সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
কিংবদন্তি নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ফিরোজা বেগমের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হওয়া স্বর্ণপদক পেয়েছেন আরেক জনপ্রিয় শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন।
প্রয়াত এই শিল্পীর ৮৬তম জন্মবার্ষিকীতে বৃহস্পতিবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ফিরোজা বেগম স্মৃতি ট্রাস্ট ফান্ড থেকে এই স্বর্ণপদক দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে সাবিনা ইয়াসমিনের গলায় স্বর্ণপদক পরিয়ে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
পদকপ্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “আজ আমার জীবনের অত্যন্ত স্মরণীয় দিন, অত্যন্ত আনন্দের দিন, অত্যন্ত গর্বের দিন। আমাদের সবার প্রিয় শিল্পী, আমার তো নিশ্চয়ই; সারা পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যারা ফিরোজা বেগমের গান শুনেছেন, কিন্তু তাদের ভালো লাগেনি।”
ফিরোজা বেগম স্বর্ণপদক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবিনা ইয়াসমিন।
পদক গ্রহণের পর দর্শক অনুরোধে গান গেয়ে শোনান জনপ্রিয় এই শিল্পী।
তিনি বলেন, “আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া এই স্বর্ণপদক আমাকে দেওয়া হয়েছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, জুরি বোর্ড, ট্রাস্টি বোর্ডের সব সদস্য এবং ফিরোজা আপার পরিবারের সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ভালোবাসা জানাচ্ছি।”
ফিরোজা বেগমের স্মৃতিচারণ করে এই শিল্পী বলেন, “ফিরোজা আপার সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল কমল দাশ গুপ্তের শততম জন্মবার্ষিকীতে। সেখানে তিনি এই বয়সে কি অদ্ভূত সুন্দর গান গেয়েছিলেন, আমি একদম অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এবং শাফিনকে বললাম, ‘দেখ শাফিন আমরা কি পারব এরকম’?
“ফিরোজা আপার মতো মহান শিল্পী যুগে যুগে আসে না। আসবে কি না তাও জানি না।”
ফিরোজ বেগমের গানে মুগ্ধতার কথা উঠে আসে সাবিনা ইয়াসমিনের কথায়।
সাবিনা ইয়াসমিনের হাতে পুরস্কারের চেক তুলে দেন ফিরোজা বেগম ট্রাস্ট ফান্ডের দাতা এসিআই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এম আনিস উদ দৌলা।
দেশের বাইরে থেকে ৩০ জুলাই ঢাকা ফেরার কথা থাকলেও এই অনুষ্ঠানের জন্য আগেই ফিরেছেন বলে জানান সাবিনা ইয়াসমিন।
নিজের কাছে এ পদকগ্রহণ অনুষ্ঠানের যে গুরুত্ব তা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন জনপ্রিয় এই শিল্পী।
“একদিকে ভীষণ খুশি হলাম, আরেক দিকে মনটাও খারাপ হলো। ভাবলাম এতো আগে চলে যেতে হচ্ছে। দুইটার মধ্যে আমি এটাকে বেছে নিলাম। কারণ এ ধরনের সুযোগ আর কখনও পাব না।”
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “ফিরোজা বেগম কী ধরনের শিল্পী ছিলেন তা বলার প্রয়োজন পড়ে না, আমরা সবাই জানি। এদেশের প্রতিটি মানুষের মনে ফিরোজা বেগমের স্মৃতি এখনও অম্লান হয়ে রয়েছে।
“আমাদের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা সঠিকভাবে বলেছেন, একজন কিংবদন্তি শিল্পীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত পুরস্কার আরেক কিংবদন্তি শিল্পীর হাতে হস্তান্তর করা হচ্ছে।”
অনুষ্ঠানে কথা বলছেন উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
ফিরোজা বেগম ও সাবিনা ইয়াসমিনকে কিংবদন্তি শিল্পী বলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।
ফিরোজা বেগম বাংলাদেশের সঙ্গীতকে ‘বহু দূর’ এগিয়ে নিয়ে গেছেন মন্তব্য করে অধ্যাপক আরেফিন বলেন, “আজকে একবিংশ শতাব্দীতে সাবিনা ইয়াসমিন সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে সঙ্গীতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সব কটা জানালা খুলে দাও না, আমি গাইব গাইব বিজয়ের গান- এ গান শুনলে কোনো বাঙালির পক্ষে চোখের পানি সংবরণ করা অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা প্রাণ দিয়ে গেছেন, তাদের প্রতি এর মাধ্যমে আমরা শ্রদ্ধা জানাই।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের চেয়ারপারসন মোহসিন খানম (লীনা তাপসী) বলেন, “ফিরোজা বেগম কোনো শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধিকা। সঙ্গীত যে সাধনার বিষয় তা বোঝা যেত তার চলায়-বলায়, তার পরিবেশনায়।
