সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
রাজস্ব আদায় কার্যক্রম গতিশীল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে আয়কর ও কাস্টমসের অফিস সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ৪২ হাজার জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। জনবল বৃদ্ধি ও অফিস সম্প্রসারণের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কাস্টমসের প্রস্তাবও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদনকৃত প্রস্তাব অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে শিগগিরই পাঠানো হবে। দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আয়কর ও কাস্টমস বিভাগ থেকে দুটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে নতুন আয়কর অফিস, ভ্যাট কমিশনারেট ও কাস্টম হাউস গঠন-সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। কাস্টমস-ভ্যাটের নতুন ১৯টি দফতর এবং আয়করের ৪৫টি অফিস স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কাস্টমস-ভ্যাটে ১৭ হাজার ৩১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আয়করে ২৫ হাজার কর্মকর্তা নিয়োগের প্রস্তাব দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রী আয়করের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছেন। কাস্টসমের প্রস্তাবও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

শতাধিক উপজেলায় আয়কর অফিস : আয়কর অনুবিভাগ সংস্কার, পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ১০০ উপজেলায় আয়কর অফিস করা হবে। নতুন ৪৫টি কর অঞ্চল গঠন করা হবে। বর্তমানে দেশব্যাপী আয়কর অফিসের সংখ্যা ৪০টি। আয়কর বিরোধ ব্যবস্থাপনা ইউনিট; আয়কর যোগাযোগ, সেবা ও এস্টেট ইউনিট; ই-ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা ইউনিট; আয়কর গোয়েন্দা, তদন্ত ও এনফোর্সমেন্ট ইউনিট; কর তথ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট; আন্তর্জাতিক কর ইউনিট এবং উৎসে কর ব্যবস্থাপনা ইউনিট নামে সাতটি বিশেষায়িত ইউনিট স্থাপন করা হবে। এছাড়া নতুন ছয়টি কর আপিল অঞ্চল করা হবে। বর্তমানে আয়কর বিভাগে ৯ হাজার জনবল কর্মরত আছে। নতুন কাঠামোতে আরও ২৫ হাজার জনবল নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আয়কর অনুবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সর্বশেষ ২০১১ সালে আয়কর বিভাগে সংস্কার-সম্প্রসারণ হয়েছে। এরপর আয়কর প্রশাসনে সংস্কার, সম্প্রসারণ হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় আয়করের পরিধি বাড়লেও আগের অফিস ও জনবল দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। এ কারণে সরকার যথাযথ রাজস্ববঞ্চিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ২০১১ সালে ৩১টি কর অঞ্চলে আট লাখ রিটার্ন জমা পড়ত। এখন প্রায় ২৩ লাখ রিটার্ন জমা পড়ে। প্রতিটি বেতনভোগী সার্কেলে প্রায় ২০ হাজারের বেশি রিটার্ন জমা পড়ছে। এসব রিটার্ন প্রসেসের জন্য কর্মকর্তারা উপযুক্ত সময় পান না।
কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৪ সালে দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যাবে। রিটার্ন জমা পড়বে ৫০ লাখের বেশি। আর ২০৩০ সাল নাগাদ রিটার্ন জমা পড়বে এক কোটি ২০ লাখের মতো। এত বিপুলসংখ্যক রিটার্ন প্রসেস করার জন্য বিদ্যমান আয়কর কাঠামোর সমক্ষতা নেই। অন্যদিকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে আইটিভিত্তিক নানা ব্যবসার সস্প্রসারণ ঘটবে। এ ধরনের ব্যবসার আয় থেকে বর্তমান কাঠামো দিয়ে কর আদায় সম্ভব নয়। তাই প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়াতে আয়কর বিভাগের সংস্কার ও সম্প্রসারণের বিকল্প নেই।
নতুন চার কাস্টম হাউস গঠনের প্রস্তাব : আমদানি-রফতানি কার্যক্রমকে গতিশীল করতে এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কাস্টমসের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে। ভ্যাট কমিশনারেট ও কাস্টম হাউস গঠন-সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ১৯টি নতুন দফতর গঠন এবং এসবে ১৭ হাজার ৩১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের প্রস্তাব অভ্যন্তরীণ সম্পদ মন্ত্রণালয় (আইআরডি) থেকে অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
