সিল্কসিটিনউজ ডেস্ক :
২০০৬ সাল থেকে টানা লোকসান দিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি)। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কেবল বিটিএমসি নয়, আরও পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গত ১০ বছরে ৪৪ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছরে বিপিডিবি একাই লোকসান করেছে ৪০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এসময়ে লোকসান দেওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন বা বিআরটিসি, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট’ (বিএফএফডব্লিউটি), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। আর এসব লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে সরকার প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড.এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর লোকসানি হওয়ার জন্য সেখানকার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারের নীতিও দায়ী।’ তিনি বলেন, ‘লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা দায়িত্ব পালন করেন তাদের মধ্যে সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নেই।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘প্রতি বছর ভর্তুকি না দিয়ে বরং এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. জালাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করার জন্য স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উদ্যোগ নেওয়ার কথা।’ তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান করে যাচ্ছে সেখানে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদ আছে। তারাই দেখবে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে কিভাবে লাভজনক করা যায়।’
সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতি বছরই মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান গুনছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন। বিগত ১০ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি লোকসান করেছে ২ হাজার ৯১১ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে গত অর্থবছরেই বিএসএফআইসি লোকসান করেছে ৪৬২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এছাড়া ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন লোকসান দিয়েছে ২৩৪ কোটি টাকা। ১০ বছরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন লোকসান দিয়েছে ৪৬৬ কোটি টাকা।
২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট লোকসান করেছে ৮১ কোটি টাকা এবং টানা ১০ বছরে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন লোকসান দিয়েছে ৫১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সাল থেকে টানা লোকসান দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন বা বিআরটিসি। টানা ২৫ বছরে একবারের জন্যও এই দুই প্রতিষ্ঠান লাভের মুখ দেখেনি।
১৯৭১ সালের পর অর্থনৈতিক শূন্যতা পূরণের জন্য মুক্তিযুদ্ধকালে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উদ্যোক্তাদের শিল্প-কারখানাগুলো জাতীয়করণ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনও চালু রাখা হয়। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ নীতির মাধ্যমে পাট, বস্ত্র, রসায়নসহ প্রধান প্রধান মৌলিক শিল্প, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হলে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্নীতি ও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সরকারি মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি।উপরন্তু, বছরের পর বছর লোকসানের কারণে বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, ১৯৭২ সালে জাতীয়করণকৃত ৭৪টি মিল নিয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে বিটিএমসি আরও ১২টি মিল স্থাপন করে। বিটিএমসির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিরাষ্ট্রীয়করণ ও ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর নীতির আগে বাংলাদেশে সুতা ও কাপড়ের বাজারে বিটিএমসি একচেটিয়া ব্যবসা করত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিটিএমসির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা সুতা উৎপাদনকারী ১৮টি টেক্সটাইল মিল বা বস্ত্রকলের মধ্যে বর্তমানে ১২টিই বন্ধ রয়েছে। আর সচল মিলগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
এ প্রসঙ্গে বিটিএমসির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বায়েজিদ সরোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে বিটিএমসির নিয়ন্ত্রণে থাকা ১৮টি মিলের মধ্যে সচল আছে ছয়টি। এর মধ্যে চারটি মিল সংস্থার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সেবা-মাশুলের (সার্ভিস চার্জ) ভিত্তিতে চলছে। আরও তিনটি মিল সার্ভিস চার্জ ও বিএমআরই এর আওতায় পুনরায় চালু করার চেষ্টা চলছে।
অর্থমন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লোকসানি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও (বিপিসি)। দীর্ঘদিন লোকসান দেওয়ার পর গত দুবছর ধরে মুনাফা করতে শুরু করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য নব্বইয়ের দশকেও এটি লাভজনক হিসাবে পরিচিত ছিল। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে বিপিসি একাই লোকসান দিয়েছে ১১ হাজার ৩৭১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। তার আগের বছর লোকসান দিয়েছে ৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। অবশ্য গত দুই অর্থবছরে ১৬ হাজার ৩১২ কোটি টাকা মুনাফা করলেও প্রতিষ্ঠানটি গত ২০ বছরে (১৯৯৬ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত) লোকসান দিয়েছে ৩৫ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা।
সূত্র : বাংলাট্রিবিউন









