আন্তর্জাতিক

৮০ বছরে ভারত : বাংলাদেশের জন্য এই যাত্রার গুরুত্ব কী

নিউজ ডেস্ক১৫ আগস্ট ২০২৬১০ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

১৫ আগস্ট ভারত যখন ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও ভারতের এই পথচলার দিকে গভীর নজর রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু বৃহত্তর প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক নয়।

দুই দেশ ইতিহাস, নদী, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাও দুই দেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই বাংলাদেশের জন্য ভারতের এগিয়ে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে যা ঘটে তার প্রভাব শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আঞ্চলিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলে। দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব পড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও। দেশটির পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব পড়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়।

আর বিশাল বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে ভারত এই বৈচিত্র্য কতটা ভালোভাবে সামলাতে পারে সেখান থেকেও এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলো অনেক কিছু শিখতে পারে।
১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হয় তখন দেশটির সামনে খুব একটা ভালো পরিস্থিতি ছিল না। ভারত উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল ব্যাপক দারিদ্র্য, অশিক্ষা, খাদ্য সংকট ও দুর্বল অবকাঠামো। ভাষা, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিতে ভারতের বৈচিত্র্য ছিল অসাধারণ। তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন এত বড় ও বৈচিত্র্যময় একটি দেশ গণতন্ত্র ধরে রাখতে পারবে কি না।

এমনকি দেশটি একসঙ্গে টিকে থাকতে পারবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ ছিল। আট দশক পর সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক নেই। ভারত টিকে গেছে। ধীরে ধীরে নিজের ভিত্তি শক্ত করেছে। আর সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে।
সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য হলো দেশটির সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকা। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও ভারত নিয়মিত নির্বাচন করেছে। ভোটের মাধ্যমে এক দল বা নেতৃত্বের কাছ থেকে অন্য দল বা নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরও অব্যাহত রেখেছে।

বাংলাদেশের দৃষ্টিতে ভারতের এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রের ইতিহাস খুব একটা সহজ নয়। বিভিন্ন সময়ে সামরিক হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাংবিধানিক শাসনে বাধা এসেছে এই অঞ্চলে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ভারত আট দশক ধরে একটি কার্যকর নির্বাচনী ব্যবস্থা ধরে রাখতে পেরেছে। এটি কোনো ছোট অর্জন নয়।

ভারতের ঐক্য আরও বেশি বিস্ময়কর। ভারতের শত শত ভাষা ও আঞ্চলিক উপভাষা, নানা ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক পরিচয় চাইলে দেশটির দুর্বলতার কারণ হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব বৈচিত্র্যকে একটি রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখা হয়েছে। অবশ্য ভারতের পথচলা পুরোপুরি চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, বর্ণ-বৈষম্য এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক এখনও দেশটির বাস্তবতার অংশ। ভারত দেখিয়েছে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে একটি দেশকে সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয়ভাবে একরকম হতে হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গল্প অবশ্য একেবারেই আলাদা। স্বাধীনতার সময় ভারতের অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর ও দরিদ্র। আজ ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ শিল্প, উৎপাদন, আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে ভারত এখন বিশ্বে প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু এই পরিবর্তন সবার জন্য সমান হয়নি। এখনও লাখো ভারতীয় দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন। অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সরকারি সেবাও ঠিকমতো পাচ্ছেন না। তারপরও গত কয়েক দশকে ভারতের পরিবর্তনের ব্যাপকতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

কৃষি গবেষণা, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, উন্নত জাতের বীজ এবং লাখো কৃষকের কঠোর পরিশ্রম দেশটির কৃষিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। একসময় খাদ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ভারত এখন বড় একটি কৃষি উৎপাদনকারী দেশ। দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটের অভিজ্ঞতা থাকা এই অঞ্চলের জন্য ভারতের খাদ্যে স্বনির্ভর হওয়ার গল্প আধুনিক এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের উদাহরণ। দারিদ্র্য কমাতেও ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, আবাসন, ব্যাংকিং, সড়ক, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে লাখো মানুষ আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় এসেছে। এতে দেশের বড় একটি অংশের মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে। এরপর আসে অবকাঠামো উন্নয়নের কথা। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। রয়েছে আধুনিক রেল যোগাযোগ, মেট্রো ব্যবস্থা, বিমানবন্দর, বন্দর, সেতু ও টানেল। অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রকৌশল সক্ষমতাও ভারতের অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল যোগাযোগ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন মানুষ সহজেই যোগাযোগ করতে পারছে, ডিজিটাল লেনদেন করতে পারছে এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে পারছে।

