সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
রাত পোহালেই পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হবে ইসরায়েলে। ফিলিস্তিনে দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর সামরিক অভিযান পরিচালনা, ইরানে হামলা করাসহ বিভিন্ন কারণে এ নির্বাচনে এমনিতেই চাপে আছেন নেতানিয়াহু; তার সেই চাপকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে প্রবাসী ইসরায়েলি ভোটাররা।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভোট দিতে নিউ ইয়র্ক থেকে ইসরায়েলে এসেছেন মোশে লাভি। এপিকে তিনি জানান, বর্তমান সরকারের ওপর থেকে তার আস্থা উঠে গেছে এবং ভোট দেওয়ার মাধ্যমেই তিনি নিজের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিতে চান।

নেতানিয়াহুর বিরোধিতাকারীদের মধ্যে লাভি একা নন, কিংবা তিনি কোনো ক্ষুদ্র কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর অংশও নন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম নির্বাচনে—অর্থাৎ মঙ্গলবারের এ নির্বাচনে ভোট দিতে যে ৬৭,০০০ ইসরায়েলি নাগরিক দেশে ফিরছেন, লাভি তাদেরই একজন। শুধু ভোট দিতে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ফেরার কারণ প্রসঙ্গে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে মোশে লাভি বলেন, “ইসরায়েল রাষ্ট্রের কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো বিদেশে বসবাসরত ইসরায়েলিদের জীবনেও প্রভাব ফেলে। তাই আমার ভোট দেওয়ার অধিকার যৌক্তিক, কারণ এই নীতিগুলোর প্রভাব আমার ওপরও পড়বে।”
তবে এসব সত্ত্বেও, জনমত জরিপে তিনি সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের সঙ্গে প্রায় সমানে সমান অবস্থানে রয়েছেন। আইজেনকোট সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন।
নেতানিয়াহুর এসব কর্মকাণ্ড তাকে ইসরায়েলের অতি-রক্ষণশীল মহলে জনপ্রিয় করে তুললেও, মধ্যপন্থী ইসরায়েলিদের কাছে, বিশেষ করে বিদেশে বসবাসরতদের কাছে তিনি একজন অবাঞ্ছিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
কানাডার টরন্টোতে বসবাসকারী ইয়েল নাত্রা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানিয়েছেন যে, গত দুই দশকে তিনি ইসরায়েলের কোনো নির্বাচনে ভোট দেননি। তবে দেশটিতে কট্টর ডানপন্থীদের উত্থানের প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করছেন, এবার ভোট দেওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় নেই।
নাত্রা বলেন, “আমি যে ইসরায়েলে বড় হয়েছি, তা হারিয়ে যাচ্ছে। এবার যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়, তবে কী ঘটবে তা জানি না।”
‘এই সরকার প্রতিদিন সংকটের গর্তকে আরও গভীর করছে’
হাদার সাসকিন্দ যুক্তরাষ্ট্র থেকে চার আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েলে এসেছেন ভোট দিতে এবং ‘ইসরায়েলের গণতন্ত্রকে পুনরায় নিশ্চিত করার’ লক্ষ্যে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এপি-কে সাসকিন্দ বলেন, “ইসরায়েল সংকটের গর্তে পড়েছে এবং নেতানিয়াহু ও তার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিদিন গর্তটিকে আরও গভীর করছে।”
“নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে কোদালটি (গর্ত খোঁড়ার হাতিয়ার) হাত থেকে নামিয়ে রাখা”, বলেছেন সাসকিন্দ।
তিনি চান, নতুন ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় তাদের বর্তমান নীতি পরিবর্তন করুক, বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করুক এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনুক।
‘দ্য টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিশাল লেভিত ও গিলি শাভিত নামের এক যুগল তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানটি নির্বাচনের আগের দিন আয়োজন করেছেন, যাতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় ৩০ জন অতিথি বিয়ের পাশাপাশি ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
যারা ভোট দেওয়ার জন্য উড়ে এসেছেন, তাদের মধ্যে এমন অনেকেই একসময় নেতানিয়াহুকে সমর্থন করতেন। নিজেকে ডানপন্থী মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া নাত্রা জানান, নব্বইয়ের দশকে তিনি নেতানিয়াহুকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য ব্যর্থতার দায় নিতে অস্বীকার করা এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি নেতানিয়াহুর সমর্থন তাকে নেতানিয়াহুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে।
নাত্রার ছোট বোন তামার ইচিলভ বলেন, নেতানিয়াহুর শাসনামলে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যে ‘ভয়াবহ কর্মকাণ্ড’ চালিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টিসেমিটিজম) বাড়িয়ে তুলেছে। তিনি জানান, এসব ঘটনা তাকে ভোট দেওয়ার জন্য ইসরায়েলে আসতে অনুপ্রাণিত করেছে।
“মানুষ আমাদের পছন্দ করে না, আর তাদের দোষও দেওয়া যায় না”, দ্য টাইমসকে বলেন ইচিলভ
৪৪ বছর বয়সী এতি উইসোটজকি কোহেন জানান, ইসরায়েলে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনতি এবং উদারপন্থী কণ্ঠস্বরগুলোর জন্য জায়গা সংকুচিত হয়ে আসায় তিনি গত বছর তাঁর স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন। তবে, তিনি এখন ভোট দেওয়ার জন্য ফিরে এসেছেন।
কোহেন জানান, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘১২ দিনের যুদ্ধ’-এর সময় তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নেতানিয়াহুর সরকার যেকোনো কিছু করতে পারে।
কোহেন বলেন, “তারা ইসরায়েলি জনগণকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে দেখছে। আমি ভবিষ্যতে দেশে ফিরে এসে স্থায়ী হতে চাই, কিন্তু নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে তা কঠিন হবে।”
জোরিক নিতজান, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় আগে কানাডায় চলে গিয়েছিলেন, জানান যে তিনি ভোট দেওয়ার জন্য ইসরায়েলে এসেছেন। কারণ, তার কাছে মনে হয়েছে এটিই “নেতানিয়াহুর আন্দোলনকে পরাজিত করার এবং দেশটিকে পুনরায় সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার শেষ সুযোগ।”
সূত্র : ফার্স্টপোস্ট/ঢাকা পোস্ট









