সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
শুরুটা ‘পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন’ নামে, ১৯৫৭ সালে। দেশ স্বাধীনের পর এটি হয়েছে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন’। তবে সবার কাছে সংক্ষেপে এফডিসি নামেই প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি। দেশের চলচ্চিত্রের বিকাশের মূল কেন্দ্র এটি।
একসময় বেশ রমরমা ছিল প্রতিষ্ঠানটি। সময় ও প্রযুক্তির পালাবদলে এখন অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে। নেই আগের মতো কার্যক্রম, নির্মাতা-শিল্পীদের আনাগোনা। অনেক বছর ধরে গুনতে হচ্ছে লোকসানও।

মাঝে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কয়েক মাসের বেতনও বকেয়া পড়ে যায়। এ নিয়ে আন্দোলন, মানববন্ধন হয়েছিল। তবে চলচ্চিত্র তথা এফডিসির উন্নয়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
সম্প্রতি এফডিসি এবং সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির জায়গা ও সম্পদের বিকল্প ব্যবহার করা যায় কি না।
সেই সঙ্গে যেসব জ্যেষ্ঠ কর্মী অবসরে যেতে চান, তাঁদের ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে আলোচনায়। এ নিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এফডিসিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যদিও বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ নিয়েই কথা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁরা স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে চান, তাঁদের এককালীন বেশ কিছু টাকা দেওয়া হবে।
এদিকে অস্পষ্টতার কারণে নানা কথা চাউর হচ্ছে। কেউ বলছে, এফডিসি বন্ধের পাঁয়তারা করা হচ্ছে; কেউ আবার বলছে, এফডিসিকে ঢাকা থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে। আবার কেউ কেউ বলছে, এফডিসিকে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়া হবে। সেখান থেকেই এটি পরিচালিত হবে। তবে কোনো কিছুরই স্পষ্ট খবর মিলছে না। বিষয়টি জানতে এফডিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানির মুঠোফোনে কয়েকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফডিসির এক কর্মকর্তার কাছে পুরো বিষয়টি নিয়ে পাওয়া গেল ইতিবাচক মন্তব্য। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন এমডি। এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সংকটও সমাধান করেছেন তিনি। এখন মাসের ১ তারিখেই বেতন পেয়ে যান কর্মীরা। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার পর সরকার এফডিসির দিকে সেভাবে মনোযোগ দেয়নি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণের আধুনিক সরঞ্জাম ও উন্নত ক্যামেরা নিয়ে এলেও এফডিসি থেকে যায় পিছিয়ে। ২০১৫ সালে কিছু ক্যামেরা আনা হলেও তা পুরনো মডেলের। ফলে নির্মাতারা সেগুলো ব্যবহারে আগ্রহ পায়নি। এ কারণেই দিন দিন পিছিয়ে পড়েছে এ প্রতিষ্ঠান। এখন এফডিসির অব্যবহৃত যেসব জায়গা ও সম্পদ রয়েছে, সেগুলোকে বিকল্প ব্যবহারের মাধ্যমে লোকসান থেকে মুক্তি পেতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। তবে এফডিসি বন্ধ করে দেওয়ার কোনো আশঙ্কা তিনি দেখছেন না বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
আমাদের সঙ্গে আলোচনারও প্রয়োজন মনে করেনি
কাজী হায়াৎ চলচ্চিত্র নির্মাতা
এফডিসিতে যাই না, এটির বিষয়ে এখন আর মাথাও ঘামাই না। এটা সরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকার যা ইচ্ছা করবে, আমি কী বলতে পারি? তবে হ্যাঁ, এককালে যেখানে এত এত কাজ করেছি, সেটা যদি বন্ধ বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়, তা দুঃখজনক। কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে আলোচনারও প্রয়োজন মনে করেনি। চলচ্চিত্র নিয়েই তো কথা বলে না, এফডিসি তো পরের ব্যাপার। এখন সেন্সর [সার্টিফিকেশন] বোর্ড, জুরি বোর্ড, অনুদান কমিটিতে কারা? আগে চলচ্চিত্রের সিনিয়র মানুষ থাকত, এখন এগুলো কারা চালাচ্ছে? এসব নিয়ে গণমাধ্যমের লেখালেখি করা উচিত।
ভবিষ্যৎ ভালো হবে না
বদিউল আলম খোকন চলচ্চিত্র নির্মাতা
বিএফডিসি মানে তো বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানই ছিল সব সময়। দেশের সংস্কৃতি বিকাশে, চলচ্চিত্র নির্মাণে সাহায্য করে এসেছে। এখন হঠাৎ করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করার চিন্তা-ভাবনা কোথা থেকে এলো? এই যে চলচ্চিত্র বিকাশে সরকার প্রতিবছর অনুদান দিচ্ছে, সেটাও কি তাহলে খুব শিগগির বন্ধ হয়ে যাবে? আমরা জানতে পেরেছি, অনেকটা গোপনেই এফডিসিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সেটা হলে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবশ্যই নড়েচড়ে বসা উচিত। নইলে ভবিষ্যৎ ভালো হবে না।
ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলবে?