“তাকে দেখে বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীদের মধ্যে সঙ্গীতের শুরু। তিনি সকল ধারার শিল্পীদের মাঝে একজন অনুকরণীয় অভিভাবক ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।”
নজরুল ইসলামের সুর আর বাণী কণ্ঠে ধরে সাত দশক ভক্তহৃদয়ে রাজত্ব করে ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৮৪ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন শিল্পী ফিরোজা বেগম।
১৯৩০ সালের ২৮ জুলাই গোপালগঞ্জ জেলার রাতইল ঘোনাপাড়া গ্রামের এক জমিদার পরিবারে ফিরোজা বেগমের জন্ম। তিনি যখন গানের জগতে প্রবেশ করেন তখনকার বাঙালি মুসলমান সমাজে মেয়েদের সংগীতের তালিম নেওয়া সহজ বিষয় ছিল না।
ফিরোজা বেগমের বয়স দশ বছর পেরুনোর আগেই তার কণ্ঠে নিজের গান শুনে মুগ্ধ হন কবি নজরুল। শৈশবের সেই দিনগুলোতে নজরুলের কাছ থেকেই তার কয়েকটি গানের তালিম পেয়েছিলেন ফিরোজা বেগম।
১৯৫৫ সালে সুরকার কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে বিয়ে হয় ফিরোজার। নজরুলের সরাসরি সংস্পর্শে আসা কমল বিদ্রোহী কবির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গানে সুর দিয়েছেন। ফিরোজা নিজেও পরে নজরুলের গানের স্বরলিপি তৈরি করেন; সুর সংরক্ষণে ভূমিকা রাখেন।
নজরুলসংগীত ছাড়াও ফিরোজার কণ্ঠ থেকে ভক্তরা শুনেছে রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান, গজল, কাওয়ালি ও ভজন।
অনুষ্ঠানে ফিরোজা বেগমের ছেলে শাফিন আহমেদ, যিনি নিজেও ব্যান্ডসঙ্গীতের জনপ্রিয় শিল্পী।
ফিরোজা বেগমের ছেলে শিল্পী শাফিন আহমেদ বলেন, তার মায়ের গানগুলি বই আকারে বের হওয়ার দরকার ছিল তার জীবদ্দশায়।
“আমার জানা ছিল উনি রাজি হয়েছিলেন, উনি সময় দিতে চেয়েছিলেন, কারও কারও কাছে কিছু পাণ্ডুলিপি জমাও হয়েছে। তবে সম্পূর্ণ পুস্তক আকারে এখনও বের হয়নি। এই একটা কাজে হয়তো আমাদের সবার প্রচেষ্টা দরকার।”
তিনি বলেন, “আমার বাঙলি সমাজে যত মনীষী নারীদের কথা মনে করে থাকি, তাদের মধ্যে ফিরোজা বেগমের নাম অবশ্যই আসবে। কোনো একদিন হয়তো দেখব- পাঠ্যপুস্তকে ফিরোজা বেগমের জীবনী আসছে।”
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগ থেকে ২০১৫ সালের স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া পার্থপ্রতীম মিত্রকে স্বর্ণপদক এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কৃতি ছাত্র নজরুল ইসলাম মাসুদ খানকে অনুদান দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের শেষপ্রান্তে দুই শিক্ষার্থীর গান পরিবেশনের সূচি রেখেছিলেন আয়োজকরা। তবে দর্শকসারি থেকে সাবিনা ইয়াসমিনের গান পরিবেশনের অনুরোধ আসে।
এ সময় সঙ্গীত বিভাগের চেয়ারপারসন মোহসিনা খানম (লীনা তাপসী) মঞ্চে এসে বলেন, “তার সুর না নিলে আমাদের অনুষ্ঠান অপূর্ণ থেকে যাবে। আমরা তার সুরের সুধা নিয়ে যেতে চাই।”
দুই ছাত্রের গানের পর সাবিনা ইয়াসমিন গেয়ে শোনান তার বিখ্যাত গান ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’। এরপর দর্শক সারি থেকে একে একে অনুরোধ আসতে থাকে।
এরপরও দর্শকসারি থেকে অনুরোধ আসতে থাকলে তিনি গেয়ে শোনান, ‘রেল লাইনের ওই মেঠো পথটার পাড়ে দাঁড়িয়ে’ গানটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) নাসরীন আহমাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এম আনিস উদ দৌলা।
অন্যদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপারসন শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ফিরোজা বেগমের ছেলে হামিন আহমেদ বক্তব্য দেন।
সূত্র: বিডি নিউজ









