সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
‘তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম’—দীর্ঘদিনের এই হাহাকার চট্টগ্রামের গার্মেন্টসংশ্লিষ্টদের। একসময় যেখানে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ অবদান থাকত চট্টগ্রামের সেখানে তা এখন ঠেকেছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশে। তবে চট্টগ্রামের দুর্দিন কেটে সুদিনের আভাস মিলছে। আর এই সুবাতাস মিলছে মূলত চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। ‘বেপজা ইকোনমিক জোন’, ‘বিজিএমইএ গার্মেন্ট পার্ক’ ছাড়াও বেশ কিছু উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও আলাদা করে গার্মেন্ট কারখানা নির্মাণের জন্য জমি চেয়ে আবেদন করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের অনেক উদ্যোক্তা শহরতলির বাইরে গিয়ে গত তিন বছরে কারখানা সম্প্রসারণ করেছেন। এ সব কিছুর যোগফল মিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চট্টগ্রামে গার্মেন্টশিল্প আবার জেগে উঠবে বলে মনে করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বিজিএমইএ সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা দেশের মোট রপ্তানির ১৩.৩৮ শতাংশ। অথচ ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির কমবেশি এক-তৃতীয়াংশ রপ্তানি হতো চট্টগ্রাম থেকে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতা আর অবহেলায় পোশাকশিল্পের আঁতুড়ঘর রুগ্ণ হয়ে পড়েছে।

তবে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠছে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল। সেখানেই ‘গার্মেন্ট পার্ক’ করার জন্য আলাদা করে ৫০০ একর জমি চেয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছেন তাঁরা। বিজিএমইএর এই গার্মেন্ট পার্কে জমি চেয়ে এরই মধ্যে ৬৪টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৩৫৫ একর জমির জন্য প্রথম কিস্তির টাকা জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সচিব ফজলুর রহমান। বাকি জমিগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বুকিং হয়ে যাবে বলে তিনি জানান।
বিজিএমইএর আবেদনকৃত জায়গাটি এরই মধ্যে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) একটি চায়নিজ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু করেছেন। আগামী ২০১৯ সালের মধ্যে বেজা কর্তৃপক্ষ বিজিএমইএকে গার্মেন্ট পার্ক করার জন্য জমিটি বুঝিয়ে দেবেন বলে নিশ্চিত করেছেন বিজিএমইএ সচিব।
অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি প্লট এক একর। প্রতি প্লটের প্রস্তাবিত মূল্য এক কোটি টাকা, যা কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য। এই জমি ৫০ বছরের জন্য লিজ হিসেবে দেওয়া হবে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে বুকিং মানি হিসেবে শুরুতে প্রতি একরের জন্য ২৫ লাখ টাকা করে দিতে হবে।
একই ইপিজেডে ‘বেপজা ইকোনমিক জোন’ করার জন্য ১১৫০ একর জায়গা বরাদ্দ নিয়েছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। যদিও এই ইপিজেডে প্রযুক্তিনির্ভর এবং চামড়া প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকেই প্রাধান্য দেওয়ার কথা জানিয়েছে বেপজা কর্তৃপক্ষ; কিন্তু এর পরেও ভালো এবং নামকরা গার্মেন্ট উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হবে এই ইকোনমিক জোনে, জানিয়েছেন বেপজার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) নাজমা বিনতে আলমগীর।
এর বাইরে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে গার্মেন্ট ও জুতা কারখানা স্থাপনের জন্য ফাস্ট অ্যাপারেল স্টুডিও লিমিটেড ২৫ একর, নিট গার্মেন্ট কারখানা স্থাপনের জন্য কনসেপ্ট নিটিং লিমিটেড ১০ একর, নিট গার্মেন্ট কারখানার জন্য তাসনিহা ১০ একর এবং গার্মেন্ট শিল্প পার্ক স্থাপনের জন্য রাশেদ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড ৫০ একর জমির জন্য আবেদন করেছে।
