ধর্ম

করোনাভাইরাস সংক্রান্ত শরিয়তের বিধি-বিধান

নিউজ ডেস্ক১৬ মে ২০২০১৬ মিনিট পড়া

করোনাভাইরাসের কারণে পৃথিবীব্যাপী মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যার প্রভাব পড়েছে তাদের ধর্মীয় জীবনেও। তাই করোনাভাইরাস সংক্রান্ত ইসলামী শরিয়তের বিধান নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা-পর্যালোচনা। রিয়াদের শরয়ি বিষয়ক ম্যাজিস্ট্রেট ও বিশিষ্ট আইন গবেষক ড. খালিদ বিন আলী আল-মুশায়্যাকা করোনা সংক্রান্ত ইসলামী শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান তুলে ধরেছেন। যার সংক্ষেপণ ও ভাষান্তর করেছেন আতাউর রহমান খসরু

 

টিকা গ্রহণ  : বেশির ভাগ আলেমের মতে, মহামারি ও অন্যান্য রোগের জন্য টিকা গ্রহণ করা জায়েজ। কেননা তা ‘আল্লাহর ওপর আস্থা’র বিপরীত নয়; বরং তা আল্লাহ প্রদত্ত একটি উপায় গ্রহণ মাত্র। রোগ, বালা-মুসিবতের হাত থেকে আত্মরক্ষা করা হবে—এটাই ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে কুদৃষ্টি, জিন ও জাদুর প্রভাব থেকে বাঁচতে সকাল-সন্ধ্যায় পঠিতব্য দোয়া ও তাসবিহ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার পদ্ধতি শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সকালবেলা সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, ওই দিন কোনো বিষ বা জাদু তার ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০৪৭)

এ জাতীয় হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, রোগ থেকে আত্মরক্ষার জন্য টিকা গ্রহণ বৈধ।

 

চিকিৎসা ও প্রতিষেধক গ্রহণ : কোনো রোগের চিকিৎসা গ্রহণের ব্যাপারে ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি হলো, তা বৈধ ও নির্দোষ; কখনো কখনো তা ওয়াজিব। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন, চিকিৎসা ও রোগমুক্তির জন্য দোয়া ও তদবির শিক্ষা দিয়েছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ রোগ ও আরোগ্য পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক রোগের জন্য রয়েছে চিকিৎসা। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। তবে হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণ কোরো না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৮৭৪)

যদি চিকিৎসা গ্রহণ না করলে জীবননাশ, অঙ্গহানি বা বিকলাঙ্গ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তবে তা গ্রহণ করা ওয়াজিব। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থাও যদি এই পর্যায়ে চলে যায়, তবে তার জন্যও চিকিৎসা গ্রহণ করা ওয়াজিব হবে। নতুবা একটি সংক্রামক রোগ হওয়ায়—যার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের অন্যদেরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয় আছে, তার চিকিৎসা গ্রহণ না করা অনুচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত :  ১৯৫)

যদি চিকিৎসার উপকার সম্পর্কে সন্দিহান হয় অথবা তা পরিহারে ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে, তবে চিকিৎসা গ্রহণ করা মুস্তাহাব। চিকিৎসার ফলাফল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত হয় তবু তা গ্রহণ করা বৈধ।

 

মহামারি আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ করা বা সেখানে পালিয়ে আসা : মহামারি আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। এটাই বেশির ভাগ আলেমের মত। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা কোনো অঞ্চলের মহামারির খবর পাও, সেখানে প্রবেশ কোরো না। আর তোমরা অঞ্চলে থাকা অবস্থায় সেখানে মহামারি দেখা দিলে সেখান থেকে বের হয়ো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭২৪)

 

অসুস্থ ব্যক্তির পানি ব্যবহার : যদি মহামারি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কখনো ব্যান্ডেজ বা এ জাতীয় পানিরোধক থাকে এবং তা উঠিয়ে ফেলার অবকাশ থাকলে অজুর সময় তা উঠিয়ে ফেলা ওয়াজিব। কেননা পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা ওয়াজিব। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা যখন নামাজের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধোবে। তোমরা মাথা মাসেহ করবে এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধোবে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬)

