অর্থ ও বাণিজ্য

টাকা পাচার বন্ধে সংস্থাগুলোর তথ্য আদান-প্রদান ইতিবাচক

নিউজ ডেস্ক১৮ অক্টোবর ২০১৯৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশে কার্যরত সংস্থাগুলোর মধ্যকার তথ্যের আদান-প্রদান ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)।

এপিজির কর্মকর্তারা বলেছেন, সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান হলে কোথায় কিভাবে মানি লন্ডারিং হচ্ছে সে সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে তা বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ নিয়ে এপিজির তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়, মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসে অর্থায়ন বিভিন্ন উৎস থেকে হতে পারে। এর মধ্যে ব্যাংক, বীমা, লিজিং, শেয়ারবাজার, স্বর্ণ ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক খাত রয়েছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোকে চিহ্নিত করে তদারকির আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ খাতের ঝুঁকি নিরূপণের কাজ চলছে।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। বাংলাদেশেও এটি গুরুত্ব পেয়েছে। আর্থিক খাতে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে একটি মানদণ্ড তৈরি হয়েছে। এর আলোকে আমরা সবাই কাজ করছি।

সূত্র জানায়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সিআইডি কাজ করছে। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়। বর্তমানে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বিএফআইইউ, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, এনবিআর ও সিআইডির মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান হচ্ছে। বিষয়টিকে এপিজি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। আগে এসব সংস্থার মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান হতো না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজ দেশের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বৈশ্বিকভাবেও তথ্যের আদান-প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।

এতে বলা হয়, এপিজির সদস্য হওয়ার অন্যতম শর্ত হল- ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ৪০ সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং মেনে চলা দরকার। এর মধ্যে অন্যতম হল- আন্তঃদেশীয় তথ্যের আদান-প্রদান। কারণ মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিষয়টি বর্তমানে এক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

বহু দেশে এর সংযোগ পাওয়া যায়। এ কারণে এ ধরনের ঘটনার তদন্ত করতে গেলে অন্য কোনো দেশের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। তবে অভিযোগ- কয়েকটি দেশ এসব ক্ষেত্রে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে না। এর মধ্যে অন্যতম হল- সুইজারল্যান্ডসহ কয়েকটি উন্নত দেশ।

এতে সতর্ক করে বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী তথ্যের আদান-প্রদান না করলে কার্যক্রম যৌথভাবে মূল্যায়নের সময় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইতিমধ্যে ফিলিপাইন ও পাকিস্তান এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।

সূত্র জানায়, আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমসের নিউইয়র্ক শাখায় থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির পর যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় ফিলিপাইন মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সূচকে নিচের দিকে নেমে গেছে। মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় দেশটি স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থের জোগান বন্ধে পাকিস্তান কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় দেশটির অবস্থাও ফিলিপাইনের পর্যায়ে নেমে গেছে। বিএফআইইউ সূত্র জানায়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বিএফআইইউ যেমন বিদেশ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছে, তেমনি তারাও বিভিন্ন দেশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে।

এপিজির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশ থেকে প্রতি বছর টাকা পাচার হচ্ছে। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কেননা পাচার করা অর্থ সন্ত্রাসী অর্থায়নেও ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

সূত্র জানায়, টাকা পাচার বন্ধে দেশের ভেতরে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব সংস্থা কাজ করছে তারা পারস্পরিক তথ্য বিনিময় করছে। এর মধ্যে এনবিআর আমদানির নামে টাকা পাচারের বেশ কিছু ঘটনার তথ্য পেয়ে বিএফআইইউকে দিয়েছে। তারা এগুলো তদন্ত করে টাকা পাচারের প্রমাণ পেয়েছে।

এর ভিত্তিতে সংশিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে টাকা পাচারের কোনো ঘটনা শনাক্ত করা হলে সেগুলো বিএফআইইউর কাছে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন বিএফআইইউকে দেয়া হয়েছে। তারা সেটি নিয়ে তদন্ত করছে। এসব বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুদকে প্রতিবেদন পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, সিআইডি পারস্পরিক তথ্যের আদান-প্রদান করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রতি বছর মোটা অংকের টাকা পাচার হচ্ছে বলে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসছে। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর তাদের দেশের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমার পরিমাণ চার হাজার ৭০ কোটি টাকা। এ টাকার একটি বড় অংশ দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ২০১৬ সালে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও দেশ থেকে আমদানি-রফতানির নামে টাকা পাচারের ঘটনা ধরা পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের যেসব তথ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে উঠে আসছে সেগুলো অনুমাননির্ভর। যেমন সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের যেসব অর্থ আছে তাদের অনেকে বিভিন্ন দেশে বা সুইজারল্যান্ডে কাজ করে।

ফলে তাদের টাকা সেখানে থাকতেই পারে। আমদানি-রফতানির আড়ালে কিছু টাকা পাচার হচ্ছে। সেগুলো বন্ধের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধে কাজ করে ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ)। তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ কার্যক্রম তদারকি করে এগমন্ট গ্রুপ। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে এসব কর্মকাণ্ড তদারকি করে এপিজি। বাংলাদেশ এ অঞ্চলের দেশ বলে এপিজির তদারকির আওতায় রয়েছে।