বিজিএমইএ গার্মেন্ট পার্কে পাঁচ একর জমির জন্য প্রথম কিস্তির টাকা জমা দিয়েছেন বিজিএমইএ পরিচালক ও মিরাজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মাহবুব উদ্দিন জুয়েল। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে নিকটবর্তী, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি অচিরেই দেশের প্রধান রপ্তানি অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। খুব স্বাভাবিকভাবে বিজিএমইএ গার্মেন্টপল্লীও চট্টগ্রামের রপ্তানিতে বিশাল অবদান রাখবে। আমাদের আগামী মার্চের মধ্যে প্লট বুঝিয়ে দেবে বলে জানিয়েছে।’
বিজিএমইএর সহসভাপতি (অর্থ) মোহাম্মদ নাছির চট্টগ্রামের গার্মেন্টশিল্পের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একসময় চট্টগ্রামে কোনো পাঁচতারা হোটেল ছিল না। এখন সেটাও আছে, নতুন তালিকায় যোগ হচ্ছে আরো একাধিক। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে, আর সবচেয়ে বড় সুবিধা চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এখানে। তৈরি পোশাক শিল্পে চট্টগ্রামের সম্ভাবনা অনেক। তবে এ জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাসের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর চট্টগ্রামে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মিরসরাই ইকোনমিক জোনের বিজিএমইএ গার্মেন্টপল্লীর সুযোগটি নিতে পারেন বন্ধ হয়ে যাওয়া গার্মেন্টের উদ্যোক্তারা।’
তবে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সম্ভাবনা দেখলেও সেখানে গার্মেন্টের মতো শ্রমঘন শিল্পে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করেন ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস ফোরাম, চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি আবু তৈয়ব। তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টশিল্পে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মিরসরাই এলাকায় এখনো শ্রমিকদের থাকার মতো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।’
তবে শ্রমিক সংকট নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন বিজিএমইএ পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি চট্টগ্রাম ইপিজেডের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘১৯৮৪ সালে যখন দেশের প্রথম ইপিজেড চট্টগ্রামের বন্দরটিলায় প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন এই এলাকাটিও ছিল বিরানভূমি। শুনেছি তখন এখানে ছিল শুধু ধানিজমি। অথচ এই ইপিজেডকে কেন্দ্র করে সারা দেশ থেকে শ্রমিকরা এখানে জড়ো হয়েছে। এখন এটিই চট্টগ্রামের সবচেয়ে ঘনবসতি এলাকা। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলেও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হলে স্বাভাবিকভাবে সারা দেশ থেকে শ্রমিকরা এসে সেখানে জড়ো হবে।
এ ছাড়া রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ও তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দারুণ চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে দেশের পোশাক খাত। এই চ্যালেঞ্জে টিকতে না পেরে শুধু চট্টগ্রামেই বন্ধ হয়েছে তিন শতাধিক কারখানা। তবে এর মধ্যেও অনেকেই ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন ঠিকই। প্যাসিফিক জিন্স, মিরাজ গ্রুপ, ফোরএইচ গ্রুপ, কেডিএস গ্রুপ, এশিয়ান গ্রুপের মতো বড় উদ্যোক্তারা ঠিকই তাঁদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন। অনেকে বড় জায়গা না পেয়ে শহরের বাইরে গিয়ে বৃহদাকার গার্মেন্ট কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিজিএমইএ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পারে আনোয়ারা, বোয়ালখালী ও পটিয়ায় কারখানা স্থাপন করেছেন বেলামী টেক্সটাইল, এপিটি ইন্টারন্যাশনাল, রিজেন্ট টেক্সটাইল, ফিগ ফ্যাশন, আরেফিন টেক্সটাইল, হ্যারডস গার্মেন্টস, জিএসএল এক্সপোর্ট, বেঞ্চমার্ক অ্যাপারেল ও ওশান স্টেট লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠান। এসব কারখানার বেশির ভাগ এরই মধ্যে উৎপাদনে গেছে।