যদি তা সরানো সম্ভব না হয়, তবে পানি দ্বারা মাসেহ করবে এবং অবমুক্ত অংশ পানি দ্বারা ধোবে। আর পানি ব্যবহারের ব্যাপারে চিকিৎসকদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলে তায়াম্মুম করবে। একইভাবে সংক্রমণ রোধ করতে অসুস্থ ব্যক্তিকে যদি এমন স্থানে রাখা হয়, যেখানে পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে রোগী তায়াম্মুম করবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাকো বা শৌচাগার থেকে আসো বা তোমরা স্ত্রীর সঙ্গে সংগত হও এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবে। তা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করবে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬)

ঘরে নামাজ আদায়কারীর আজান : যখন সংক্রমণ রোধ করতে সাধারণ মানুষকে ঘরে নামাজ আদায় করতে এবং মসজিদে জামাতে অংশ না নিতে বলা হয়, তখন ঘরে নামাজ আদায়কারীরা ঘরে আজান দেবে কি না? এই প্রশ্নের উত্তরে ইসলামী আইনজ্ঞরা ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো, মসজিদে আজান হলেও ঘরে নামাজ আদায়কারীর জন্য আজান দেওয়া বৈধ। কেননা জাবির ইবনে আবদুল্লাহ, সালামা ইবনে আকওয়া ও আনাস বিল মালিক (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকে ‘জামাত ছুটে যাওয়া ব্যক্তি’র পৃথক আজান প্রমাণিত। যদি ঘরে নামাজ আদায়কারী আজান না দেয় তবে কোনো সমস্যা নেই।

 

আজানের মধ্যে শব্দ সংযুক্তি : ‘সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম’ বা ‘আস-সালাতু ফির-রিহাল’—অর্থাৎ ঘরে নামাজ আদায় করুন—আজানের মধ্যে এ জাতীয় শব্দ সংযুক্ত করার অবকাশ ইসলামী শরিয়তে আছে। এ ক্ষেত্রে হাদিসে তিন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়—এক. আজানের পরে বলা। যেমনটি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩২)

দুই. আজানের মধ্যে ‘হাইয়া আলাস-সালাহ’-এর পরিবর্তে বলা। যেমনটি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৭)

তিন. কোনো একজন সাহাবি ‘হাইয়া আলাস-সালাহ’-এর পরে এমন শব্দ যুক্ত করেছিলেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়। (ইতহাফুল খায়র, হাদিস ৯০৫)

মুয়াজ্জিন তিন পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করতে পারেন। তবে ইসলামী আইনজ্ঞদের মত হলো, এটি আজানের পর সতর্ক বার্তা হিসেবে উচ্চারণ করা উত্তম। মুয়াজ্জিন যদি শহর বা জনবসতির মধ্যে হয়, তবে সে বলবে ‘সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম’ আর যদি সে বাইরে অবস্থান করে, তবে বলবে ‘আস-সালাতু ফি রিহালিকুম।’ আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর বর্ণনা অনুসারে মুয়াজ্জিন এই বাক্য দুইবার উচ্চারণ করবে। মুয়াজ্জিন যখন ঘরে নামাজ আদায়ের কথা বলবেন, তখন শ্রোতারা ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলে উত্তর দেবে।

 

মসজিদে নামাজের জামাতে অংশ না নেওয়া : হানাফি মাজহাব মতে, পুরুষের জন্য জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। কেননা আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত :  ৪৩)

ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) নিজের অন্ধত্ব ও বাড়ি দূরে হওয়ার কারণে ঘরে নামাজ আদায়ের অনুমতি চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি তোমার জন্য অবকাশ দেখছি না।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস ৫৫২)

তবে বিজ্ঞ আলেমরা বলেন, অপারগতার সময় জামাত পরিহার করার অবকাশ আছে। কেননা আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থতার সময় ঘরে নামাজ আদায় করেছেন এবং তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আবু বকরকে বলো, সে যেন মানুষদের নিয়ে নামাজ আদায় করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৭৮)

