সিল্কসিটিনিউজে ডেস্ক:

কোনো উৎসব বা বিশেষ দিন ছাড়া সারা বছর নাটক নির্মাণ খুবই সীমিত পরিসরে হচ্ছে। ব্যতিক্রম কিছু ইউটিউব চ্যানেল ও কিছু প্রডাকশন হাউস ছাড়া নতুন কনটেন্ট আসছে খুব কম। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও এখন আর উৎসব ছাড়া সেভাবে একক নাটক নির্মাণ করছেন না।
নাট্য পরিচালক ইমরাউল রাফাত বলেন, ‘এখন কাজের পরিমাণ কমে গেছে এটা সত্য। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এখন আর উৎসবের বাইরে সেভাবে ফিকশন নির্মাণ করছেন না। কিছু ধারাবাহিক চললেও একক নাটক হচ্ছে না। এ ছাড়া ইউটিউব এবং ফেসবুক রেভিনিউ কমিয়ে দেওয়ার পর প্রযোজকরাও এখন আর আগের মতো প্রডাকশন করার সাহস পাচ্ছেন না। যার কারণে কাজ কমে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই শিল্পী-নির্মাতারা সংকট অনুভব করছেন।’
আমাদের নাটক ইন্ডাস্ট্রি দিন দিন কি যে হয়ে যাচ্ছে, আর অনিয়মের কথা বললামই না। অনেক শিল্পীই কাজ করতে পারছেন না। এখন যারা কাজ করতেছে তাদের দিকে তাকালেই দেখা যাবে কারা কারা কাজ করছেন না। দেশের পটভূমি পরিবর্তন হওয়ার পর কাজের পরিমাণ এমনিতেও কমে গেছে, বিনিয়োগকারী কমে গেছে। এগুলো ঠিক হতে সময় লাগবে আরো অনেক।
অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদের ভাষ্যে, ‘আমাদের প্রযোজকরা যদি চ্যানেলনির্ভর হয়ে যান তাহলে এ রকম সমস্যা তো হবেই। যখন রেভিনিউ ভালো ছিল তখন তো উনারা কম কাজ করেননি, এর বিকল্প তৈরি করেননি কেন?’
বিনিয়োগ নেই, বাজেট নেই
নাটক নির্মাণে বরাবরই সবচেয়ে বড় সংকট বাজেট। ইউটিউবে আপলোডের জন্য নাটক বানালে স্পনসর মেলে না, আর টিভি চ্যানেলে প্রচারের বাজেট এত কম যে মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করা কঠিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রযোজক বলেন, ‘ঈদের পরের সময়টাতে সবসময়ই কাজ কম হয়। তাছাড়া এখন দেশের পরিস্থিতিতে অনেক টাকা লগ্নি করে সেই টাকা তুলে আনাও অনেক কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউব রেভিনিউ কমিয়ে দিয়েছে, তাছাড়া স্পন্সরশিপ জটিলতা ত আছেই। বিজ্ঞাপনদাতারা স্পন্সর কমিয়ে দিয়েছেন, দিলেও তার রেট অনেক অল্প। যার কারণে কাজের পরিমাণ অনেকটাই কমে গেছে।’
তার মতে, ফেসবুক, ইউটিউব থেকে সেভাবে আয় আসছে না। তারকাশিল্পী হলে সেগুলোতে যেসব বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়, অন্যদের ক্ষেত্রে তেমন হয় না। এমতাবস্থায় শিল্পীরাও তাদের পারিশ্রমিক কমাতে চান না, বেশি বাজেটের কাজ নাহলে আবার করতেও চাননা।
‘কাজ আছে’ কারা বলছেন?
