সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
ব্যাংক ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে আনার বিষয়টি বছরজুড়েই ছিল আলোচনায়। শিল্পে বিনিয়োগের গতি বাড়াতে এর বিকল্প নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। নিত্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ সারা বছরই ভুগিয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের।
তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে পেঁয়াজের ঝাঁজে যেভাবে কেঁদেছেন ভোক্তারা তা তাতে ঢাকা পড়েছে অতীতের সব রেকর্ড। বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করায় দাম পড়তি, তবে স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে এখনও চার-পাঁচগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে তা। বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন বছরেও ব্যাংক ঋণের সুদ আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতির অন্য সূচকগুলের মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বছরজুড়েই ছিল নেতিবাচক ধারায়। নতুন ভ্যাট আইন চালু হওয়ার পর কাক্সিক্ষত হারে রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে এ ক্ষেত্রেও। তবে প্রণোদনা দেয়ার পর রেমিটেন্স খাতে বেড়েছে প্রবৃদ্ধি। তা আরও বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও খাদ্য উৎপাদন ভালো হয়েছে। বছরজুড়ে অর্থনীতির ধূসর সময়ে এ ছিল আশার আলো।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সাবেক মহাপরিচালক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরী বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা গতি কমে যাওয়ায় আমদানি-রফতানির পরিমাণ কমছে। কমছে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের পরিমাণও। রাজস্ব আহরণের চিত্র ভালো না। এ রকম চলতে থাকলে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। এখন সরকারকে কঠোর মনিটরিং করতে হবে। প্রয়োজনে আগাম সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনীতির অন্যান্য খাতের অবস্থা খারাপ থাকলেও এতদিন বৈদেশিক খাত ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমানে এ খাতেও কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। ফলে এ খাতে গুরুত্ব দেয়া উচিত।
এ অর্থনীতিবিদের মতে, বিনিয়োগ বাড়লেও তা সরকারিভাবে অবকাঠামো খাতে। এর সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়, মুদ্রানীতি, টাকার মূল্যমান, আয় ব্যয় এবং অন্যান্য বাণিজ্য নীতির সম্পর্ক খুবই দুর্বল।
বিনিয়োগ : দেশি-বিদেশি দুই ধরনের বিনিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে মন্দা চলছে। বিদেশি বিনিয়োগে মন্দা কাটাতে বিশেষ উদ্যোগের ফল মিলছে। চলতি অর্থবছরে জুলাই-আগস্টে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে একই সময়ে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসে ৭০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু দেশি বিনিয়োগে অন্ধকার বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে দেশি বিনিয়োগ হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত ঋণের সুদ হার এক অংকে নেমে না আসায় এবং ব্যাংকে ঋণখেলাপি বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগে আসতে পারেননি দেশি উদ্যোক্তারা।
মূল্যস্ফীতি : খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত- দুই ধরনের পণ্যেই মূল্যস্ফীতি বছরজুড়ে ভুগিয়েছে ভোক্তাদের। বিশেষ করে পেঁয়াজ তো কাঁদিয়েই ছেড়েছে এমনকি উচ্চবিত্তদেরও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য হ্রাস, চীন ও ভারতসহ বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি- আমাদের চাপ বাড়িয়েছে। টাকার মূল্যমান কমে যাওয়ায় খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে বেড়েছে মূল্য।
প্রতি বছর আমদানি খাতে ৫ হাজার ৭৫৫ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। টাকার অবমূল্যায়নে এ ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের বছরে এ সময়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে চীন ও ভারত। চীনের মূল্যস্ফীতি ২০২০ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশে উঠবে এমন আভাস দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ভারতের মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
কিন্তু আগামী বছর বাড়িয়ে তা ৪ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আরেকটি ধাক্কাই অপেক্ষা করছে।
নিত্যপণ্যের বাজার : বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের মূল্য ৫৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের হিসাবে ১ মাসের ব্যবধানে সরু চালের মূল্য ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ, মাঝারি চাল ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ ও মোটা চালের দাম ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়েছে। অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। বছরজুড়ে সবজি কিনতে হিমশিম খেতে হয়েছে ভোক্তাদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য বাড়লে দেশের বাজারে তা বেড়ে যায়। কিন্তু কমলে এর প্রভাব খুব একটা দেখা যায় না। বিশ্ববাজারের পণ্যের পূর্ভাবাসে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে জ্বালানি তেলের মূল্য কমেছে। আগামী বছরে তা অব্যাহত থাকবে। ২০২০ সালে সার, খনিজ সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। স্বর্ণের দাম ১ দশমিক ৯ শতাংশ হারে ঊর্ধ্বমুখী।
আমদানি ও রফতানি : সাম্প্রতিক সময়ে বড় চাপের মুখে পড়েছে আমদানি-রফতানি খাত। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, গত জুলাই থেকে অক্টোবর- ৪ মাসে রফতানি আয় কমেছে লক্ষ্যের চেয়ে ১৬১ কোটি মার্কিন ডলার। এ সময়ে লক্ষ্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৩৩ কোটি মার্কিন ডলার। বিপরীতে আয় হয়েছে ১ হাজার ২৭২ কোটি ডলার। এটি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ কম।
রফতানির প্রধান দুটি বাজার হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউ অঞ্চলে প্রথম ৩ মাসে রফতানি আয় কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানির অর্ডার ও পণ্যের মূল্যও কমেছে। এছাড়া অবকাঠমোগত সমস্যা, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে রফতানি বাণিজ্য কমে গেছে।
পাশাপাশি আমদানি কমে যাওয়ায় কাষ্টমস রাজস্ব আয় কমেছে ২ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ সময় আয়ের লক্ষ্য ছিল ৯৫৪ কোটি মার্কিন ডলার। বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ৯৩২ কোটি ডলার। এদিকে জুলাই-আগস্টে এলসি খোলার পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ।
রাজস্ব-আদায় : চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি অর্জন বড় চ্যালেঞ্জই হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৬২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। ৩ মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি : ভারত, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্পৃক্ততা বেশি। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতি বা নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। দেশের অর্থনীতির আকার ৩০০ বিলিয়ন ডলার। এরমধ্যে ১২০ বিলিয়ন ডলারই কোনো না কোনোভাবে বিদেশের সঙ্গে যুক্ত।
বৈশ্বিক অর্থনীতির পূর্বাভাস হচ্ছে- আগামী বছর ভারতের প্রবৃদ্ধি বাড়বে। চীনের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। অনেকটা স্থিতিশীল থাকবে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, এ বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ২। এ ধারা আগামী বছরেও অব্যাহত থাকবে।
রেমিটেন্স : রেমিটেন্স নিয়ে স্বস্তিতে আছে সরকার। প্রবাসীদের আয় বৈধপথে দেশে আনা বাড়াতে জুলাই থেকে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ ১০০ টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠালে তিনি ১০২ টাকা পাবেন। এরপর থেকে রেমিটেন্স বাড়তে থাকে। জুলাই থেকে অক্টোবর- ৪ মাসে রেমিটেন্স এসেছে ৬১৫ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৫১০ কোটি ডলার।
অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন : চলতি অর্থবছরে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন গত অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে আউস উৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ, আমন শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ও বোরো ধান বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
এ প্রবণতা থেকে চলতি অর্থবছরে মোট খাদ্য শস্যের উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন। এর মধ্যে আউস ২৯ লাখ ৩০ হাজার টন, আমন ১ কোটি ৫৩ লাখ টন ও বোরো ২ কোটি ৪ লাখ টন। পর্যাপ্ত উৎপাদন হওয়ায় চালের বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।









