খেলা

আরাফাত মিনহাস—পাকিস্তান কি সেই ‘কাঙ্ক্ষিত অলরাউন্ডার’ পেয়ে গেল

নিউজ ডেস্ক১ নভেম্বর ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

‘আমি খেলোয়াড়দের ব্যাটিং অলরাউন্ডার বা বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করি না। আমি বরং একজন পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত হতে চাই’—কদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলেছিলেন আরাফাত মিনহাস।

একজন ক্রিকেটার, যিনি প্রয়োজনে ব্যাট হাতে দলের বিপর্যয় সামলাতে পারেন, আবার বল হাতে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ তছনছ করে দিতে পারেন। শুধু তাই নয়, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বা প্রবল চাপের মধ্যেও দায়িত্ব নিতে পারেন।

পাকিস্তান ক্রিকেটে এমন একজন ক্রিকেটারের অপেক্ষা দীর্ঘদিনের। সেই অপেক্ষা হয়তো অবশেষে ফুরাতে চলেছে।

সদ্য সমাপ্ত ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে আরাফাত মিনহাসের পারফরম্যান্স অন্তত তেমনই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
সিরিজজুড়ে ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন ২১ বছর বয়সী আরাফাত মিনহাস। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক ম্যাচে ৫৯ রানের ইনিংস খেলার পর বল হাতে নিয়েছেন ৬ উইকেট। আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গতকাল ফাইনালে দলের যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন মাত্র ৩১ বলে ৬১ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলে পাকিস্তানকে শিরোপা জিতিয়েছেন।

সব মিলিয়ে ১৪৯ রান ও ৯ উইকেট নিয়ে হয়েছেন সিরিজসেরা।

সিরিজসেরার পুরস্কার হাতে আরাফাত মিনহাস। ছবি: ইন্সটাগ্রাম
অবশ্য কয়েকটি ম্যাচের পারফরম্যান্স দেখেই কাউকে পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডার বলে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তবে আরাফাত যেভাবে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন, তাতে পাকিস্তান যে একজন সম্ভাবনাময় অলরাউন্ডার পেয়ে গেছে, তা বলাই যায়।

এক ম্যাচেই বাজিমাত

আরাফাতের সামর্থ্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে। ওই ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৮১ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে পাকিস্তান। পরে ১৩৩ রানে পঞ্চম উইকেট হারালে দলের সামনে বড় সংগ্রহ গড়ার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।

সেই কঠিন সময়ে হাসান নেওয়াজের সঙ্গে জুটি গড়ে দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন আরাফাত। ৫৮ বলে ৫৯ রানের ইনিংস খেলেন। হাসান নেওয়াজের ৭৯ রানের ইনিংসের সঙ্গে আরাফাতের ভয়ডরহীন ব্যাটিংয়ে পাকিস্তান ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ৩০২ রান তোলে।

 

তবে আরাফাতের আসল চমক তখনো বাকি। ৩০৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ড ১৮ ওভারে ১ উইকেটে ১১৭ রান তুলে ফেলে। মনে হচ্ছিল, ম্যাচটি পাকিস্তানের হাত থেকে বেরিয়ে গেছে।

কিন্তু এরপরই বল হাতে জ্বলে ওঠেন আরাফাত। তার বাঁহাতি স্পিনে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে ইংল্যান্ড। টম ব্যান্টন, হ্যারি ব্রুক, উইল জ্যাকসদের মতো ব্যাটাররা তার বল সামলাতে হিমশিম খান। ৮.৪ ওভারে ৪০ রান দিয়ে নেন ৬ উইকেট।

আরাফাত মিনহাসের বলে বোল্ড হয়ে ভ্যাবাচ্যাকা হ্যারি ব্রুক। ছবি: রয়টার্স
শেষ দিকে সরাসরি থ্রোতে গাস অ্যাটকিনসনকে রানআউটও করেন। ইংল্যান্ড গুটিয়ে যায় ২১৫ রানে। পাকিস্তান পায় ৮৭ রানের জয়।

একই ম্যাচে ব্যাট হাতে অর্ধশতক, বল হাতে ৬ উইকেট এবং ফিল্ডিংয়ে একটি রানআউট—একজন অলরাউন্ডার এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারেন! এই ম্যাচেই নিজের জাত চেনান আরাফাত।

ফাইনালে আবারও ত্রাতা

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও আরাফাত থেমে থাকেননি। কাল ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তার ব্যাটিং ছিল আরও মহত্ত্বপূর্ণ। ৩২৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান একপর্যায়ে ২৩০ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলে। জয়ের জন্য তখনো প্রয়োজন ৯৬ রান; হাতে ছিল ৭৮ বল।