যারা এখন নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন, তারা মূলত অল্পসংখ্যক পরিচিত মুখ। জনপ্রিয় শিল্পীদের ঘিরেই বেশি কাজ হয়, একই পরিচালকের টিম বারবার দেখা যায়। এটাই একটা বিভক্ত বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে—যেখানে কেউ বলছেন, “আমরা তো কাজ করছি”, আবার কেউ বলছেন, “আমরা তো বসে আছি”।
এর বাইরে অনেক উদীয়মান ও মধ্যম পর্যায়ের শিল্পীদেরই অভিযোগ, বছর জুড়ে হাতেগুনা কাজ পাচ্ছেন। যেগুলো দিয়ে জীবিকা চালানো প্রায় অসম্ভব।
এ বিষয়ে পরিচালক ইমরাউল রাফাত বলেন, ‘শিল্পীর কাজ না পাওয়ার দায় তো নির্মাতার না। একটা সময় ছিল যখন গল্পে বাবা-মায়ের চরিত্রগুলো ছিল না, কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কিন্তু এটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন ওই ধরণের চরিত্রগুলোতে যারা কাজ করেন তাদের অনেকেরই ডেট পাওয়া যায় না। তাহলে তারা কীভাবে কাজ করছেন? আর যারা পাচ্ছে না তারা হয়তো নিজেদের ওই ভ্যালুটা দর্শকের কাছে তৈরি করতে পারেননি। এটা তো তাদের ব্যর্থতা। দর্শকের কাছে তার চাহিদা থাকলে পরিচালক অবশ্যই তাকে বা তাদেরকে নিয়ে কাজ করবেন। যারা নিজেদের ভ্যালু তৈরি করতে পেরেছেন তারা ঠিকই কাজ করতে পারছে।’
নাটকের কাজ কমে যাওয়া এবং অনেক শিল্পীদের কর্মহীন হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে দেশের পরিস্থিতি একটা বড় কারণ বলে জানিয়েছেন তানজিম সাইয়ারা তটিনী। তিনি বললেন, ‘দেশের সিচুয়েশন একটা বড় কারণ। তাছাড়া নাটকের মানও কিছুটা পড়ে গেছে, এটা সত্য। এর কারণও অবশ্য আছে। দর্শকের পছন্দ, রুচি, অভ্যাস বদলাচ্ছে। এখন মানুষ রিলস, শর্টসে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মানুষের ধৈর্য কমে গেছে। তো, একটা ভালো কাজ যদি গ্রহণযোগ্যতা না পায়, তাহলে প্রযোজক কি লগ্নি করবেন? আর শিল্পীরাও বা ঝুঁকি নেবেন কেন?
আরেকটা দিক হলো, শোবিজটা এখন চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। নাটকের অনেকে ছবিতে যাচ্ছেন, অনেকে আবার যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। এসব কারণে নাটকের কাজ কমছে। তবে হ্যাঁ, ভালো কাজ এখনো হচ্ছে। আমরা সবসময়ই চেষ্টা করে যাচ্ছি, একটা মান ধরে রেখে কাজ করছি।’
অন্যদিকে শিল্পীদের পারিশ্রমিক কমানো বিষয়টিকে হাস্যকর বলে উল্লেখ করেছেন মৌসুমী হামিদ। তিনি বললেন, ‘এই বিষয়টা আমার কাছে একদম হাস্যকর মনে হয়। শিল্পীদের পারিশ্রমিক কারা বাড়ায়? প্রযোজকেরাই তো বাড়ায়। যখন তার চাহিদা থাকে তখন তারাই তো বেশি পারিশ্রমিক দিয়ে তাদের নিয়ে কাজ করেন। এখন কেন তারা এ কথা বলেন? তারা বিকল্প তো তৈরি করেননি, নতুন শিল্পীদের নিয়ে তো কাজ করেন না, প্রমোট করেন না।’
সিএমভির কর্ণধার, প্রযোজক সাহেদ আলী পাপ্পুর মতে, কোরবানি ঈদের পর সচরাচর সব সময়ই কাজ কম হয়। দেশের পরিস্থিতির কারণে কাজের পরিমাণ অনেকটা কমে গেছে, এরপর উৎসবের পরের সময়টাতে কাজ একটু কম হওয়ায় সার্বিকভাবে এ রকম মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু লোকসান হলেও চেষ্টা করে যাচ্ছি প্রডাকশন করার। এখন আয়ের পরিমাণ অনেকটাই কমে গেছে। আগে যেটাতে ১০০ টাকা থাকতো এখন সেটা ২০-এ চলে এসেছে। ওই জায়গা থেকে আমরা একটু হিমশিম খাচ্ছি, কিন্তু কাজটা তো চালিয়ে যাচ্ছি।’
অনেকের মতে, নাট্যাঙ্গনের এই টানাপড়েন দীর্ঘস্থায়ী হলে, হারিয়ে যেতে পারে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পমাধ্যম এমনকি অনেক শিল্পী-নির্মাতাও।