বাংলাদেশের জন্য এই উন্নয়নের বাস্তব গুরুত্ব রয়েছে। এই অঞ্চলে সড়ক, রেল, বন্দর ও নৌপথের উন্নতি হলে পূর্ব দক্ষিণ এশিয়া আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। ভারত ও পুরো অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লে বাংলাদেশও লাভবান হতে পারে। তবে এই যোগাযোগব্যবস্থা হতে হবে পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে। দুই দেশের জন্যই এর বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির লক্ষ্যও বিশ্বে দেশটির ভাবমূর্তি বদলে দিয়েছে। একসময় সীমিত সম্পদ নিয়ে শুরু হওয়া ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি এখন দেশটির গর্বের বিষয়। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিকভাবেও সম্মান অর্জন করেছে। চন্দ্রযান ও মঙ্গলযান মিশন দেখিয়েছে বড় মহাকাশ শক্তিগুলোর মতো বিপুল বাজেট না থাকলেও ভারত বড় বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। চন্দ্রযান-৩-এর সফলভাবে চাঁদের মাটিতে অবতরণ ভারতের এই সাফল্যকে আরও শক্ত করেছে।

পারমাণবিক বিজ্ঞান, জীবপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও আধুনিক উৎপাদন খাতে ভারতের অগ্রগতি দেশটির বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। ভারতের ওষুধ শিল্প এখন বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টিকা উৎপাদনের সক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভারতীয় চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসা পেশাজীবীরা বিশ্বজুড়ে সম্মানিত।

দেশটির ডিজিটাল পরিবর্তনও হয়তো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল পরিচয়, মোবাইল যোগাযোগ, তাৎক্ষণিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সরকারি সেবা এখন ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে গেছে। এত বড় পরিসরে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের নজির খুব কমই আছে। ভারতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে প্রযুক্তির মাধ্যমে লাখো মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব। বাংলাদেশও নিজের ডিজিটাল ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে। তাই ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শেখার অনেক কিছু আছে। ভারত কীভাবে সফল হয়েছে, আবার কোথায় কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে-দুই দিক থেকেই শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এসব পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে ভারতের অবস্থানও বদলে গেছে।

১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসা ভারত তখন ছিল অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল একটি নতুন প্রজাতন্ত্র। আজ সেই ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত শক্তি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দিন দিন আরও প্রভাবশালী একটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া, জাপান, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং এশিয়ার অন্যান্য শক্তির সঙ্গে ভারতের বাড়তে থাকা সম্পর্ক তার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও তুলে ধরে।

বাংলাদেশ ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের জন্য শক্তিশালী ভারত অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সেই শক্তি যদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সুযোগ ও যোগাযোগ বাড়াতে কাজে লাগে, তবেই তা সবার জন্য ভালো। একই সঙ্গে ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোও আশা করে ভারত তার শক্তি ব্যবহারের সময় তাদের স্বার্থের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। এখানেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বেশি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাংলাদেশ ও ভারত অনেক অগ্রগতি করেছে। তবে কিছু অমীমাংসিত বিষয় এখনও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও তার কর্মকাণ্ডকে ঘিরে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা। এসব বিষয়ে দুই দেশের বড় সম্পর্ককে আড়াল করা উচিত নয়। আবার বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে কঠিন বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক হবে না। একটি পরিণত সম্পর্কে যেমন পারস্পরিক সম্মানের জায়গা থাকতে হয়, তেমনি মতভেদের জায়গাও থাকতে হয়। এই নীতিটি ভারতের নিজের গণতান্ত্রিক পথচলার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

