অর্থ ও বাণিজ্য

বিনিয়োগ বাড়াতে নেই কার্যকর পদক্ষেপ: অ্যামচেম

নিউজ ডেস্ক১৮ জুন ২০১৯৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

দেশের অর্থনীতিতে মূল সমস্যা বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব। এ কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে যে সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা বিনিয়োগ বাড়াতে যথেষ্ট নয়। রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে সোমবার আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (অ্যামচেম) বাজেট বিশ্লেষণে এসব কথা বলা হয়।

অ্যামচেমের সভাপতি নুরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এবং ফরেন চেম্বার অব বাংলাদেশের (ফিকি) সভাপতি শেজাদ মুনিম। অনুষ্ঠানে বক্তারা বাজেটে দেয়া বিভিন্ন কর প্রস্তাবের সমালোচনা করেন।

মির্জ্জা আজিজ বলেন, অর্থনীতিতে বড় সমস্যা- বিনিয়োগ নেই। এর অন্যতম কারণ হল সুশাসনের ঘাটতি। এছাড়াও সহজে ‘ব্যবসা করার সূচকে’ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বিনিয়োগের আরও একটি বড় সমস্যা পুঁজির সহজলভ্যতা নেই। কারণ পুঁজির দুটি খাত- ব্যাংক ও পুঁজিবাজার- দুটিই সমস্যাগ্রস্ত। গত ৫ বছর ধরে ব্যাংকের সিরিয়াস অবস্থা। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ না হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ছে না। এবারের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বিতরণ হয়েছে মাত্র ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।

দারিদ্র্য বিমোচনেও প্রবৃদ্ধি কমছে উল্লেখ করে মির্জ্জা আজিজ বলেন, দুই বছর আগে দারিদ্র্য হ্রাসের প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা ১ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি বছর তা আরও কমে ১ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও বরাদ্দ কমেছে। চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আনুপাতিক হারে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। এ বছর তা কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া ধনী দরিদ্র্যের বৈষম্যও বাড়ছে।

মির্জ্জা আজিজ বলেন, দেশীয় বিনিয়োগে মন্দা চলছে। কারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো যায়নি। অপরদিকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) অবস্থা আরও খারাপ। কারণ বিদেশিরা দক্ষ জনবল খোঁজে। কিন্তু এর ঘাটতি রয়েছে। স্মার্টফোনের ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। এটি আনস্মার্ট কাজ। তিনি আরও বলেন, রুলস অব বিজনেস অনুসারে এনবিআরের চেয়ারম্যান অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব। তার কাজ সম্পদ সংগ্রহ করা। এ কারণে কর আহরণ ও পলিসি তৈরি করা এ দুই কাজকে পৃথক করা জরুরি।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, জিডিপির অনুপাতে বাজেটের আকার হয় ১৭-১৮ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবায়ন ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের মতো। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকে অনেক উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন এবং মাথাপিছু আয়ে উন্নতি হয়েছে। এছাড়া মাতৃ এবং শিশুমৃত্যু হ্রাসে এশিয়ায় শক্তিশালী অবস্থানে বাংলাদেশ।

বাজেটে মূল সমস্যা রাজস্ব আদায় মন্তব্য করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার জরুরি। প্রশাসন ও কর আদায়ে ব্যবস্থা আলাদা করা ছাড়া রাজস্ব খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কর দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম হল টেলিকম খাত। কর্পোরেট, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ শুল্কসহ সব ধরনের কর দেয় এ খাত। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইলে কথা বলার ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া স্মার্টফোন এখন আর বিলাসী পণ্য নয়।

এটি সবার প্রয়োজন। বাজেটে এ খাতে কর বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে আরেকটি অবাক বিষয় হল, বিনিয়োগ বাড়েনি। কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। তার মতে, অর্থনীতিতে একটি হিসাব রয়েছে, যা হল ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও। এটি হল- ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপির কত শতাংশ বিনিয়োগ দরকার। এ হিসাবে যে প্রবৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে, বিনিয়োগের হিসাবে তা অসম্ভব। এক্ষেত্রে হিসাবে কোনো সমস্যা থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এনবিআরের মাধ্যমে পলিসি করা হয়। কিন্তু তার কাজ হল কর আদায় করা। এক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা পরিদর্শকের মতো। আমাদের দেশে এনবিআর পলিসি তৈরি করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক কোনো বিবেচনায় এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

শেজাদ মুনিম বলেন, বাজেটের ধারাবাহিকতা রয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু বিভিন্ন কর প্রস্তাব বিনিয়োগের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক নয়। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে কোম্পানির রিজার্ভ এবং রিটেইন আর্নিংয়ের ক্ষেত্রে যে কর আরোপ করা হয়েছে, সেটি যৌক্তিক নয়।

নুরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি বাজেটের জন্য তিনটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন- বাজেটের আকার, কর জিডিপি রেশিও এবং নতুন ভ্যাট আইন।

অন্য বক্তারা বলেন, স্মার্টফোনের কর ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে। এছাড়াও বর্তমানে দেশে যে হারে কর্পোরেট কর রয়েছে, তা শিল্প সহায়ক নয়। তারা বলেন, ঘাটতি মোকাবেলায় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র খাত মিলিয়ে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকার এ পরিমাণ ঋণ নিলে তা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে পুঁজির সংকট তৈরি হবে।