এমন পরিস্থিতিতে হাসান নেওয়াজের সঙ্গে জুটি বাঁধেন আরাফাত। দুজন মিলে ষষ্ঠ উইকেটে ৯৪ রান যোগ করেন। এই জুটিতে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় ছিলেন আরাফাত। মাত্র ২৮ বলে তুলে নেন অর্ধশতক। শেষ পর্যন্ত ৩১ বলে ৬১ রান করে আউট হন। ইনিংসে ছিল ৫টি চার ও ৪টি ছক্কা।

আরাফাতের এই ঝোড়ো ইনিংসেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় পাকিস্তান। পরে ৩ উইকেট ও ৯ বল বাকি রেখে লক্ষ্যে পৌঁছে যায়।

শুধু একটি ম্যাচ নয়, পুরো সিরিজেই প্রভাব

আরাফাতের পারফরম্যান্সের বিশেষত্ব হলো, তিনি নির্দিষ্ট একটি ম্যাচ নয়; পুরো সিরিজেই দলের প্রয়োজনে অবদান রেখেছেন। ব্যাট হাতে ১৪৯ রান, বল হাতে ৯ উইকেট—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, পাকিস্তানের শিরোপা জয়ে তার অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্রতিপক্ষের কণ্ঠেও মুগ্ধতা

আরাফাতের পারফরম্যান্স নজর এড়ায়নি ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সাবেক ক্রিকেটারদেরও। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন ধারাভাষ্যের সময় তার প্রশংসা করে বলেন, ‘মাইক হেসন (পাকিস্তানের প্রধান কোচ) অলরাউন্ডার চান, আর তিনি আরাফাত মিনহাসকে পেয়ে গেছেন।’

ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকও আরাফাতের বোলিংয়ে মুগ্ধ হয়েছেন, ‘সে ভালো বোলার। খুব ভালো বোলিং করেছে। আমার মনে হয়, ফিল্ডিংয়েও সে অসাধারণ। আমরা তার ভিডিও দেখেছি, কিন্তু তার বিপক্ষে খুব বেশি খেলিনি। এই ম্যাচে সে অন্য সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল।’

পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার ওয়াকার ইউনিস আরাফাতের সঙ্গে কথোপকথনে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান। আরাফাত বলেন, ‘এ পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য যে পরিশ্রম করেছি, সেটি কেবল এখানে পৌঁছানোর জন্যই ছিল। এখন আমার লক্ষ্য আরো বড় এবং আরো দূরে। ক্যারিয়ারের শুরুতে এমন পারফরম্যান্স করতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। তবে আমাকে আরো অনেক কিছু করতে হবে।’

এবার ধারাবাহিকতার পরীক্ষা

পাকিস্তান ক্রিকেটে অলরাউন্ডারের অভাব নতুন কিছু নয়। একসময় ইমরান খান, শহীদ আফ্রিদি, আবদুল রাজ্জাক, মোহাম্মদ হাফিজদের মতো ক্রিকেটাররা ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য দেখিয়েছেন।

পরবর্তী সময়ে শাদাব খান, ফাহিম আশরাফরা সেই জায়গা পূরণের চেষ্টা করেছেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে দুই বিভাগে সমান কার্যকর, নির্ভরযোগ্য একজন অলরাউন্ডার পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল দলটি।

আরাফাত মিনহাস সেই শূন্যতা পূরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। তার বাঁহাতি স্পিন পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণে বাড়তি বৈচিত্র্য যোগ করতে পারে। পাশাপাশি ব্যাটিং গভীরতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও হতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সাত নম্বরে নেমে দ্রুত রান তোলার সামর্থ্য তাকে আলাদা করে তুলছে।

ব্যাটিংয়ে ভয়ডরহীন আরাফাত মিনহাস। ছবি: ইন্সটাগ্রাম
তবে এখনই আরাফাতকে পাকিস্তানের পরবর্তী ইমরান, রাজ্জাক, আফ্রিদি কিংবা হাফিজ বলে দেওয়া ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করা, বিভিন্ন কন্ডিশনে পারফর্ম করা (বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে) এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

‘মুলতানের সুলতান’ বললে এখনো একটি নামই সামনে আসে—ইনজামাম উল হক। তবে ভবিষ্যতে ইনজামামকে ছাপিয়ে আরাফাত মিনহাস এই নামে পরিচিতি পেলে অবাক হবেন না যেন। আরাফাতও যে মুলতানেরই ছেলে!