ভারতের সভ্যতার অন্যতম বড় শক্তি হলো ভিন্নতাকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা। বহু বছর ধরেই নানা মত, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিকে জায়গা দেওয়ার এই ঐতিহ্য ভারতের সমাজে রয়েছে। স্বাধীনতা, সমতা এবং নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী চলার অধিকার ভারতের সংবিধানের অন্যতম মূল ভিত্তি। এই বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের চর্চা ধরে রাখা ভারতের ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দেশের ভেতরে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভারতের অবস্থান অনেকটাই এর ওপর নির্ভর করবে। একটি শক্তিশালী ভারতের জন্য সবার একই মতের হওয়া জরুরি নয়। বরং আত্মবিশ্বাসী হওয়াটাই বেশি জরুরি। আর এই আত্মবিশ্বাসের মধ্যে সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতাও থাকতে হবে। সংসদ, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তখনই শক্তিশালী হয় যখন তারা ভয় ছাড়াই সরকারের কাজ ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী তার প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও পড়ে। একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ভারত পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই ভালো। অন্যদিকে, ভারতে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অস্থিরতা বাড়লে কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব পুরো অঞ্চলেই পড়বে। ভারতের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীও দেশটির সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আজকের প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার অর্থ শুধু ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি নয়। তাদের কাছে স্বাধীনতার অর্থ দারিদ্র্য, বৈষম্য ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি। একই সঙ্গে নতুন কিছু করার, প্রশ্ন তোলার, নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগানোর এবং ভালোভাবে এগিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতাও এর অংশ। বাংলাদেশের তরুণদেরও একই ধরনের স্বপ্ন রয়েছে।

আকার, অর্থনৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের চেয়ে অনেক আলাদা। তবে দুই দেশের সামনে কিছু প্রশ্ন একই। কীভাবে পর্যাপ্ত ভালো কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়? কীভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করা যায়? কীভাবে অর্থনীতিতে নারীদেরকে আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়? কীভাবে মানুষের সুযোগ বাড়াতে প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো যায়? আর কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়? তাই ৮০ বছরে ভারতের গল্প শুধু দেশটির একক গল্প নয়। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার গল্প।

খাদ্য সংকট থেকে খাদ্যনিরাপত্তা, প্রযুক্তিতে নির্ভরশীলতা থেকে নতুন উদ্ভাবন, দুর্বল অবকাঠামো থেকে বিশ্বমানের প্রকৌশল সাফল্য এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছানো-ভারতের এই পথচলা সত্যিই অসাধারণ। তবে ভারতের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো ‘ভারত’ ধারণাটির টিকে থাকা। বিশাল ও বৈচিত্র্যময় একটি সভ্যতা কীভাবে সাংস্কৃতিকভাবে একরকম না হয়েও রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে, ভারত তার একটি উদাহরণ তৈরি করেছে।

ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি ও অঞ্চলের এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও ভারত দেখিয়েছে বৈচিত্র্য সবসময় বিভেদের কারণ হবে এমন নয়। এই বৈচিত্রই একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি একই সঙ্গে অনুপ্রেরণার এবং মনে রাখার মতো একটি বিষয়। সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ তারা নয়, যারা সবার মধ্যে একই মত বা একই ধরনের জীবনযাপন চাপিয়ে দেয়। বরং যারা ভিন্ন মত ও ভিন্নতাকে জায়গা দিতে পারে তারাই বেশি শক্তিশালী। একইভাবে, সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রও সেই দেশ নয়, যেখানে কোনো মতবিরোধ নেই। বরং যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের মাধ্যমে মতভেদ সামলাতে পারে, সেটিই শক্তিশালী।

ভারতের জাতীয় পতাকা ৮০তম বারের মতো যখন আকাশে উড়ছে, তখন বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রেখেই ভারতের অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, স্বচ্ছতা এবং একে অপরের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে।

বিগত ৬০ দশকে ভারত অনেক দূর এগিয়েছে। দেশটির এই পথচলা সত্যিই অসাধারণ। এখন ভারতের সামনে শুধু আরও ধনী বা আরও শক্তিশালী হওয়ার চ্যালেঞ্জ নেই। এর পাশাপাশি আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। সমাজে ঐক্য ও সংহতি আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী নীতিতেও এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ছোট প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতের শক্তি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী বোধ করে। বাংলাদেশের জন্য ভারতের পরবর্তী অধ্যায়ে এটিই হবে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অর্জন।

৮০ বছরে ভারতের টিকে থাকা নিয়ে যারা একসময় সন্দেহ করেছিলেন তাদের এখন ভারত স্পষ্ট জবাব দিয়েছে। ভারত টিকে আছে এবং নিজেকে বদলে নিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে কি হবে সেটি বলা কঠিন।

ভারত কি তার বিশাল অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক শক্তিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং আরও শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়ার কাজে লাগাতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ভারতের মানুষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশের জন্যই এর গুরুত্ব রয়েছে। আর সম্ভবত বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।