বিচক্ষণতার পরিচয় হলো, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত মান্য করা এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে ফকিহদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যার ফায়সালা করবে তোমাদের ভেতর দুই ন্যায়বান লোক।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৯৫)। সুতরাং ন্যায়পরায়ণ চিকিৎসকের মতামতের ভিত্তিতে অভিজ্ঞ ফকিহরা মসজিদে জামাতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে মুসল্লিদের সিদ্ধান্ত দেবেন।

যদি কোনো মুসল্লি মসজিদে নামাজ আদায়ে অভ্যস্ত হয় এবং পরিস্থিতির কারণে ঘরে নামাজ আদায়ে বাধ্য হয়, তবে আশা করা যায়, আল্লাহ তাকে জামাতে অংশগ্রহণের সাওয়াব দান করবেন। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো বান্দা অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তার জন্য মুকিম ও সুস্থ অবস্থার সমপরিমাণ প্রতিদান লেখা হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৯৯৬)

 

ঘরে নামাজের স্থান নির্ধারণ করে নেওয়া : মুমিনের জন্য ঘরে একটি স্থান নামাজের জন্য নির্ধারণ করা মুস্তাহাব। কোনো কারণে মসজিদে যেতে না পারলে বা ঘরে নফল আদায়ের সময় সেই স্থানে নামাজ পড়বে। ইতবান ইবনে মালিক (রা.)-এর দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে নিজ সম্প্রদায়ের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করা কঠিন হয়ে যায়। তিনি মহানবী (সা.)-এর কাছে আবেদন করেন যেন তিনি তাঁর ঘরে নামাজের একটি স্থান নির্ধারণ করে দিয়ে সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তাঁর ঘরের এক কোণে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৩৭৭০)

এ ছাড়া মায়মুনা (রা.) ও আম্মার ইবনে ইয়াসার (রা.)-এর ঘরে নামাজের নির্ধারিত স্থান ছিল বলে হাদিসে পাওয়া যায়। সুতরাং চলমান পরিস্থিতির কারণে যাঁরা ঘরে নামাজ আদায়ে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁরা ঘরে একটি নামাজের স্থান নির্ধারণ করে নিতে পারেন।

 

ঘরে জামাত করা : যারা অপারগতার কারণে মসজিদে নামাজের জামাতে অংশ নিতে পারছেন না, তাদের জন্য ঘরে জামাত করার অবকাশ আছে; বরং ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মতে তা ওয়াজিব। যখন ঘরে জামাত হবে, তখন পরিবারের প্রধান পুরুষ ব্যক্তি নামাজের ইমামতি করবেন। তিনি যদি ইমামতির জন্য এগিয়ে না আসেন, তবে যার কোরআন তিলাওয়াত বেশি শুদ্ধ এবং মুখস্থশক্তি প্রখর, সে ইমামতি করবে। আর এমন একাধিক ব্যক্তি থাকলে নামাজের বিধান সম্পর্কে অধিক অবগত ব্যক্তি ইমামতি করবে। এরপর বয়স ও আল্লাহভীতির বিষয় বিবেচনা করা হবে। আবু মাসউদ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি লোকদের ইমামতি করবেন যিনি আল্লাহর কিতাব তথা কোরআন তিলাওয়াতে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। কোরআন পাঠে যদি সবাই সমান হয়, তবে যিনি তাঁদের মধ্যে সুন্নাহ সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা অভিজ্ঞ। তাতেও যদি সবাই এক রকম হয়, তবে যিনি আগে হিজরত করেছেন। তাতেও যদি সবাই সমান হয়, তবে যিনি আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬৭৩)

ঘরে নামাজ আদায়কারীদের মধ্যে মুসল্লি যদি একজন পুরুষ হন, তবে ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবে। আর দুইয়ের বেশি হলে পেছনে দাঁড়ানো সুন্নাত। মুসল্লি নারী হলে পেছনে দাঁড়াবে। নারী মুসল্লি যদি মাহরাম (যাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ নয়) হন, তবে ডানে বা বাঁয়ে দাঁড়ালেও নামাজ হবে। কিন্তু গাইরে মাহরাম হলে পেছনেই দাঁড়াতে হবে। তবে তা সুন্নাতপরিপন্থী হবে। মুসল্লি নারী ও পুরুষ উভয় শ্রেণির হলে নারী পুরুষের পেছনে দাঁড়াবে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি ও এতিম বালক তাঁর পেছনে দাঁড়াই এবং আমাদের পেছনে বৃদ্ধা নারী দাঁড়ান। তিনি আমাদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে চলে যান।’ (মুয়াত্তায়ে মালিক, হাদিস ১৭৯)

