সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
দ্বীপ জেলা ভোলার বিচ্ছিন্ন উপজেলা মনপুরা। লক্ষাধিক মানুষের বাস এ উপজেলায়।
তবু জেলা শহরে যাতায়াতে গড়ে ওঠেনি কোনো নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম। দ্বীপের বাসিন্দাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনিরাপদ নৌযানে করে পাড়ি দিতে হয় উত্তাল মেঘনা।
বর্ষা মৌসুমে এই ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়ে। উপজেলা ঘোষণার পর গত ৪৩ বছরেও নিরাপদ নৌ যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত এখানকার বাসিন্দারা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, সাগর মোহনার দৃষ্টিনন্দন এই উপজেলার মানুষের নিরাপদ যাতায়াতে ২০০২ সালে প্রথম মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌ রুটে সি-ট্রাক চালু করে সংস্থাটি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সি-ট্রাক চালু করা হলেও অধিকাংশ সময় যান্ত্রিক ত্রুটিসহ নানা অজুহাতে তা বন্ধ থাকে। তাই বাধ্য হয়ে মালবাহী ট্রলারে করে উত্তাল মেঘনা নদী পাড়ি দিতে হয় মনপুরার মানুষকে। এতে একদিকে যেমন জীবনের ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে ব্যয় হয় অতিরিক্ত টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ ট্রলার মালিকদের সুবিধা দিতে সরকারি সি-ট্রাকটি ইচ্ছা করেই বন্ধ রাখেন ইজারাদার।
রুটটিতে যাতায়াতকারী যাত্রীরা জানান, মনপুরা থেকে জেলা শহরে আসার একমাত্র নিরাপদ মাধ্যম সরকারি সি-ট্রাক। এর আগে বিভিন্ন সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বলে যানটি কিছু দিনের জন্য বন্ধ রেখে পুনরায় চালু করা হতো। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর মাসে বন্ধ হওয়ার পর সাত মাস ধরে সেটি আর চালু করা হয়নি। তাই অবৈধভাবে চলা ট্রলারে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে নদী পার হতে হয় তাদের।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই।
বিআইডাব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর ভোলার ইলিশা থেকে সাগর মোহনা পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১১০ কিলোমিটার এলাকাকে ডেঞ্জার জোন (ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সাত মাস সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর কর্তৃক ফিটনেস বা ‘সি-সার্ভে’ সনদ ছাড়া কোনো নৌযান (লঞ্চ বা ট্রলার) চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দুপুর ১২টার দিকে একটি মালবাহী স্টিলবডি ট্রলারে করে দুই শতাধিক যাত্রী মনপুরা থেকে তজুমদ্দিন লঞ্চঘাটে আসে। ট্রলারটি ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। মালামাল রাখার জায়গায় নারী, শিশুসহ যাত্রীরা গাদাগাদি করে বসা। কেউ কেউ বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে। ট্রলারটিতে নেই কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সি-সার্ভে সনদ ছাড়াই এ রুটে সব ধরনের নৌযান চলছে গত প্রায় সাত মাস ধরে ট্রলারটি যাত্রী পারাপার করছে বলে জানা গেছে।
একই দিন বিকেল ৩টায় তজুমদ্দিন সি-ট্রাক ঘাট থেকে ফিরতি ট্রলারের খোন্দলে (মালামাল রাখার যায়গা) তোলা হয় নারী, শিশুসহ দুই শতাধিক যাত্রী। মানুষ আর মালামাল একসঙ্গে রাখা। নেই বসার জায়গা কিন্তু নিরাপত্তা সরঞ্জাম। প্রচণ্ড গরম আর বৈরী আবহাওযায় হাসফাঁস অবস্থা সবার। এর মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রমত্তা মেঘনা নদী পাড়ি দিচ্ছে শতাধিক মানুষ। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজেই এভাবে গত সাত মাস ধরে নদী পাড়ি দিচ্ছেন যাত্রীরা।
মনপুরার স্কুলশিক্ষক তপন চন্দ্র হাওলাদার বলেন, ভোলার বিচ্ছিন্ন উপজেলা মনপুরা। বর্তমানে এ উপজেলায় যাতায়াতের নিরাপদ কোনো ব্যবস্থা নেই।
