নিজস্ব প্রতিবেদক:
জয়পুরহাটে আলুর বাম্পার ফলন হলেও সে ফলন কৃষকের দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু বাজারে নেই ন্যায্যমূল্য।
তার ওপর হিমাগারে সংরক্ষণের তীব্র সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া, ঘনঘন লোডশেডিং এবং ঘরে রাখা আলু পচে যাওয়ায় জেলার হাজারো আলুচাষি এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বাজারে সে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র আট থেকে নয় টাকায়। আবার হিমাগারে সংরক্ষণ করতে গেলে খরচ আরও বেড়ে ২০ থেকে ২৫ টাকায় দাঁড়াচ্ছে।

ফলে প্রতি কেজি আলুতে সাত থেকে আট টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। অনেকে ধার-দেনা, এনজিও ঋণ কিংবা সুদে টাকা এনে আলু চাষ করেছিলেন। এখন সেই ঋণ পরিশোধ নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
জয়পুরহাট কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩৯ হাজার ৩০০ থেকে ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে।
উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন। অথচ জেলায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ২১টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র দুই লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টন। উৎপাদিত আলুর প্রায় ২২ শতাংশ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। বাকি বিপুল পরিমাণ আলু কৃষকদের বাড়িতে, উঠানে কিংবা অস্থায়ী গুদামে পড়ে আছে।
কালাই পৌর এলাকার সরদার পাড়ার কৃষক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ২০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।
প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজার দরে আলু বিক্রি করলে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠবে না।
একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন উদয়পুর ইউনিয়নের আকলাপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ৭ বিঘা ১৪ শতক জমিতে আলু চাষ করেছেন। কিছু আলু হিমাগারে রাখতে পারলেও জায়গার সংকটে বাকিগুলো বাড়িতে রাখতে হয়েছে। এখন সে আলুর অনেকটা পচে যাচ্ছে।
কৃষকদের এ দুর্দশার পেছনে শুধু বাজারমূল্যের পতন নয়, রয়েছে সংরক্ষণ ব্যবস্থার ভয়াবহ সংকটও। কৃষি বিভাগ বলছে, অনেক কৃষক আলু হিমাগারে রাখতে চাইলেও জায়গা না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। গত বছর জেলায় প্রায় দুই লাখ ছয় হাজার মেট্রিক টন আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। প্রতি কেজির জন্য ভাড়া গুনতে হয়েছিল ৬ দশমিক ২৫ টাকা। কিন্তু এবার উৎপাদন বেশি হওয়ায় মৌসুমের শুরু থেকে জেলার বিভিন্ন বাজারে আলুর দাম আশানুরূপ পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে ঘনঘন লোডশেডিং পরিস্থিতিকে নতুন করে আরও জটিল করে তুলেছে। বিদ্যুতের অভাবে হিমাগারগুলো স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালিয়ে হিমাগার সচল রাখতে হচ্ছে। হিমাগার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, প্রতি ঘণ্টায় ৭৫ থেকে ৮০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল খরচ হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনেক হিমাগার কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে সংরক্ষণ ভাড়া বাড়ানোর চিন্তাও করছেন।
পুনট কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার বিপ্লব ঘোষ বলেন, ডিজেলের বর্তমান উচ্চমূল্যের কারণে জেনারেটর চালিয়ে দীর্ঘসময় হিমাগার ঠান্ডা রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক সময় মেশিনারিজেও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। এতে হিমাগার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পল্লী কোল্ড স্টোরেজের মালিক মো. মোশারফ হোসেন ভুট্টো জানান, আগে যেখানে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার ডিজেল লাগতো, এখন সেটি বেড়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।
কৃষক জামিল হোসেন বলেন, অনেক আশা করে আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগারের ভেতরে আলুর গায়ে পানি জমছে এবং পচনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আলু নষ্ট হয়ে গেলে তাদের সব বিনিয়োগ ডুবে যাবে।
অন্যদিকে আলু ব্যবসায়ী মিঠু ফকির বলেন, এ বছর বাজারে আলুর সরবরাহ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় দাম পড়ে গেছে। হিমাগারের সংকটে কৃষকেরা একসঙ্গে আলু বিক্রি করায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিদেশে আলু রপ্তানি কমে যাওয়া এবং জ্বালানি সংকটও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, হিমাগারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক কৃষক বাড়িতেই আলু মজুদ করেছেন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ না করায় আলুর গুণগত মান নষ্ট হয়ে পচনের হার বাড়ছে। এতে শুধু কৃষকের ক্ষতিই হচ্ছে না,বাজার ব্যবস্থাপনাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, উৎপাদনের তুলনায় হিমাগারের ধারণক্ষমতা খুব সীমিত। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে বাড়িতে আলু সংরক্ষণ করেছেন। কিন্তু বর্তমান অতিরিক্ত গরম, আর্দ্রতা ও টানা বৃষ্টির কারণে আলুতে দ্রুত পচন ধরছে।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মেহেদী হাসান বলেন, উৎপাদনের তুলনায় হিমাগারের ধারণক্ষমতা কম হওয়ায় প্রতিবছরই সংরক্ষণ সংকট তৈরি হয়। সরকারি পর্যায়ে আলু সংগ্রহ কার্যক্রম বাড়ানো, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের ক্ষতি অনেকটা কমানো সম্ভব হবে।









