সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড, যা ইউরোপীয় রাষ্ট্র ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই দ্বীপের প্রায় পুরোটাই বরফে আচ্ছাদিত। ২১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬ বর্গকিলোমিটারের বিশাল গ্রিনল্যান্ডে এক লাখেরও কম মানুষ বসবাস করে। অঞ্চলটির অর্থনীতি কৃষি, মৎস্য আহরণ ও ডেনমার্কের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
গ্রিনল্যান্ডের বেশির ভাগ মানুষ খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। সেখানে স্বল্পসংখ্যক মুসলমানও বসবাস করে।
একবিংশ শতাব্দীতে ছোট ছোট মুসলিম দল পৃথিবীর

সর্ব-উত্তরের অঞ্চলগুলোতে ধীরে ধীরে বসতি স্থাপন শুরু করেছে। যার একটি উদাহরণ হলো কানাডার নর্থওয়েস্ট টেরিটরিজের ইনুভিকে মসজিদ স্থাপন।
ধারণা করা হয়, এটি পৃথিবীর সর্ব-উত্তরের মসজিদ। গ্রিনল্যান্ড কানাডাসংলগ্ন হলেও গ্রিনল্যান্ডে মুসলমানদের পদচারণের ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে অঞ্চলটির সংবাদপত্র ও রাজনীতিতে ইসলাম নানা সময়ে নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা মুসলমানদের গ্রিনল্যান্ড ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে।
২০১৭ সালে প্রথম মুসলিম হিসেবে পুরো গ্রিনল্যান্ড অতিক্রম করেন স্কটল্যান্ডের মোস্তফা সালামেহ।
১৯৫০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডের সংবাদপত্রে ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার বেশির ভাগ ছিল ভ্রমণ কাহিনি ও জাতি পরিচয়মূলক। মুসলিম ইতিহাস, রাজত্ব ও আইনের আলোচনাও কখনো কখনো এসেছে। ডেনমার্কের মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা, দাবি ও সংগ্রামের আলোচনাও এসেছে গ্রিনল্যান্ডের সংবাদপত্রে।
১৯৬৭ সালে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ইসলামের যোগসূত্রের একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।
সে বছর Atuagagdliutit পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয় যে রাজধানী নুক শহরের লুথেরান ধর্মতাত্ত্বিক সেমিনারির শিক্ষার্থীরা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছে। ইতিহাসের শিক্ষক ও সহকারী অধ্যাপক হ্যান্স ব্রুনসো তাদের এই শিক্ষা প্রদান করেন। এই কর্মসূচির পরিপূরক হিসেবে শিক্ষার্থীরা সেমিনারির হলে ইসলামবিষয়ক একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করে এবং সেমিনারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়।
একবিংশ শতাব্দীতে ডেনমার্কের রাজনীতিতে মুসলিম অভিবাসন ও মুসলিমবিদ্বেষী ভাবধারার বিকাশ ঘটলে গ্রিনল্যান্ডে ইসলাম ও মুসলমানরা আবারও আলোচনায় চলে আসে। এই সময় ডেনিস কার্টুনিস্ট কাস্ট ওয়েস্টার গার্ড নবীজি (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র আঁকে। প্রতিক্রিয়ায় সারা বিশ্বে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। মুসলিমরা এই পত্রিকার প্রতি ডেনিস সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করে। তারা ডেনিস পণ্য বর্জনের আহবান জানায়।
২০০৮ সালের শেষ দিকে গ্রিনল্যান্ডের কিছু মানুষ, যারা ডেনমার্কের গেলেরাপ অঞ্চলে বসবাস করে, তাদের সঙ্গে মুসলমানদের বিরোধ দেখা দেয়। তদন্তে দেখা যায়, গ্রিনল্যান্ডের অধিবাসীরা গেলেরামের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় অতিরিক্ত মদপান করায় এই সংকট দেখা দিয়েছিল। সরকার সে সময় ১০টি গ্রিনল্যান্ডিক পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছিল। এই ঘটনাও গ্রিনল্যান্ডে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল।
প্রশ্ন হলো, গ্রিনল্যান্ডে কি কোনো মুসলমান বসবাস করে? উত্তর হলো : স্থানীয় জনগণের ভেতর কোনো মুসলিম আছে কি না তা স্পষ্ট নয়, তবে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক দেশ ডেনমার্ক থেকে এবং ইউরোপ, আমেরিকা ও আরব অঞ্চল থেকে মুসলমানরা গ্রিনল্যান্ড ভ্রমণ করে থাকে। তারা ভ্রমণ ও ব্যাবসায়িক কাজে স্বল্প ও দীর্ঘ সময় অবস্থানও করে। গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তানের স্বল্প মাত্রার বাণিজ্যিক যোগাযোগ আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের কিছুসংখ্যক মুসলিম প্রবাসী নুক শহরে বসবাস করে। ২০১১ সালে একটি আরব টিভিতে ওয়াসসাম আজাকির নামক একজন লেবানিজ মুসলিমের ওপর প্রতিবেদন প্রচার করা হয় এবং তাঁকে গ্রিনল্যান্ডের একমাত্র মুসলিম হিসেবে দাবি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আজাকির ২০০০ সালে লেবাননে গমন করেন এবং রাজধানী নুকে একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ খোলেন। তাঁর রেস্তোরায় দৈনিক গড়ে ২০০ মানুষ আগমন করে। যেহেতু গ্রীষ্মকালে গ্রিনল্যান্ডে সামান্য সময়ের জন্য সূর্যাস্ত হয়, তাই আজাকিরকে ২১ ঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় রোজা রাখতে হয়। কখনো কখনো তাঁর মনে হয়েছে, রমজানে তিনি লেবাননে চলে যাবেন, কিন্তু এই কথা চিন্তা করে সেখানে যাননি যে তিনি গেলে হয়তো গ্রিনল্যান্ডে রোজা রাখার মতো আর কেউ থাকবে না।
অন্যান্য সূত্র যাচাই করে দেখা গেছে, আজাকিরকে গ্রিনল্যান্ডের একমাত্র মুসলিম দাবি করার সুযোগ নেই। যেমন—আহমদ আক্কারি নামের আরেকজন লেবানিজ মুসলমানের সন্ধান পাওয়া যায়, যিনি বিভিন্ন সময়ে গ্রিনল্যান্ডে বসবাস করেছেন। আহমদ আক্কারি ডেনমার্কের একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা। তিনি ২০০৮ সালে গ্রিনল্যান্ডে চলে যান এবং দক্ষিণের নারসাক শহরে বসবাস শুরু করেন। এখানে তিনি দুই বছর শিক্ষকতা করেন। মাঝে কিছুদিন ডেনমার্কে অবস্থান করার পর ২০১৪ সালে আবারও নারসাকে ফিরে যান। গ্রিনল্যান্ডকে তিনি লেখাপড়া ও লেখালেখির আদর্শ স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তথ্যঋণ : মিডিয়াম ডকটম, উমিদ ডটকম, অ্যাবাউট ইসলাম ও উইকিপিডিয়া