২০ নভেম্বর আইআরডির সম্মেলন কক্ষে অতিরিক্ত সচিব বিশ্বনাথ বণিকের সভাপতিত্বে শুল্ক, আবগারি ও মূসক অনুবিভাগের সংস্কার, পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ সংক্রান্ত সভা হয়। ওই সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
কার্যপত্রের তথ্য মতে, কাস্টমসকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নিজস্ব রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন, রেভিনিউ ফোর্স, অর্থপাচার রোধে মানি লন্ডারিং ও চোরাচালান প্রতিরোধ অধিদফতর এবং ইকোনমিক জোনে কমিশনারেট গঠন করতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে ভ্যাট আদায় বাড়াতে নতুন চারটি ভ্যাট কমিশনারেট গঠন এবং রফতানিমুখী শিল্পের স্বার্থে ঢাকা বন্ড কমিশনারেটকে দুই ভাগ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বর্তমানে ছয়টি কাস্টম হাউস আছে। এগুলো হল- চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, ঢাকা কাস্টম হাউস, বেনাপোল কাস্টম হাউস, মোংলা কাস্টম হাউস, পানগাঁও কাস্টম হাউস ও কমলাপুর আইসিডি। এতে বর্তমানে দুই হাজার ৩৪৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছে। এসব কাস্টম হাউসে নতুন করে দুই হাজার ৩৩৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন চারটি কাস্টম হাউস গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এগুলো হল- চট্টগ্রাম বে-কাস্টম হাউস, ভোমরা কাস্টম হাউস, পায়রা কাস্টম হাউস ও চট্টগ্রাম আইসিডি। এতে এক হাজার ৬৩৬ জন নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
কাস্টমসের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তাদের কাজের ধরন বদলেছে। রাজস্ব আদায়ের চেয়ে বর্ডার নিরাপদ রাখা এবং বাণিজ্য সহজীকরণে কাস্টমসে কাজ করতে হয়। তাই অর্থপাচার রোধে মানি লন্ডারিং ও চোরাচালান প্রতিরোধ অধিদফতর করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসেবে নিজস্ব রাসায়নিক ল্যাব গঠন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক কমিশনারেট গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এসব প্রস্তাব অনুমোদিত হলে একদিকে বন্দর থেকে ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারবেন। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত সেবা পাবেন।
এনবিআরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের পর জনবল নিয়োগ ও দফতর সম্প্রসারণের প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। জনপ্রশাসনের অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত মাঠ পর্যায়ে অফিস সম্প্রসারণের কাজ শুরু করা হবে।
অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীরা যা বলছেন : কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার প্রয়োজন আছে। তবে এর সঙ্গে এনবিআরের অধীনস্থ দফতরগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। তাহলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে। সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে।
এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, মধ্যম আয়ের দেশের আলোকে রাজস্ব বিভাগের ফ্রেমওয়ার্ককে আপগ্রেড করতে হবে। এনবিআরের প্রতিটি বিভাগকে অনলাইন ও ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। যাতে করদাতাদের কর অফিসে শারীরিকভাবে কম যেতে হয়। তাহলে একদিকে হয়রানি কমবে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়বে। অন্যদিকে ব্যবসার সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মোয়াজ্জেম বলেন, অর্থনীতির আকার অনুযায়ী দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সম্ভব। এজন্য রাজস্ব প্রশাসনের সম্প্রসারণ ভালো বিনিয়োগ। এখন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়ানোর যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা আদায়ে জনবল অবশ্যই বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। তবে কাক্সিক্ষত ফল পেতে তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যারা সততা নিয়ে কাজ করবে তাদের প্রণোদনা দিতে হবে। তৃতীয়ত, সঠিকভাবে কর আদায় করতে এনবিআরের অধীনস্থ সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।