দীপঙ্কর দীপন চলচ্চিত্র নির্মাতা
এখানে অ্যাপ্রোচে একটা বড় ভুল আছে। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা বা ব্যবসা করা নয়। সারা বিশ্বে যত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আছে, সবখানেই রাষ্ট্রের বড় একটা ফান্ড থাকে চলচ্চিত্রের জন্য। আমাদের হয়তো অত বড় ফান্ড নেই। তবে যেটুকু আছে, সেটা থেকে মুনাফা লাভের চিন্তা করা বোকামি। চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান দিয়ে কোনো দেশের সরকারই চিন্তা করে না যে ওই টাকা লাভসমেত ফিরে আসবে। এফডিসির বিষয়টাও তেমনই। এফডিসির সংকট আছে, লোকসান আছে; কিন্তু সেই সমস্যার জন্য কি এটা বন্ধ করার কথা ভাবতে হবে? মাথা ব্যথা হলে কি মাথা কেটে ফেলবে? এফডিসিকে কবিরপুরে স্থানান্তর করতেই পারে, কিন্তু ঢাকায় একটা সেন্টার থাকা জরুরি। কারণ আমাদের চলচ্চিত্র ঢাকাকেন্দ্রিক। দীর্ঘদিন ধরে এখানেই চলচ্চিত্রের জগৎ গড়ে উঠেছে।
গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের যে প্রস্তাব, সেটাতে কিন্তু আমাদের আপত্তি নেই। যাঁরা অনেক বছর এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, এখন বয়সের ভারে আর কাজ করতে পারছেন না, তাঁরা যদি ভালো অঙ্কের সম্মানি নিয়ে অবসরে যেতে পারেন, এটা ইতিবাচক। কিন্তু কোনোভাবে প্রতিষ্ঠান বন্ধের চিন্তা করার সুযোগ নেই। বরং এফডিসি কেন লোকসান গুনছে, কেন এখানকার ক্যামেরা, সরঞ্জাম ব্যবহারে আগ্রহী নন নির্মাতা, সেসব কারণ খুঁজে বের করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর করতে হবে।
এই সিদ্ধান্ত হঠকারী
খোরশেদ আলম খসরু প্রযোজক-পরিবেশক
রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি কেন বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হবে? খবরটা শুনে খারাপ লেগেছে। হ্যাঁ, লস প্রজেক্ট। কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না। তার জন্য তো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বড় শপিং মল তৈরি করা হচ্ছে। সেটাও প্রায় সম্পন্ন। তাহলে এই সময়ে এ বুদ্ধিটা দিয়েছে কে? এফডিসি যদি প্রাইভেট কম্পানির হাতে পড়ে তাহলে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। এমনিতেই ছবি নির্মাণ হচ্ছে না, এরপর মোটেও হবে না। যাঁরা মাঝারি প্রযোজক তাঁরা তো আর সিনেমা নির্মাণ করতে পারবেন না। মিনিমাম একটা কস্ট তখন বেঁধে দেবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আমার মনে হয়, এই সিদ্ধান্ত হঠকারী। চলচ্চিত্র ধ্বংস করার পাঁয়তারা ছাড়া আর কিছু নয়।









