সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ২ হাজার কোটি টাকা নেবে সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন বাংলাদেশ (আইসিবি)।
এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেয়া হবে ১ হাজার কোটি টাকা এবং ৫টি সরকারি ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকা। মেয়াদি আমানত হিসেবে এ টাকা নেয়া হচ্ছে। এর পুরোটাই শেয়ারবাজারে সাপোর্ট দেয়ার জন্য ব্যবহার হবে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবেদন করা হয়েছে। তবে শেয়ারের জন্য টাকা নিয়ে অন্যত্র বিনিয়োগ এবং আগের নেয়া টাকার কিস্তি পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

জানতে চাইলে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেন বলেন, টাকার জন্য সব জায়গায় আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী এবং বিডিবিএল- এই ৫ প্রতিষ্ঠানের কাছে ২শ’ কোটি করে আরও ১ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
এসব টাকার শতভাগই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হবে। তবে অন্যত্র টাকা সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের মোট তহবিলের ৫-৮ শতাংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ রয়েছে। এটি কোনো বড় ফিগার নয়। এ ছাড়াও আগের ঋণের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে রিসার্স করে। তবে তহবিল অন্যত্র সরিয়ে ফেললে তা দুঃখজনক। কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত বছরের মাঝামাঝিতে সরকারের কাছ থেকে দুই হাজার কোটি টাকার বন্ড পায় আইসিবি। এর মধ্যে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের দেড় হাজার কোটি টাকা থেকে গত ১৮ মার্চ পর্যন্ত এক হাজার ২৩৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে; অবশিষ্ট আছে ২৬৪ কোটি টাকা। গত ৬ নভেম্বর ডিএসইর সূচক ছিল ৫ হাজার ২০৪ পয়েন্ট। বন্ডের মাধ্যমে নেয়া অর্থ বিনিয়োগের ফলে ২৪ জানুয়ারি সূচক বেড়ে ৫ হাজার ৯৫০ পয়েন্টে উন্নীত হয়। এরপর থেকেই বাজার নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ১৯ মার্চ লেনদেন শেষে সূচক ৫ হাজার ৬০৫ পয়েন্টে অবস্থান করে।
সংস্থাটি বলছে, পুঁজিবাজারে আইসিবির মতো বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান না থাকায় শেয়ার বিক্রি করা অর্থ পুঁজিবাজার থেকে উত্তোলন করা সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে তহবিল সংগ্রহ করে বাজারে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এ কারণে ২০১১ সালের ৩০ জুন আইসিবির টার্ম ডিপোজিটের স্থিতি ছিল ২ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, যা গত ৩০ জুন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। বেড়েছে সুদ ব্যয়ও।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত আইসিবির মেয়াদি আমানত বৃদ্ধির হার বছরে ২১ শতাংশ। এ সময়ে মোট আয় বৃদ্ধির হার ১৩ শতাংশ। পোর্টফোলিও বৃদ্ধির হার বছরে ১৫ শতাংশ হলেও সুদ ব্যয়ের হার ছিল ২৪ শতাংশ। মেয়াদি আমানত বাড়ার কারণে কর্পোরেশনের সুদ ব্যয়ও বাড়ছে। সম্প্রতি পাওয়া দুই হাজার কোটি টাকার বন্ডে সুদহার ৯ শতাংশ। এতে আগামী বছরগুলোতে সুদব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বাড়তি ব্যয় মেটাতে নিজস্ব পোর্টফোলিওর মূলধনী মুনাফা ও লভ্যাংশ আয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে বাজারে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও করছে আইসিবি। এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে আইসিবির নেয়া ‘সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার’ সীমার অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় করতে তাগাদা দেয়া শুরু হয়েছে। এ ব্যাপারে আইসিবির এমডি বলেন, বাজার যখন পড়তে থাকে তখন বিনিয়োগ করার মতো কেউ থাকে না।
ওই পরিস্থিতিতে বাড়তি অর্থ বিনিয়োগ না করলে বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পতনকালীন বিনিয়োগের জন্যই সরকারের কাছে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল চাওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকার এর আগে আইসিবিকে দুই হাজার কোটি টাকা বন্ড সুবিধা দিয়েছিল, তা দিয়ে পাঁচ-ছয় মাস আমরা বাজারে সাপোর্ট দিয়েছি। কিন্তু বন্ডের সুদহার অনেক বেশি। সরকারের কাছ থেকে তহবিল পেলে তা কম সুদে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। আর বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে আইসিবি ৪ হাজার ৪৩১ কোটি টাকার শেয়ার কেনে। বিপরীতে বিক্রি করে ৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকার শেয়ার। একই অর্থবছরে বাজারমূল্যে আইসিবির পোর্টফোলিও মূল্য ছিল ১০ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে সংস্থাটি ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় ও বিক্রি করে ২ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার। একই অর্থবছরে বাজারমূল্যে আইসিবির পোর্টফোলিও মূল্য ছিল ১০ হাজার ৭১ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের ১৮ মার্চ পর্যন্ত আইসিবি ২ হাজার ২৬৯ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে, বিক্রি করেছে এক হাজার ৭২৪ কোটি টাকার শেয়ার। বাজারমূল্যে আইসিবির পোর্টফোলিওর মূল্য ১১ হাজার ৩০ কোটি টাকা।
শেয়ারবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আইসিবি। তবে এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারমূল্য প্রভাবিত করা, দুর্বল কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসা এবং সরকারি ইকুইটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনার ফান্ডে (ইইফ) দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।









