সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
বাংলাদেশের সংগীতজগতে বহু কিংবদন্তি শিল্পী আছেন, যাঁদের সুরের মাধুর্য প্রজন্ম পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মায়ের গানের পথ ধরে মেয়েরাও ধরেছেন সুরের হাল, গড়ে তুলেছেন নিজস্ব পরিচিতি। কখনো একসঙ্গে, কখনো আলাদা মঞ্চে—তাঁদের কণ্ঠে বেজেছে অনুরাগ, ঐতিহ্য আর ভালোবাসার সুর। এই প্রতিবেদনে থাকছে সেইসব সুরেলা মা-মেয়ের গল্প।
গানের পাখির সুরের বাঁধন

বাংলা গানের পাখি বলা হয় সাবিনা ইয়াসমিনকে। দেশের সফলতম গায়িকাও তিনি। শৈশবেই গানের চর্চার সূচনা।
সাত বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে গাওয়া। প্রথম চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন ‘নতুন সুর’ [১৯৬২] ছবিতে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্লেব্যাক গায়িকা হলেন ‘আগুন নিয়ে খেলা’র [১৯৬৭] মাধ্যমে। বাকি ইতিহাস শ্রোতাদের কমবেশি সবার জানা।
সাবিনার কন্যা ইয়াসমিন ফাইরুজ বাঁধন।
বেড়ে উঠেছেন সুরেলা পরিবেশে। পেশায় ব্যাংকার হলেও গানের প্রতি অদম্য ভালোবাসা। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় বাঁধনের প্রথম অ্যালবাম ‘প্রতিচ্ছবি’। এতে মা সাবিনার সঙ্গে চারটি দ্বৈত গান করেন বাঁধন, বাকিগুলো একক।
২০১৭ সালে প্রকাশ করেন ‘আবার দুজনে’ অ্যালবাম। এখানেও তিনটি গান করেছেন মায়ের সঙ্গে। এ ছাড়া টিভি অনুষ্ঠান ও সরাসরি অনুষ্ঠানেও দুজনে বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে গান করেছেন।
উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় গায়িকা রুনা লায়লা। বাবার চাকরির সুবাদে পাকিস্তানে বড় হওয়া। সেখান থেকেই সংগীতে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ। ১৯৬৪ সালে উর্দু ছবি ‘জুগনু’তে প্রথম গান। এর পর থেকে পাকিস্তানের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে নিয়মিত গান করেছেন রুনা লায়লা। স্বাধীনতার আগের বছর গাইলেন দেশের চলচ্চিত্র ‘স্বরলিপি’তে [১৯৭০]। বর্ণিল ক্যারিয়ারে প্রায় ১৮ ভাষায় ১০ হাজারেরও বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।
তাঁর একমাত্র কন্যা তানি লায়লা। মায়ের পথ ধরে ছোটবেলা থেকে তিনিও গান করেন। তবে পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েননি। বিয়ের পর সংসারী হয়ে পাড়ি জমান বিদেশে। তবে গানের প্রতি ভালোবাসা বরাবরই ছিল। প্রকাশ করেছেন ‘প্রথম ভালোবাসা’ শীর্ষক একক অ্যালবাম। মায়ের সঙ্গে গানের চর্চা করেছেন। একসঙ্গে গেয়েছেন মৌলিক গানও। ২০২০ সালে ইউটিউবে আসে ‘সুন্দর ভিড় করে’। কবির বকুলের লেখা গানটির সুর-সংগীত মাকসুদ জামিল মিন্টুর। দ্বৈতভাবে গেয়েছেন রুনা ও তানি। আবার মায়ের সুরেও গেয়েছেন তানি। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘কেন হয়ে গেছি পর’। কথা গাজী মাজহারুল আনোয়ারের, সুর করেছিলেন রুনা, কণ্ঠে তানি।
নজরুলসংগীতের নন্দিত শিল্পী নাশিদ কামাল। সংগীতের বিখ্যাত পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বড় হয়ে অধ্যাপনাকে পেশা করেছেন। তবে গানও চলেছে সমান্তরালে। গানের মাধ্যমেই তিনি পেয়েছেন খ্যাতি। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পিটিভির [বর্তমান বিটিভি] উদ্বোধনী দিনে গেয়েছিলেন শিশুশিল্পী নাশিদ কামাল। নজরুলসংগীতের পাশাপাশি লোকসংগীত, ক্লাসিক্যাল, গজলেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