তপন চন্দ্র জানান, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তজুমদ্দিন থেকে মনপুরায় যাওয়ার জন্য ঘাটে এসেছেন তিনি। কিন্তু সি-ট্রাক না থাকায় ভয়ে ট্রলারে করে যেতে চাচ্ছেন না। তিনি বলেন, এখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল মনপুরা-তজমুদ্দিন নৌ রুটে চলাচলকারী সি-ট্রাক। আগে এটি পাঁচ-সাত দিন পর পর যান্ত্রিক ক্রটির কারণে বন্ধ থাকত। গত সাত মাস ধরে সি-ট্রাকটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে মনপুরার মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এ কারণে নতুন একটি সি-ট্রাক দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
চিকিৎসক অতিম ঘরামী বলেন, ছোট ট্রলারে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। নদীতে ঝড় উঠলে নারী, শিশুসহ ট্রলারের লোকজন কান্নাকাটি করে। তার পরও কিছুই করার নাই। জীবনের তাগিদে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে হয়। এ ছাড়া যাওয়ার আর কোনো মাধ্যম নেই।
মাদরাসা শিক্ষক মাওলাা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, পূর্ণাঙ্গ উপজেলা ঘোষণার প্রায় ৪৩ বছর পার হলেও মনপুরায় যাতায়াতে নিরাপদ নৌপথ গড়ে ওঠেনি। বাধ্য হয়ে উপজেলার বাসিন্দাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে হয়। অথচ মনপুরা উপজেলা পর্যটনশিল্পে এগিয়ে থাকলেও এখানে নিরাপদ নৌ যোগাযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজর নেই। যে কারণে অবৈধভাবে চলা ট্রলারের মালিকদের কাছে জিম্মি থাকতে হচ্ছে তাদের।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডাব্লিউটিসি) ভোলার ব্যবস্থাপক মো. কাওছার জানান, তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে চলাচলকারী সি-ট্রাক এসটি ইলিশার ইজারাদারের চুক্তি ভঙ্গের কারণে ইজারা বাতিল করা হয়েছে। গত ১ জুলাই নতুন করে টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। মাসিক দুই লাখ ৬০ হাজার টাকায় আনোয়ার চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি ইজারা পেয়েছেন। তিনি নিয়ম মাফিক টাকা জমা দিলে তাকে জাহাজটি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এ ছাড়া মনপুরার মানুষের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য চরফ্যাশনের বেতুয়া থেকে মনপুরা হয়ে নোয়াখালীর চেয়ারম্যানঘাট পর্যন্ত একটি সি-ট্রাক চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সরেজমিন জরিপ হয়েছে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সেটি চালু করা হবে।
বিআইডাব্লিউটিএ ভোলা নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, মনপুরা-তজমুদ্দিন রুটে সি-ট্রাক বন্ধ থাকায় যাত্রীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে ট্রলার চলাচল কিছুটা শিথিল রয়েছে। সি-ট্রাক চালুর ব্যাপারে আমরাও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগোযোগ করছি।
এ ব্যাপারে বিআইডাব্লিউটিসির উপবাণিজ্য ব্যবস্থাপক (যাত্রী) খন্দকার মুহাম্মদ তানভীর হোসেনের ভাষ্য, যান্ত্রিক ত্রুটি ও ইজারা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সি-ট্রাকটি বন্ধ ছিল। জটিলতা কাটিয়ে শিগগিরই সি-ট্রাক চালু করা হবে।
এদিকে সম্প্রতি ভোলা সফরে এসে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেছেন, ‘যেসব জায়গায় নৌযান সংকট রয়েছে, সেখানকার বাসিন্দা বা তাদের প্রতিনিধিরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সাধ্য অনুযায়ী নৌযান সরবারাহের চেষ্টা করব। হয় সরকারি জাহাজ, না হয় ব্যক্তি মালিকানা জাহাজ। কোনো অঞ্চলের যাত্রীরা নৌপথে ভোগান্তির শিকার হবে—আমরা তা হতে দেব না।’









