ধর্ম

ভারত উপমহাদেশে হাদিসশাস্ত্র : ঐতিহ্য, প্রাতিষ্ঠানিকতা ও বৈশ্বিক প্রভাব

নিউজ ডেস্ক৫ জানুয়ারি ২০২৬৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

ইসলামী জ্ঞানপরম্পরায় হাদিসশাস্ত্র একটি মৌলিক ও অপরিহার্য শাখা। কোরআনের ব্যাখ্যা, শরিয়তের প্রয়োগ এবং মুসলিম সমাজের নৈতিক ও আইনগত কাঠামো নির্মাণে হাদিসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হাদিসচর্চার উত্থান-পতন ঘটলেও ভারত উপমহাদেশ তথা পাক ও হিন্দে এ শাস্ত্র যে গভীরতা, বিস্তৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে— তা ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন ঘটে হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে, কুতুবুদ্দিন আইবকের শাসনামলে, তবু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এখানে ইসলামী শিক্ষা, বিশেষত হাদিসশাস্ত্র, বিস্ময়কর গতিতে প্রসার লাভ করে।

বলা যায়, হারামাইন শরিফাইন ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো অঞ্চলে হাদিসশাস্ত্র এমন সুসংগঠিত ও ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ লাভ করেনি।

মধ্য এশিয়ার সঙ্গে তুলনামূলক পর্যালোচনা

এর বিপরীতে বুখারা ও সমরখন্দে ইসলামী জ্ঞানচর্চার সূচনা হয় আরো আগে খুলাফায়ে রাশিদিনের যুগেই। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসের জন্মভূমি হওয়া সত্ত্বেও ২৫০ হিজরিতে তাঁর নির্বাসনের পর সে অঞ্চলে হাদিসশাস্ত্র আর আগের গৌরব ফিরে পায়নি। সিহাহ সিত্তার ইমামরা ওই অঞ্চল থেকে উঠে এলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে হাদিসের ব্যাখ্যা, আসমাউর রিজাল, জারহ ও তাদিল কিংবা উসুলুল হাদিসে উল্লেখযোগ্য কোনো গ্রন্থ রচিত হয়নি।

অবশ্য ফিকহ ও উসুলুল ফিকহে সে অঞ্চলের আলেমদের যে অসামান্য কৃতিত্ব আছে, তা নিঃসন্দেহে অন্যদের জন্য দুর্লভ।
ভারত উপমহাদেশে হাদিসশাস্ত্রের সূচনা

ভারত উপমহাদেশে হাদিসশাস্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক গ্রন্থচর্চার সূচনা করেন শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)। তিনি মিশকাতুল মাসাবিহ-এর ওপর আরবি ভাষায় ‘আল-লুমআত’ এবং ফারসি ভাষায় ‘আশিআতুল লুমআত’ রচনা করে হাদিসশাস্ত্রকে সাধারণ শিক্ষিত সমাজের নিকট সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর এই দ্বিভাষিক প্রয়াস ভারত উপমহাদেশে হাদিসচর্চার ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

পরবর্তী সময়ে তাঁর পুত্র শাইখ নূরুল হক (রহ.) ফারসি ভাষায় সহিহ বুখারির ব্যাখ্যা ‘তাইসিরুল কারি’ রচনা করেন। তাঁর বংশধরদের হাত ধরে এই ব্যাখ্যামূলক ধারাটি আরো সমৃদ্ধ হয়, যা হাদিসশাস্ত্রে উত্তরাধিকারভিত্তিক জ্ঞানচর্চার একটি উত্কৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)-এর অবদান

ভারত উপমহাদেশে হাদিসশাস্ত্রের চিন্তাগত ও পদ্ধতিগত উৎকর্ষের শীর্ষে অবস্থান করেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)। তিনি মুয়াত্তা ইমাম মালেককে ‘উম্মুস সহিহাইন’ আখ্যা দিয়ে এর ওপর আরবি ভাষায় ‘আল-মুসাওয়া মিন আহাদিসিল মুয়াত্তা’ এবং ফারসি ভাষায় ‘আল-মুসাফ্ফা মিন আহাদীসিল মুয়াত্তা’ রচনা করেন। তাঁর বিশেষত্ব হলো হাদিসকে ফিকহি বিশ্লেষণের আলোকে উপস্থাপন করা, যা পরবর্তীকালে ভারত উপমহাদেশীয় হাদিসচিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।

দারুল উলুম দেওবন্দ ও প্রাতিষ্ঠানিক হাদিসচর্চা

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারত উপমহাদেশে হাদিসশাস্ত্র একটি সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে। দেওবন্দের আকাবিররা পাঠ্যক্রম প্রণয়নে এমন এক ধারাবাহিকতা অবলম্বন করেন, যেখানে প্রথমে ভাষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি (সরফ, নাহু, বালাগাত, লুগাত, ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, কালাম, মানতিক) নিশ্চিত করা হয়, তারপর পর্যায়ক্রমে মিশকাত শরিফ ও সর্বশেষে সিহাহ সিত্তাহ পাঠদান করা হয়।

এই পদ্ধতির ফলে ছাত্ররা শুধু হাদিস মুখস্থকারী নয়, বরং হাদিস অনুধাবনকারী আলেম হিসেবে গড়ে ওঠে। এখান থেকেই আরবি ও উর্দু ভাষায় সিহাহ সিত্তাহ, মুসান্নাফাত ও মুয়াত্তার ওপর অসংখ্য শরাহ ও হাশিয়া রচিত হয়।

মোটকথা সংক্ষেপে বলা যায়, ভারত উপমহাদেশ তথা পাক ও হিন্দে হাদিসশাস্ত্র শুধু সংরক্ষিতই হয়নি, বরং তা ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে এক পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানপরম্পরায় রূপ লাভ করেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এখানকার আলেমদের হাদিসভিত্তিক রচনাগুলো একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ গ্রন্থভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে, যা আজও বিশ্বব্যাপী হাদিসচর্চার ক্ষেত্রে এক অনন্য অবদান হিসেবে বিবেচিত।

তথ্যঋণ : পাক ও হিন্দ মেঁ মুসলমানু কা নিজামে তালিম ওয়া তারবিয়্যাত, পৃষ্ঠা-১১২, মাওলানা মানাজির আহসান গিলানি।