শিক্ষা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মান প্রশ্নবিদ্ধ!

নিউজ ডেস্ক৩১ ডিসেম্বর ২০১৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

 

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষকদের মান নিয়ে যখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছে, তখন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণার ফলাফলের সমালোচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান। তিনি বলেছেন, তথ্যের নামে মনগড়া অভিমত দিবেন না। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে অভিমত দিয়ে টিআইবি নিজেরাই সমালোচনার মুখে পড়েছে।

 
বাংলা ট্রিবিউন আয়োজিত ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়: নতুন ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক বৈঠকিতে ইউজিসি চেয়ারম্যান টিআইবির এমন সমালোচনা করেছেন। বৈঠকি উপস্থিত বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ধরনের পরিকল্পনায় ঘাটতির জায়গা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ইউজিসি চেয়ারম্যান, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এ বৈঠকিতে বক্তারা প্রশ্ন তুলে বলেন, নতুন যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাত্রা শুরু করেছে তার অনেকগুলোতেই একজন অধ্যাপকও নেই।

 

এ পরিস্থিতিতে কিভাবে মান নিশ্চিত করা যায়?
মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, ইউনিভার্সিটি অব লিবারাল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) শিক্ষক ড. সলিমুল্লাহ খান, ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের উপদেষ্টা রহিম তালুকদার, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইডি) প্রধান নির্বাহী সাঈদ আহমেদ, সাংবাদিক রেজা নূর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শয়ন ও বাংলা ট্রিবিউনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জুলফিকার রাসেল।

 

গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে বৈঠকিতে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘সমালোচনা হলে মনে হয় প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। পাবলিক ইউনিভার্সিটি নিয়ে সমালোচনা হলে বুঝতে হবে তারা কাজ করছে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে সিপিডির প্রতিবেদনটি নিয়ে কথা হচ্ছে। তারা অপ্রাসঙ্গিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সমালোচনা করতে তথ্যের নামে অভিমত প্রকাশ করে।’

 
ইউজিসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমাদের কাজ করতে ভুল হয়-ই। অনিয়মও কিছু হয়। তখন কাজটিকে আইনের মধ্যে রেখে সমাধান করতে চাই। সবসময় পারি তা নয়। তারপরও ঢালাও মন্তব্য করার সুযোগ নেই।’

 
বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও গবেষণার বিষয়ে প্রশ্ন উঠছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘পাবলিক ইউনিভার্সিটি পাবিলক ফান্ডেড প্রতিষ্ঠান। সে কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মানুষের আগ্রহ থাকবে। সাধারণ মানুষ জানতে চাইবেন, তাদের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা। এটাই স্বাভাবিক। যে প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ হচ্ছে এগুলো বস্তুনিষ্ঠ হলে বা এগুলোতে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ তুলে ধরা হলে আমাদের জন্য সুবিধা হবে।’

 
ঢাবি উপাচার্য আরও বলেন, ‘কোথাও কোথাও ভুল-ত্রুটি হতে পারে, বিচ্যুতি ঘটতে পারে। সেটাকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। সমস্যা হলো- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এমন কিছু প্রতিবেদন আসে যেগুলোতে ঢালাও মন্তব্য করা হয়।’

 
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নত হতে হলে শিক্ষকদের মান বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি যাদের চিনি তাদের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন। আমি নিজের মান নিয়েও সন্তুষ্ট নই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যে যে বৈষম্য আছে সেগুলো আলোচনা করা উচিত।’

 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনার সমালোচনা করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘এত নিম্নমানের প্রকাশনা গ্রামের হাইস্কুলও করে না। কাগজ ভালো না। তবে টিআইবি যে গবেষণা করেছে সেটাকে বলে পারসেপশন রিসার্চ। তাদের কথা মিথ্যা, তা বলা যায় না।’

 
পাবলিক বা প্রাইভেট- এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আলাদা করা উচিত না বলে মনে করেন ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের উপদেষ্টা রহিম তালুকদার। তিনি বলেন, ‘টিচিং ইউনিভার্সিটি নাকি রিসার্চ ইউনিভার্সিটি নিয়ে ভাবছি সেটা বোঝা দরকার। শিক্ষকদের কাজ টিচিং, রিসার্চ এবং তারপর সামাজিক দায়বদ্ধতা। বিশ্বের শীর্ষস্থানে যেতে যে গবেষণা দরকার তা আমরা করতে পারছি না। কারণ আমরা রিসার্চ কালচার তৈরি করতে পারিনি। ছাত্র হিসেবে আমি রিসার্চ মেথডলজি শিখছি। কিন্তু শিক্ষক হওয়ার পর সেই জায়গাটিতে আমি কতটা সময় দিচ্ছি নাকি আগের জায়গাতেই রয়ে যাচ্ছি, সেটা দেখতে হবে। আগের জায়গাতেই থেকে যাওয়াতে গুণগত মান উন্নত হচ্ছে না।’

 
ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইডি) প্রধান নির্বাহী সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে পেশা হিসেবে গবেষক ও শিক্ষক আলাদা হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবেও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আলাদা হয়ে গেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে যে সমালোচনা ওঠে সেগুলো করতে গিয়ে ধরণটা ঠিকভাবে না হওয়ায় উল্টো সমালোচনাকারীই তোপের মুখে পড়েন। তাতে মূল সমস্যাটা চাপা পড়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েকবছরে র্যাং কিং কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে আমরা কেউ খেয়াল করি না। করতে গেলে শিক্ষকদের কথা চিন্তা করতে হবে। এখনও বেশিরভাগ শিক্ষকই তার ছাত্র জীবনের নোট দেখেই ক্লাসে ছাত্রদের পড়ান।’

 
সাংবাদিক রেজা নূর রহমান প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবসা করতে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ঢাকা শহরে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখে মায়া হয়। আমার কাছে মনে হয়, টিআইবির রিপোর্ট সমালোচনা করবেন না। যা রটে তা কিছুটা বটে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যারা এখানে আছি, সাংবাদিকতা করছি, আমরা ভালো খবর দিতে চাই।’

 
নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোর পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে কেউ নেই। এমন হলে কিভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিশ্চিত করা যায়?’ এ প্রশ্নের জবাবে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশে এত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যায়। পাশাপাশি শিক্ষকের চাহিদা বেড়েছে। ৩৭টি পাবলিক ও ৯৪ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন করে উপাচার্য দরকার। উপাচার্য হতে যে অভিজ্ঞতা দরকার সেটাই তো আমরা পাচ্ছি না।’

 
বর্তমানে বাজারে যেমন চাহিদা রয়েছে সেই চাহিদা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পূরণ করতে পারছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শয়ন বলেন, ‘আমাদের এখানে ভালো গবেষণায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নেই। গবেষণার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক জরুরি। কিন্তু শিক্ষকরা এই সুযোগ কেবল কেবল ক্লাসের প্রথম সারির দুয়েকজন শিক্ষার্থীকেই দিয়ে থাকেন। ওই শিক্ষার্থীরাই আবার পরবর্তী সময়ে শিক্ষকদের সহকর্মী হন। এর ফলে ওই গুটিকয়েক শিক্ষার্থী ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই গবেষণা বিষয়ে কোনও জানা-বোঝাই থাকে না।’

 

মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় আয়োজিত বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করে একাত্তর টেলিভিশন। এই বিষয়ে আগামীতে আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে বৈঠকিতে জানান বক্তারা।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন