ধর্ম

ঈমানি চেতনায় দেশপ্রেম

নিউজ ডেস্ক১৭ ডিসেম্বর ২০১৯৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

বাংলাদেশের মুসলিম বাঙালির শ্রেষ্ঠ অনুভূতি স্বাধীনতা, প্রিয় সুর ‘আমার সোনার বাংলা…’ Best combination লাল-সবুজ। পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনাবিধৌত সোনাছোঁয়া মেঠো প্রান্তর বাঙালির ভালোবাসার ঠিকানা।

আরবি ‘হুররিয়্যাতুন’ স্বাধীনতার সমার্থক Freedom, Independence এবং ‘হুব্বুল ওয়াতান’ বা Patriotism-এর সমার্থক স্বদেশপ্রেম। মায়াময় আপন নিবাসের চারপাশ, পায়ের নিচের মাটি, মাথার ওপরের আকাশ একজন মানুষের বড়ই আপন—দূর-বহুদূরের অজানা জনপদ ও জনতা থেকে আলাদা ‘অহংকারের ঠিকানা’র প্রতি অনুরাগে বলা হয়, ‘স্বদেশপ্রেম ঈমানের অংশ।’

আঞ্চলিক নিরাপত্তা, শাসনকাজে জনগণের অংশগ্রহণ তথা গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ ও জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চেতনা। কেননা মজলুম জনগণের হাহাকার আল কোরআনের শাশ্বত আবেদন, ‘আর তোমাদের কী হলো যে দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে—যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে অত্যাচারীদের এই জনপদ থেকে উদ্ধার করো। তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অভিভাবক পাঠাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী পাঠাও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭৫)

পবিত্র কোরআনের একটি সুরার নাম ‘ফাতহ’ The Victory—অর্থাত্ বিজয়, এতে মহান আল্লাহর ঘোষণা : ‘দান করেছি তোমায় আমি নিশ্চয়ই/নিশ্চিত পরিষ্কার একটি বিজয়।’ (কাব্যানুবাদ, সুরা : ফাতহ, আয়াত : ১)

আল কোরআনের বাণী আমাদের বিজয় দিবসের প্রেরণা। মহান আল্লাহ মক্কা বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ সুরা নসরে বলেন, ‘যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয় আসবে, তখন আপনি দেখবেন, মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বিনে প্রবেশ করছে। তখন হে রাসুল, আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা করুন এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রর্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী, পরম ক্ষমাশীল।’

অন্যদিকে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে পবিত্র কোরআনের ঘোষণা—‘বলুন (হে রাসুল), আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে তোমরা উল্লাস প্রকাশ করো।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৫৮)

এ আয়াতটিও আমাদের বিজয় উত্সবের প্রেরণা হতে পারে।

ইতিহাস সাক্ষী, আলেকজান্ডার, হিটলার, নেপোলিয়ন, মুসোলিনি অথবা হালাকু খান, চেঙ্গিস খান ও অন্যদের বিজয়াভিযানের পরতে পরতে রয়েছে রক্তপাতের নিষ্ঠুরতা।

প্রিয় নবী (সা.)-ও প্রতিপক্ষের আক্রমণে নিরাপত্তাঝুঁকিতে বিপন্ন, রক্তাক্ত ও মাতৃভূমিতে বসবাসের অধিকারবঞ্চিত হয়েছেন। অথচ তাঁরই মক্কা বিজয়ে রচিত হয় অনন্য আদর্শ। ফলে মক্কার কোরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

শান্তির দূত, রাহমাতুল্লিল আলামিন মক্কা বিজয়ের পরই রক্তপাত, ক্ষয়ক্ষতি ও জনগণের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য ঘোষণা করলেন—

(ক) যারা আপন ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে তারা নিরাপদ।

(খ) যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ।

(গ) যারা কাবাগৃহে আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ।

শুধু তা-ই নয়, বিনা যুদ্ধে মক্কা বিজয়ের পর শান্তি সমাবেশে প্রিয়নবী (সা.) পরম শত্রুর উদ্দেশে উচ্চারণ করলেন ‘সাধারণ ক্ষমা’। উদারতার সুশীতল ছায়ায় মানুষকে শোনালেন ইসলামের ক্ষমার চাদরে ঢেকে দেওয়ার ঘোষণা, পবিত্র কোরআনের বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, ‘আজ তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই…।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯২)

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিশেষ অনুগ্রহে বাংলা-বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বিজয় দিবস। বর্তমান বিশ্বে তিব্বত, সিকিম, হংকং, আরাকান নামে কোনো স্বাধীন দেশ নেই। তামিল, কাশ্মীর আন্দোলন, পাঞ্জাবের ‘খালিস্তান’ সংগ্রামে কম রক্ত ঝরেনি। দীর্ঘতর হয়েছিল আলজেরিয়া, কিউবার মুক্তিযুদ্ধ। দক্ষিণ সুদান, পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা এসেছে অনেক অপেক্ষা ও ত্যাগের বিনিময়ে। রক্ত ঝরিয়েও লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি রাশিয়ার ‘চেচেন’ এবং ফিলিপাইনের ‘মরো’ জাতীয়তাবাদীরা। ষাটের দশক থেকে স্বাধীনতার লড়াই করতে করতে ক্লান্ত-হতাশ ফিলিস্তিনি মুসলিম ভাইয়েরা।

কাজেই আমাদের স্বাধীন স্বদেশ মহান আল্লাহর অনুগ্রহ নয় কি?

‘রক্তঋণে কেনা’ আমাদের স্বাধীনতা আসে ’৫২, ’৫৪, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭০, ’৭১-এর পরিক্রমায় এবং পূর্ব দিগন্ত উজ্জ্বল করে ওড়ে বিজয় পতাকা। এ জন্যই ১১ সেক্টর কমান্ডার, সাত বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ বীর-উত্তম, ১৭৫ বীরবিক্রম, ৪২৫ বীরপ্রতীক—সবার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা মানবসত্তার চিরন্তন অহংকার। শক্তি ও ক্ষমতার জোরে কারো স্বাধীন ও শান্তির স্বদেশকে পদানত করা ইসলামের শিক্ষা নয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, মানবতাবিরোধী অত্যাচারী ফেরাউনের কবল থেকে হজরত মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে হীনবল মানবসত্তাকে স্বদেশ ও স্বাধীনতার পথ দেখালেন। পবিত্র কোরআনের ভাষায় : ‘সেই দেশে যাদের সে দুর্বল রাখে/তাদের প্রতি মোর অনুগ্রহ থাকে।/তাদের—আমি সেথা নেতা বানাইয়া/সেদেশের অধিকারী দেই করিয়া।’ (কাব্যানুবাদ-সুরা : কাসাস, আয়াত : ৫)

স্বদেশপ্রেমের ঈমানি চেতনায় আমাদের কর্তব্য, দেশের স্বার্থে নিজ নিজ অবস্থান থেকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।

prof.ershad92@gmail.com