
করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে দেশের রপ্তানি আয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে কম আয় হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অর্থবছরের এপ্রিলের চেয়ে চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় কম হয়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আয়ে এই নেতিবাচক প্রবণতা কমে আসবে বলে আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের মহামারিতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এমন ধস নেমেছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ইউরোপ-আমেরিকাসহ বাংলাদেশের সব বড় বাজার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। আরো ব্যাপক হারে সংক্রমণ এড়াতে অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশগুলো। এতে মার্কেট, শপিং মল, শোরুম বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ বাতিল করেছে, কেউ স্থগিত করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এসব পণ্য নেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে দেশের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩৫৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ সময় আয় হয় মাত্র ৫২ কোটি ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের এপ্রিল মাসের চেয়ে এই আয় ৮২ দশমিক ৮৫ কোটি ডলার কম। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ৮৫.৩৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের এই সময় আয় ছিল ৩০৩ কোটি ৪২ লাখ ডলার।
উদ্যোক্তারা জানান, করোনার প্রভাবে আগের মাস গত মার্চেও রপ্তানি কমেছে। তবে সে মাসে করোনার প্রভাবটা পুরোপুরি বোঝা যায়নি। এ কারণে রপ্তানি হ্রাসের হারটা ছিল মোটামুটি সহনীয়। রপ্তানি কম ছিল ১৮ শতাংশ। তবে বিশ্ববাজারে করোনার হানা বাংলাদেশের আগেই শুরু হয়ে হওয়ায় ফেব্রুয়ারি ও মার্চ থেকেই রপ্তানি আদেশ কমতে শুরু করে। মার্চে নতুন রপ্তানি আদেশ প্রায় বন্ধ ছিল। এপ্রিলজুড়ে বলতে গেলে পণ্য জাহাজীকরণ হয়নি। এ কারণে রপ্তানিতে ধস নেমেছে।
সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের জুন থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গেল ১০ মাসে রপ্তানি কম হয়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশেরও বেশি। এই সময়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কম হয়েছে ২১.২৪ শতাংশ। এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৭৪৫ কোটি ডলার। রপ্তানি হয়েছে দুই হাজার ৯৪৯ কোটি ডলারের পণ্য। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৩৯৪ কোটি ডলার।
ইপিবির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১০ মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় কম হয়েছে ২২ শতাংশ। মোট দুই হাজার ৪৪৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল তিন হাজার ১৪৪ কোটি ডলার। টেরিটাওয়েলসহ পোশাক খাতের সমজাতীয় পণ্য মিলে মোট রপ্তানিতে পোশাক খাতের অবদান ৮৬ শতাংশ।
এ খাতের উদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ওভেন ও নিট মিলিয়ে মাত্র ৩৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই অঙ্ক গত বছরের এপ্রিলের ২৪২ কোটি ডলার আয়ের তুলনায় ৮৫ শতাংশ কম।
অন্যান্য বড় পণ্যের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১৬ শতাংশের বেশি। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় কম হয়েছে ২২ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি ডলারের পণ্য। গত বছরের এই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৮৪ কোটি ডলার। গত বছরে মোট রপ্তানি ছিল ১০২ কোটি ডলারের মতো। চিংড়িসহ হিমায়িত মাছের রপ্তানি কম হয়েছে ৮ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ৪১ কোটি ডলারের পণ্য। বিভিন্ন ধরনের কৃষি পণ্যের রপ্তানি কম হয়েছে ৪ শতাংশের বেশি। ৭৬ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয় এ সময়ে।
করোনায় ছোট-বড় সব পণ্যেরই রপ্তানিপ্রবাহের একই চিত্র। ব্যতিক্রম শুধু ওষুধ, আসবাব ও পাট। করোনাকালেও কাঁচা পাটসহ সব ধরনের পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ১৪ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি ডলারের পণ্য। একইভাবে ওষুধের রপ্তানি বেড়েছে ৩ শতাংশের কিছু কম। যদিও লক্ষ্যমাত্রা থেকে রপ্তানি আয় ১৮ শতাংশ কমেছে। মোট ১১ কোটি ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে এ সময়। এ ছাড়া আসবাবশিল্পে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ শতাংশের বেশি। আর তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬১.৫৩ শতাংশ। এ সময় আয় হয়েছে ছয় কোটি ৮৪ লাখ ডলার।
রপ্তানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) সভাপতি ও সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মোর্শেদী বলেন, ‘রপ্তানি আয়ের এমন ধস নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কভিড-১৯ সাধারণ ছুটির ফলে এমনটা হয়েছে। তবে আশার কথা, আমাদের ক্রয়াদেশ আছে। ক্রেতাদের চাপও আছে। আগামী মাস থেকে এই আয় বাড়বে। এ ছাড়া জাপান, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়াসহ প্রচলিত বাজারগুলোতেও চাহিদা বাড়ছে।’
সুত্রঃ কালের কণ্ঠ