 

আক্রান্ত ব্যক্তির জনসমাগমের স্থলে যাওয়া : কোনো ব্যক্তির শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর তার জন্য জনসমাগমের স্থানে যাওয়া হারাম। কেননা এতে অন্যদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয় এমন কোনো অপরাধের জন্য যা তারা করেনি, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করবে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৮)

এ ছাড়া ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি হলো, ‘নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কুষ্ঠরোগী থেকে তুমি সেভাবে পলায়ন করো, যেভাবে সিংহ দেখে পলায়ন করো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৯৭২২)। সুতরাং করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ ব্যক্তির সংস্রব থেকে দূরে থাকবে।

 

মুখে মাস্ক পরে নামাজ আদায় : সাধারণ অবস্থায় মুসল্লির জন্য মুখ ঢেকে রাখা মাকরুহ। কেননা কেননা মুখ ঢেকে বা মুখের ওপর কোনো কিছুর আবরণ দিয়ে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনের জন্য তা বৈধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা আবশ্যক।

 

দুই কাতারের দূরত্ব বাড়ানো : সুন্নাত হলো, দুই কাতারের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্ব রাখা এবং তার মধ্যে এক প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির সেজদার চেয়ে বেশি ফাঁকা না রাখা। তবে সংক্রমণ রোধ বা অন্য কোনো প্রয়োজনে দূরত্ব আরো বাড়ানো যেতে পারে। অনুরূপ জামাতে নামাজ পড়ার সময় পাশাপাশি দাঁড়ানো ওয়াজিব। কোনো মুসল্লি বিনা কারণে এক কাতারে একা দাঁড়াবে না। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পেছনের কাতারে একাকী নামাজ আদায়কারীর নামাজ গ্রহণযোগ্য নয়।’ (বুলুগুল মারাম, হাদিস ৪২১)

তবে সংক্রমণের ভয়ে কোনো ব্যক্তি যদি পেছনের কাতারে দাঁড়ায়, তবে তার নামাজ শুদ্ধ হবে।

 

জুমার নামাজে অংশ না নেওয়া : সর্বসম্মতিক্রমে জুমার নামাজ ফরজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ হে মুমিনরা! জুমার দিন যখন তোমাদেরকে নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ৯)

জুমার নামাজ ফরজ, তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের জমায়েতে ব্যাপক সংক্রমণের ভয় থাকলে তাকে ‘অপারগতা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে এবং শর্তসাপেক্ষে ব্যক্তি ঘরে নামাজ আদায় করতে পারবে।

 

ঘরে জুমা ও ঈদের জামাত করা : বেশির ভাগ ইসলামী আইনজ্ঞের মতে, ঘরে জুমা ও ঈদের জামাত অনুমোদিত নয়। বরং ঘরে নামাজ আদায়কারীরা জামাতের সঙ্গে জোহরের নামাজ পড়বে। তবে কোনো কোনো আলেমের মতে, চার সাবালক পুরুষ থাকলে জুমা আদায় করা যাবে। ঈদের বিধানও অনুরূপ। পার্থক্য হলো, জুমার জামাত ছুটে গেলে ব্যক্তি জোহরের নামাজ কাজা হিসেবে আদায় করবে আর ঈদের নামাজের কোনো কাজা নেই।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও চিকিৎসকদের নির্দেশনার কারণে কেউ জুমার নামাজে অংশ না নিলেও জুমার দিনের অন্যান্য বিধান ও আমল তার জন্য প্রযোজ্য। যেমন গোসল করা, সুন্দর কাপড় পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা ইত্যাদি।

 

