সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
দেশে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এ হিসাব সরকারি সংস্থা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই। এই ১৫ হাজার বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই গড়ে উঠেছে রাজধানীতে। বাকিগুলো ছড়িয়ে আছে দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দরে। নিত্যনতুন নামে, নানা সুবিধার প্রচার চালিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায়ও পৌঁছে গেছে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে গত সাত বছরে চালু হয়েছে ১৩ হাজার বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি করে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসার সুবিধাগত দিক থেকে বেসরকারি পর্যায়ের চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের এই সংখ্যা বেশ ইতিবাচক মনে হলেও এর উল্টো পিঠে ফুটে উঠেছে সেবার চেয়ে লাভজনক বাণিজ্যে রূপান্তরের অমানবিক চিত্র। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকেই জানা যায়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় সবচেয়ে বেশি। ২০ বছরে ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের জন্য চিকিৎসা ব্যয় ৩৭ শতাংশ থেকে কমে ২৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অন্য খাতের চেয়ে সহজে দ্রুত মুনাফা পাওয়ার আশায় এখন স্বাস্থ্য খাতের ব্যবসায় ঝুঁকে পড়েছে বলেও মনে করছেন ওই বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এর পরিণতিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষ ক্রমাগত নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যার কথা শুনে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. শাহলা খাতুন। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে এখানে ব্যবসার সহজ মওকা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এই স্বাস্থ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো কি শুধু নিজেরা আয় করে ফুলে-ফেঁপে উঠছে, না রোগীদের নিঃস্ব করে ফেলছে সেটাও দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকারের উচিত এদিকে নজরদারি বাড়ানো। ’
অধ্যাপক ডা. শাহলা খাতুন আরো বলেন, ‘রোগ হলে মানুষ এমনিতেই বিপদে পড়ে যায়। তার ওপর যদি চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওই বিপদ আরো বাড়ে তাহলে মানুষ তো রোগে বাড়িতে বসে ভুগলেও খরচ সামলাতে না পারার ভয়ে চিকিৎসার ধারেকাছে যাবে না। কিন্তু চিকিৎসা তো মানুষের মৌলিক অধিকার। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় তো এড়ানো যাবে না। ’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের ভ্রান্তনীতি ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই দেশে এখন চিকিৎসা ব্যবসার মওকা শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা ব্যয় এখন বাংলাদেশে—এটা বড়ই লজ্জার ব্যাপার। মানুষের অসুস্থতা ও দুর্বলতাকে পুঁজি করে যে যেভাবে পারছে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দুই টাকার জিনিসে অবলীলায় ১০ টাকা নিয়ে নিচ্ছে। সরকার কিছুই করছে না। ওষুধের পেছনে রোগীদের সবচেয়ে বেশি খরচ হলেও এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনোই নিয়ন্ত্রণ নেই। কোন ওষুধ উৎপাদনে কী খরচ যায় তা দেখা হয় না। সরকারের উচিত এ ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের কারিগরি বিশেষজ্ঞ টিম করে তাদের মাধ্যমে বিষয়টি শনাক্ত করা। ’
ওই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অবশ্য মানুষের সচেতনতার অভাবকেও দায়ী করেন। তিনি বলেন, মানুষেরও সচেতন হতে হবে। বড় সাইনবোর্ড, ঝকঝকে সাজসজ্জা দেখে ভালো চিকিৎসার আশায় কোথাও গেলে তো গলা কাটবেই। আগে জানতে ও বুঝতে হবে, খোঁজখবর নিতে হবে কোন চিকিৎসায় কোথায় কত খরচ লাগে-না লাগে। তাহলে আর প্রতারিত হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএমআরসি)
চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, ‘শুধু প্রতিষ্ঠান বাড়লেই হবে না, এগুলোর মান কী অবস্থায় আছে সেটা দেখা জরুরি। কোয়ালিটির জায়গায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। এ জন্য দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে। ’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের মহাপরিচালক মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘খরচের কারণে চিকিৎসা এখন মানুষের কাছে বড় একটি ভীতিকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর দিন দিন চিকিৎসা ব্যয় যত বাড়ছে, মানুষ আরো বেশি অসহায় হয়ে পড়ছে। চিকিৎসা বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাবেই এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। মানুষ নিঃস্ব থেকে আরো নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এটা খুবই বিপদের কথা। ’