তাঁর সুযোগ্য কন্যা আরমীন মুসা এই সময়ের শিল্পী। বাংলায় ‘কয়্যার’ সংগীতের প্রচলন করেছেন তিনি। মা-মেয়ে একসঙ্গে গানও করেছেন। তাঁদের মাধ্যমেই প্রথমবার বাংলাদেশের নাম ওঠে সংগীতের অস্কার গ্র্যামি পুরস্কারে। ৬৫তম গ্র্যামিতে বার্কলি ইন্ডিয়ান অনসাম্বলের অ্যালবাম ‘শুরুওয়াত’ মনোনয়ন পায়, এতে নাশিদ কামালের লেখা ও সুরে ‘জাগো পিয়া’ গানে কণ্ঠ দেন আরমীন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রযোজনায় ‘সংগ্রাম’ [২০১৪] ছবিতেও গান করেছেন মা-মেয়ে।
একবিংশ শতকের শুরুর দশকে বাংলাদেশের সংগীতে জনপ্রিয়তা পাওয়া গায়িকাদের মধ্যে নাজমুন মুনিরা ন্যান্সির নাম আসে সবার আগে। ২০০৬ সালে ‘হৃদয়ের কথা’ দিয়ে প্লেব্যাকে তাঁর অভিষেক। শুরুতেই বাজিমাত। ন্যান্সির প্রথম একক অ্যালবাম ‘ভালোবাসা অধরা’ [২০০৯]। এর পর থেকে নিয়মিত গাইছেন।
ন্যান্সির কন্যা মারজিয়া বুশরা রোদেলা। মায়ের কণ্ঠের সুর জিনগতভাবে কিছুটা এসেছে রোদেলার মধ্যেও। ২০১৯ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন প্রথম গান নিয়ে আসেন—নজরুলগীতি ‘প্রজাপতি প্রজাপতি’। এ গানে হামিং দিয়েছিলেন মা ন্যানিস। পরে মৌলিক গানে আসেন রোদেলা। ২০২২ সালে প্রকাশ করেন ‘স্বপ্ন বিলাস’। এরপর বেশ কয়েকটি গানে পাওয়া গেছে রোদেলাকে। মেয়ের গান কাভার করে মা ন্যানিসও পেয়েছেন বাহবা। তবে মা-মেয়ের প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বৈত গান ‘কেন’ প্রকাশিত হয়েছে এ মাসেই। ফয়সাল রাব্বিকীনের কথায় গানটির সুর-সংগীতে প্রত্যয় খান।
১৯৮৯ সালে ‘হে যুবক’ অ্যালবাম দিয়ে সংগীতে ডলি সায়ন্তনীর রাজসিক আত্মপ্রকাশ। রাতারাতি তাঁর কণ্ঠ ও গান ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। অতঃপর অডিও আর চলচ্চিত্রের গানে তুমুল ব্যস্ততা। প্রথম প্লেব্যাক ‘উত্থান পতন’ [১৯৯২]-এ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রায় ৭০০ চলচ্চিত্র, ১৫টি একক ও শতাধিক দ্বৈত ও মিশ্র অ্যালবামে গান করেছেন তিনি।
ডলির তিন কন্যা—কথা, রিমঝিম ও ফাইজা। মায়ের মতো তাঁরাও গান ভালোবাসেন, গানের চর্চা করেন। ২০২০ সালে স্বামী ফাইজান খানের পরামর্শে তিন কন্যাকে নিয়ে গান করেন ডলি। ‘পারি না ভুলতে তোকে’ শিরোনামের গানটির কথা সুদীপ কুমার দীপের, সংগীতে আকাশ মাহমুদ। প্রায় পাঁচ বছর পর সেই গান প্রকাশিত হয়েছে এ বছরের ১০ এপ্রিল। এ ছাড়া মায়ের একটি পুরনো গানও নতুন করে কাভার করেছেন তাঁরা—‘কত রাত’। তিন কন্যার সঙ্গে কণ্ঠ দেন মা ডলিও।
রবীন্দ্রসংগীতের নন্দিত কণ্ঠশিল্পী মিতা হক। তাঁর কন্যা ফারহিন খান জয়িতাও গান করেন। মায়ের পথ অনুসরণ করে রবীন্দ্রসংগীতেই নিজেকে মেলে ধরেছেন। প্রকাশ করেছেন কয়েকটি অ্যালবাম। নজরুলসংগীত শিল্পী হিসেবে ফাতেমা-তুজ-জোহরার নাম প্রথম সারিতে। কিংবদন্তি এ শিল্পীর কন্যা নাজিয়া মিশকাত তমাও নজরুলের গান করেন। ২০১৬ সালে প্রকাশ করেন প্রথম অ্যালবাম ‘প্রথম প্রদীপ জ্বালো’, যেখানে তাঁর মায়েরও ভূমিকা রয়েছে। লোকসংগীতের নন্দিত শিল্পী চন্দনা মজুমদার। তাঁর কন্যা শতাব্দী রায়ও গান করেন। মায়ের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে লোকগান পরিবেশন করেছেন। পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রেখে গান করছেন সামিনা চৌধুরী, পেয়েছেন খ্যাতিও। তাঁর একমাত্র কন্যা ফাবাশির তেজি খানও গান করেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর গান প্রকাশিত হয়েছে। আবার মায়ের সঙ্গেও বিভিন্ন মঞ্চে গান পরিবেশন করেছেন।