তারাবির নামাজ : তারাবির নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে আদায় করাই উত্তম। তবে তা ঘরে পড়ারও অবকাশ আছে। সরকারি বিধি-নিষেধ ও চিকিৎসকের নির্দেশনার কারণে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের সুযোগ না থাকলে ঘরে আদায় করবে। ঘরে জামাতের সুযোগ থাকলে তা করবে, নতুবা একা একা তারাবির নামাজ পড়বে। সহিহ বুখারিতে আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে একাকী রমজানের কিয়ামুল লাইল তথা তারাবি আদায় করেছেন।

 

সাক্ষাতে মুসাফা না করা : মুসলমানের পরস্পরের সাক্ষাতে মুসাফা করা মুস্তাহাব। বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন দুই মুসলিম পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয় এবং মুসাফা করে, তখন তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে তাদের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫২১৪)

সংক্রমণের ভয় থাকায় মুসলিমরা শুধু সালাম বিনিময় করা এবং মুসাফা এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ আছে। দূর থেকে সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করবে।

 

জানাজার নামাজ : জানাজার নামাজ ফরজে কেফায়া—যা কয়েকজন ব্যক্তি আদায় করলে হয়ে যায়। যদি কোনো মানুষ মারা যায় এবং তার জানাজার জন্য জমায়েত হলে রোগ সংক্রমণের ভয় থাকে, তবে মসজিদ প্রাঙ্গণ বা অন্যান্য জনসমাগমের স্থান এড়িয়ে যাবে। আর কয়েকজন ব্যক্তি মিলে জানাজার নামাজ আদায় করবে।

 

মহামারিতে মারা যাওয়া ব্যক্তির গোসল : বেশির ভাগ ইসলামী আইনজ্ঞের মতে, মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানো ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর মৃত কন্যাকে গোসলদাতাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমরা তাকে তিনবার, পাঁচবার বা তার চেয়ে বেশিবার গোসল করাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ১২৫৩)

সুতরাং করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তাকে গোসল করাতে হবে। যদি গোসল দানকারী সংক্রমণের ভয় করে, তবে শুধু পানি ঢেলে দেওয়াই যথেষ্ট হবে। এ ক্ষেত্রে গোসলদাতা নিজেও সতর্কতামূলক যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কোনো কোনো আলেম উচ্চমাত্রার ঝুঁকি থাকলে মহামারিতে মারা যাওয়া ব্যক্তির জন্য গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করানোর মত দিয়েছেন।

 

একই কবরে একাধিক ব্যক্তিকে দাফন করা : ইসলামী শরিয়তের বিধান হলো, প্রত্যেক মৃত ব্যক্তিকে পৃথক কবরস্থানে দাফন করা হবে। তবে যুদ্ধ ও মহামারির মতো পরিস্থিতিতে একই কবরে একাধিক মৃতকে দাফন করা বৈধ। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) অহুদ যুদ্ধের সময় এক কবরে একাধিক শহীদকে দাফন করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৪৩)

 

যেসব দেশে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয় : কিছু অমুসলিম দেশে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির লাশ রাষ্ট্রীয়ভাবে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে এবং মুসলিমরা মৃত ব্যক্তির গোসল, কাফন ও দাফনের সুযোগ পাচ্ছে না। এসব দেশের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচ্য—এক. মুসলিমরা আরোগ্য লাভের ব্যাপারে প্রবল আশাবাদী হলে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করবে, নতুবা গ্রহণ না করারও সুযোগ আছে।

দুই. যদি লাশের কোনো হদিস পাওয়া না যায়, তবে মুসলিমরা মৃত ব্যক্তির জন্য গায়েবানা জানাজা পড়তে পারবে; কিন্তু যদি লাশ দাফনের স্থানের সন্ধান পাওয়া যায়, তবে সেখানে গিয়ে জানাজা আদায় করবে।

 

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য জাকাতের অর্থ প্রদান : করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসার ব্যয় বহনে অক্ষম হলে তাকে চিকিৎসার জন্য জাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে। আর যদি করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে হয়, তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তামলিকের প্রয়োজন হবে। তা হলো, এমন কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে জাকাতের অর্থ প্রদান করা, যে চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে প্রদত্ত অর্থ দান করতে সম্মত।

 

