অর্থ ও বাণিজ্য

বেসরকারি খাতে মন্দা : অনিশ্চয়তায় শিল্প-বিনিয়োগ

নিউজ ডেস্ক২৯ জুলাই ২০২৫৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বেসরকারি খাত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, ডলারের অপ্রতুলতা, আমদানি-নির্ভরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের ফলে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এছাড়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ কম, উল্টো চালু থাকা অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

ফলে কর্মসংস্থানে খরা নেমে এসেছে। আর্থিক সংকটের কারণে এক-চতুর্থাংশ ব্যাংকঋণ দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণের পরিবর্তে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগেই এখন বেশি মনোযোগী। এসব কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
গত জুনের শেষে বেসরকারি খাতের ঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গত ২২ বছরের যেসব তথ্য রয়েছে, তাতে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এমন পরিস্থিতিতে আগামী বৃহস্পতিবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমানো ও বেসরকারি খাতকে চাঙা রাখাই বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব।

কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এখন বেসরকারি খাতের দিকে একবারেই নজর দিচ্ছে না। ফলে অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানের ঋণও খারাপ হয়ে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে নজর দেওয়া উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের। 

গত বছরের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেকের ব্যবসা সীমিত হয়ে পড়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে।

আবার পর্ষদে পরিবর্তন হওয়া ১৪টি ব্যাংকের কোনোটির ঋণ কার্যক্রম বন্ধ, আবার কোনোটি ঋণ সীমিত করেছে। কারণ, কমপক্ষে পাঁচটি ব্যাংক গ্রাহকের জমা টাকা তোলার চাহিদা মেটাতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে ৯টি ব্যাংক ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সাইফুল আলমের (এস আলম) নিয়ন্ত্রণে। বাকিগুলোর একটি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও দুটি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। 

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের পোশাক ও বস্ত্র খাতের কমপক্ষে ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণসুবিধা বন্ধ করা হয়েছে। দেশের ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বেক্সিমকো গ্রুপের ৭৮টি প্রতিষ্ঠানের দায়ের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন একাধিক কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। এস আলমের ছেলে আহসানুল আলমের ইনফিনিয়া গ্রুপ ও জামাতা বেলাল আহমাদের ইউনিটেক্স গ্রুপের অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।

চট্টগ্রামে ৫ আগস্টের পর প্রথম ৭ মাসে ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই পোশাক, সুতা তৈরি ও জুতার কারখানা। মূলত অর্থায়ন সংকটের কারণে বেশির ভাগ কারখানা বন্ধ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ নিয়মিত করার জন্য আবেদন করেছে।

এর মধ্যে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীসহ আরো কিছু ব্যবসায়ীর ঋণ বিশেষ উদ্যোগে নিয়মিত করা হয়েছে। তবে সেই সংখ্যা ১০০-এর মতো। এখনো ১ হাজার ১০০ প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব ঋণ অবশ্য খেলাপি হয়ে আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। যেমন ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ বের করা অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা এখনো সন্তুষ্ট নন। ব্যাংক  ঋণের সুদের হার ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুটিই বেড়েছে। আর্থিক খাতে এখন সংস্কার চলছে, ফলে নতুন প্রকল্পে খঋণ দেওয়া বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রতি মাসেই খঋণে প্রবৃদ্ধি কমছে। গত বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের খঋণে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩০ শতাংশ। এরপর গত ডিসেম্বরে তা ৭ দশমিক ২৮৮০ শতাংশে নামে। পরের মাস জানুয়ারিতে আরো কমে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ হয়। ফেব্রুয়ারিতে নেমে যায় ৬ দশমিক ৮২ শতাংশে। এরপর মে মাসে ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ ও জুনে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়

এখন মুদ্রানীতির লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরী গণমাধ্যমকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি কমানো, সেদিকে বেশি নজর দিচ্ছে সংস্থাটি। তবে বর্তমান সে পরিস্থিতি, তাতে দেশের কোনোটাই ঠিক নেই। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীরা কেউ বিনিয়োগ করবেন না। তবে যাদের ঋণ খারাপ হয়ে পড়েছে, তাদের নীতিসুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি সুদহার সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।

সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর্থিক অনিয়ম, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট এবং সুদহার বৃদ্ধি—এই সবকিছু দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি করেছে। বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন, বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পাচ্ছে।

এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে প্রয়োজন অর্থনৈতিক নীতিমালায় সময়োপযোগী সংস্কার, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ও স্বল্পসুদে ঋণপ্রাপ্তির ব্যবস্থা। একইসঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবসায়ী শ্রেণির আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে মন্দা রোধে প্রধান করণীয়। অন্যথায় অর্থনীতির এই গতি থেমে গিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন প্রচেষ্টাই ব্যাহত হতে পারে।