, বেশি মানসিক চাপ, পিসিওএস বা থাইরয়েডের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বা ভুলভাবে করা ফাস্টিং উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পুষ্টির ঘাটতি রেখে খাবার বাদ দেওয়া বা শরীরকে দীর্ঘ সময় স্ট্রেসে রাখা দীর্ঘমেয়াদে ভালো নয়।
সবশেষে বলা যায়, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন খলনায়ক নয়, তেমনই এটি কোনো জাদুকরী সমাধানও নয়। কিছু নারীর ক্ষেত্রে এটি ওজন ও মেটাবলিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে হরমোনের সমস্যা থাকলে এটি মাসিক চক্রে গোলমাল, স্ট্রেস বৃদ্ধি এবং বিপাকক্রিয়া ধীর করে দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীদের শরীর ফাস্টিংয়ের প্রতি আলাদাভাবে সাড়া দেয়। তাই ট্রেন্ড অনুসরণ করার আগে নিজের শরীরের প্রয়োজন, পুষ্টি ও হরমোনের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র : এনডিটিভি