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য রোজা : রোজার ব্যাপারে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির বিধান অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মতোই। তা হলো, কোনো দ্বিনদার ও আল্লাহভীরু ডাক্তার যদি রোগীর সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে রোজা না রাখার পরামর্শ দেন, তাহলে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোজা না রাখার সুযোগ আছে। তবে পরবর্তী সময়ে তা কাজা আদায় করতে হবে। যদি রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে প্রতি রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে আহার করাতে হবে।

 

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ : রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নাতে কিফায়া। মহল্লার মসজিদে কয়েকজন ইতিকাফ করলে অন্যরা দায়মুক্ত হয়ে যায়। ইতিকাফ যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর আবশ্যক নয়, তাই শুধু সুস্থ কয়েকজন ইতিকাফ করবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকার ও চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য নির্দেশনা মান্য করে চলবে। আক্রান্ত ব্যক্তির দ্বারা অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ভয় থাকায় সে ইতিকাফ করবে না।

 

করোনাকালে হজ ও ওমরাহ : ফরজ হজ ও ওয়াজিব ওমরাহ (যেমন—মানতের ওমরাহ) পালনে বিলম্ব না করাই ইসলামী শরিয়তের বিধান। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের ভেতর যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে, আল্লাহর উদ্দেশে এই ঘরের হজ করা তার আবশ্য কর্তব্য।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)

তবে করোনার মতো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে মানুষ তা বিলম্ব করতে পারে। কেননা নবম হিজরিতে হজ ফরজ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) দশম হিজরিতে হজ আদায় করেন।

যদি কেউ হজের জন্য ইহরাম বাঁধে এবং তাকে মক্কায় প্রবেশ বা হজ-ওমরাহ করতে বাধা দেওয়া হলো, তবে তার দুটি দিক—এক. যদি তাকে শর্ত সাপেক্ষে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় এবং আগ থেকে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে তা ‘ইহসার’ বা বাধা প্রদান বলে গণ্য হবে না। ফলে সে হালাল হয়ে যাবে এবং তার ওপর কোনো কিছু ওয়াজিব হবে না।

দুই. যদি শর্তসাপেক্ষে প্রবেশাধিকার দেওয়া না হয়, তবে তা ইহসার বলে গণ্য হবে। তখন সে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার স্থানে বা হেরেমের মধ্যে পশু কোরবানি করবে এবং মাথার চুল হলক (পুরুষ) বা কসর (নারী) করে ফেলবে। সহিহ বুখারিতে উম্মে সালমা (রা.)-এর হাদিসে এসেছে, হুদাইবিয়ায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বাধাপ্রাপ্ত হলে তিনি পশু কোরবানি করেন এবং হলক করে হালাল হয়ে যান।

ইহরাম অবস্থায় সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মাস্ক পরা হলে গোনাহ হবে না। কিন্তু ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যক্তিকে দম বা কোরবানি দিতে হবে।

 

বাজার-ঘাটের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ : যখন কোনো রোগব্যাধির সংক্রমণ হয়, তখন তা থেকে নিজেকে এবং অন্যকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। আর বিষয়টি মহামারিতে রূপ নিলে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা রাষ্ট্রের জন্য বৈধ। তবে শর্ত হলো, খাদ্যদ্রব্য ও চিকিৎসার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কেননা ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার মতো তাদের খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 

কেউ সংক্রমণের কারণ হলে : কোনো ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর তার অসতর্ক চলাফেরার জন্য যদি অন্যরা আক্রান্ত হয়, তবে দুটি দিক—এক. অন্যদের ভেতর সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। সে শুধু নিজে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেনি। এমন ব্যক্তির বিধান হলো, তার এভাবে চলাফেরা নাজায়েজ বলে গণ্য হবে। এমন ব্যক্তির সংখ্যা যদি বেশি হয়, তাহলে তাদের সতর্কতার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ লঘু শাস্তি (তাজির) নির্ধারণ করতে পারবে।

দুই. ব্যক্তি যদি অন্যদের ভেতর ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটি করে, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। দেশের অভিজ্ঞ মুফতি ও বিচারকরা তার অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তি নির্ধারণ করবেন।

 

সুত্রঃ কালের কণ্ঠ