জাতীয়

ফরিদপুরে গণপিটুনিতে বাবাহারা মুসলিমার পাশে প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক৫ মে ২০২৬৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

এক হাতে দুধভরা ফিডার, অন্য হাতে দাদির শাড়ির আঁচল। ফিডারের মুখে ঠোঁট, কিন্তু চোখ বেয়ে টপটপ করে ঝরছে অশ্রু। দুধ আর কান্না যেন মিশে গেছে এক অব্যক্ত যন্ত্রণায়। এই দৃশ্য কোনো গল্প নয়, ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রামের ২ বছরের শিশু মুসলিমা ইসলামের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

মাত্র ২ বছর বয়সেই সে হয়ে গেছে পুরোপুরি এতিম। জন্মের ২১ দিন পর মা আরিফা বেগম তাকে ছেড়ে চলে যান। আর গত শুক্রবার রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বিলনালিয়া এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এক ভয়াবহ গুজবের জেরে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তার বাবা ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৩)।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে নাড়া দেয় দেশ :

এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি প্রথম বিশেষ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করে দৈনিক কালের কণ্ঠ।

পরে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ছোট্ট মুসলিমার কান্নার ছবি ও পরিবারের অসহায়ত্ব দ্রুতই পৌঁছে যায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

কী ঘটেছিল সেই রাতে :

গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় একটি ট্রাক দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে বলা হয় ট্রাকটি কয়েকজনকে ধাক্কা দিয়েছে, পরে সেই তথ্য বিকৃত হয়ে ‘অনেক মানুষ নিহত’ এমন গুজবে রূপ নেয়।

মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা রাস্তা অবরোধ করে ট্রাক থামায় এবং চালক হান্নান শেখকে নামিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে। ইট, লাঠি, লাথিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঘটনাস্থল নগরকান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা মামলা নিয়েছি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। আসামিদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আশা করি, খুব শিগগির জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’

নিহতের ঘটনার পরেরদিন শনিবার বিকেলে হান্নান শেখের লাশ গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। উঠানে কান্নার রোল, স্বজনদের আহাজারি, আর প্রতিবেশীদের ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছোট্ট মুসলিমা। সে বোঝে না মৃত্যু কী। কেন মানুষ কাঁদছে, কেন সবাই ভেঙে পড়েছে, তার কোনো ধারণা নেই। কখনো দাদির কোলে, কখনো অন্যের কোলে ঘুরছে সে। ফিডার মুখে দিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, আবার হঠাৎ কেঁদে ওঠে।

দাদি-দাদার বুকভাঙা আর্তি :

দাদি নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মা ২১ দিনেই চলে গেছে, এখন বাপও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি না থাকলে ও কোথায় যাবে?’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমার ছেলেকে গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।’

দাদা শাহিদ শেখ বলেন, ‘আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। সে যদি দোষী হতো, আইনের হাতে দিত। কিন্তু এভাবে পিটিয়ে মারা হলো কেন? এখন এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী?’

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ :

ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর তা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়। এর পরই স্থানীয় প্রশাসনে নির্দেশ আসে, এতিম শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর। আজ মঙ্গলবার সকালে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান মুসলিমার বাড়িতে গিয়ে তার খোঁজখবর নেন।

এ সময় তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা এসেছি। এই শিশুটি মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে। সরকার তার দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা চাই, সে যেন স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারে এবং ভবিষ্যতে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে।’ এ সময় শিশুটির জন্য খাদ্যসামগ্রী, শিশুখাদ্য, খেলনা ও নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি :

সংশ্লিষ্ট সাতৈর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাফিউল আলম মিন্টু বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে শিশুটির জন্য নিয়মিত সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে। আমরা তার পাশে থাকবো।’ এতিম মুসলিমা ইসলামের দাদা শাহিদ শেখ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের নাতনির জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন। এতে আমরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছি।’