স্বাস্থ্য অর্থনীতি খাতের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র যত বাড়বে, সরকারের ও মানুষের তত বেশি উপকার হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে সেবার নামে কী হারে মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে সেটা ভালোভাবে মনিটরিং ও গবেষণার অপেক্ষা রাখে। এ জন্য আমাদের দেশে যেসব সংস্থা রয়েছে তাদের আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করা দরকার। ’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালে দেশে সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ছিল ৬৫১, আর বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ছিল ৬১৩। ৩০ বছর পর এখন দেশে সরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের সংখ্যা ৬১০। এর সঙ্গে সাড়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক যোগ করলে তা ১৪ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০১০ সালে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৫০১। অর্থাৎ ২০ বছরের মধ্যে প্রথম ১৩ বছরে দেশের চিকিৎসা খাতে বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান বেড়েছিল মাত্র দুই হাজার আর গত সাত বছরে বেড়েছে বাকি প্রায় ১৩ হাজার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাসেবা প্রার্থী মানুষের অর্থকড়ি সেবার নামে হাতিয়ে নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু মনোবৃত্তির উদ্যোক্তা চিকিৎসা বাণিজ্যকে রমরমা অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। তাঁদের মতে, এই মনোভাব এখনই থামানো জরুরি। নয়তো সামনে এমন অবস্থা হবে যে চিকিৎসা সুবিধা চোখের সামনে থাকলেও আর্থিক দৈন্যের কারণে মানুষ সেই সুযোগ নিতে পারবে না। ফলে দেশে স্বাস্থ্য খাতে এক ধরনের বৈকল্য তৈরি হবে। মানুষ নিরুপায় হয়ে কম খরচের আশায় চিকিৎসা নিতে ছুটবে আশপাশের দেশগুলোতে।
বিশেষজ্ঞদের এমন আশঙ্কার বাস্তব প্রতিফলন ফুটে উঠেছে সরকারেরই এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের ওই সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে এখনই সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় সর্বোচ্চ। ২০ বছরে চিকিৎসা সুবিধার জোগান বেড়েছে ৯৪ শতাংশ (বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগত দিক থেকে); কিন্তু তাতে চিকিৎসা ব্যয় এক পয়সাও কমেনি, বরং ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের জন্য চিকিৎসা ব্যয় না বেড়ে উল্টো ৩৭ শতাংশ থেকে কমে ২৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে। ১৯৯৭-২০১৫ সাল পযর্ন্ত ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস’-এর সমীক্ষার এই প্রতিবেদন গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়।
ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সে দেশের একজন মানুষের মোট চিকিৎসা খরচের মধ্যে নিজ পকেট থেকে যায় ৬২ শতাংশ, পাকিস্তানে যায় ৫৬ শতাংশ, নেপালে ৪৭ শতাংশ, ভুটানে ২৫ শতাংশ ও মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে একজন মানুষের মোট চিকিৎসা খরচের মধ্যে নিজ পকেট থেকে দিতে হয় ৬৭ শতাংশ। এর মধ্যে আবার ৭০ শতাংশই যায় ওষুধ কেনার পেছনে। বছর বছর এই খরচ বাড়ছেই। ২০১২ সালেও নিজ পকেট থেকে যেত ৬৩ শতাংশ। ওই সমীক্ষায় বলা হয়, শুধু বেসরকারি খাতেই নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানেও চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জোগান বা সুবিধা বাড়লে যেখানে ব্যয় কমার কথা সেখানে দেশে মাথাপিছু মোট চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। ২০১২ সালে যেখানে মাথাপিছু মোট চিকিৎসা ব্যয় ছিল ২৭ মার্কিন ডলার, এখন তা উঠেছে ৩৭ ডলারে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের মহাপরিচালক বলেন, ‘চিকিৎসা খাতে অতিরিক্ত খরচের বিষয়টি সরকারেরও নজরে আছে। তাই বিভিন্ন পরিকল্পনা-আইনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এসব পরিকল্পনা ও আইন বাস্তবায়ন নিয়ে। এগুলো কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে বা হচ্ছে না সেটাই দেখার ব্যাপার। ’ তিনি বলেন, চিকিৎসা যত মানুষের হাতের নাগালে যাবে ততই সরকারের ওপর এ বিষয়ে চাপ কমবে। কিন্তু তাই বলে ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে মানুষকে সর্বস্বান্ত করে ফেলা ঠিক নয়।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অবশ্য সরকারের ভ্রান্তনীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, গার্মেন্টের একটি যন্ত্র আনতে ট্যাক্স ১ শতাংশ লাগলেও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আনতে ক্ষেত্র বিশেষে ১০ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত ট্যাক্স দিতে হয়। অনেকেই এই ট্যাক্স এড়াতে কিংবা এই সুযোগ নিয়ে নানা দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। আবার অনেকেই এই ট্যাক্সের অজুহাতে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা আদায় করে রোগীদের কাছ থেকে। এ ছাড়া নানা ডিভাইস ব্যবহারের নামেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান রীতিমতো ব্যবসা করছে। এসব সরকার ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও মনিটর করতে পারছে না, যার বোঝা চাপে রোগীদের ওপর।
ওষুধের দাম কমানোর তাগিদ দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দেশে উৎপাদিত ওষুধের সাফল্য অনেক, কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় সেই সাফল্য প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই ওষুধের দাম কমাতে হবে। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ওষুধ কম্পানির মালিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশের বেশির ভাগ ভোক্তাই গরিব। দামের কারণে চিকিৎসা করাতে অনেকেরই সমস্যায় পড়তে হয়। এ ক্ষেত্রে বেশি সমস্যা হয় ওষুধ কিনতে গিয়ে। তাই আপনারা ওষুধের দাম কমিয়ে দিন। ’
একই সঙ্গে দেশে ওষুধশিল্পের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে ১৪০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। আমেরিকা, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইতালি, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করা হয়।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পপুলেশন কাউন্সিলের পরিচালক ড. ওবায়েদুর রহমান, বিইউপির ভিসি মেজর জেনারেল মো. সালাউদ্দিন মিয়াজী, ইউএনএফপির প্রতিনিধি লরি কাতো প্রমুখ। সূত্র: কালের কণ্ঠ









