মতামত

৭১’র এই দিনে: রাজশাহী পুলিশ একাডেমিতে বিদ্রোহ, নন্দনগাছীর গণযুদ্ধ

নিউজ ডেস্ক১৯ মার্চ ২০২৫৪ মিনিট পড়া

ওয়ালিউর রহমান বাবু

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে রাজশাহী জেলার চারঘাট থানার মীরগঞ্জ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস প্লাটুন হেড কোয়াটারে কর্মরত নায়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দীন লস্কর ২৬ মার্চ সকালে দেখেন স্বাধীনতাকামী জনতা নানা স্লোগান দিয়ে ইপিআর বাহিনীকে মুক্তিযুদ্ধে অংশনিতে আহবান জানাচ্ছে। বিদেশি বেতারে শুনেন স্বাধীনতা ঘোষনার কথা ও ঢাকার পরিস্থিতি। তিনি কোম্পানি কমাণ্ডার হাসান আলীর সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি বিরক্ত হন। তাকে উপেক্ষা করে নায়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দীন লস্কর রাতে লোক মারফত, চিলমারি, আলাইপুর বিওপির অবাঙালীদের নিরস্ত করতে নির্দেশ পাঠান।

২৮ মার্চ বিওপি থেকে অস্ত্র নিয়ে ১৯ মার্চ মিনগঞ্জ বিওপিতে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে চারঘাট বাজারে পাহারা বসান। ল্যান্স নায়েক মনোয়ার আলী সহ ৫ জন কে নিয়ে কোম্পানি কমাণ্ডারের সাথে কথা বলতে গিয়ে শুনেন তিনি ভারতীয় আক্রমণ রোধে ট্রেন্স খোড়ার জায়গা দেখতে গেছেন। এসময় নায়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দীন লস্কর অস্ত্র নিচে রেখে পিছনে ঘুরতে বলে অবাঙালীদের গ্রেফতার করে ফেলেন। তাদের কান্না শুনে কমাণ্ডার হাসান আলী দৌড়ে এসে তাকে অস্ত্র ত্যাগ করতে বললে তাকে সময় না দিয়ে তিনি তার ফোল্ড থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে গ্রেফতার করে চারঘাট থানায় পাঠান। সরদহ পুলিশ একাডেমিতে গেলে ডি আইজি আব্দুল খালেক সব জেনেও তাকে বাধা দেন কিন্তু নয়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দীন লস্কর এলার্ম বাজিয়ে দিলে নিয়ম অনুযায়ী সকলে ফলিন করে ঘঠনা জেনে অস্ত্র হাতে বিদ্রোহ ঘোষনা করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শপথ নেন।

ডির্পাটমেন্টাল স্টোর থেকে আনসার দের পোশাক সংগ্রহ করে নেয়া হয়। ডি আইজি আব্দুল খালেক পরিবার নিয়ে একাডেমি থেকে সরেযান। ভাইস প্রেন্সিপাল মি. বড়ুয়া, সি এল আই পঙ্কজ, সি এল আই২ গাজী আব্দুর রহমান একাডেমিতে কন্ট্রোলরুম করেন। ইউসুফপুর বি ওপির ইপিআর রা ঐক্য বদ্ধ হয়ে গেল সদ্য আইয়ুব ক্যাডেট কলেজে অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রশিদ অধ্যাপক এবি সিদ্দিক নায়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দীন লস্করের সাথে পুলিশ একাডেমি তে এসে ইপিআর, পুলিশ, আনসার, সেচ্ছাসেবক, ছাত্র জনতাকে নিয়ে প্রতিরোধ বাহিনী গঠন করে নাটোরের লালপুর অঞ্চল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা এক ছাত্র নেতা সঙ্গী সহ রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানা অঞ্চলে প্রেমতলী গ্রামের পাশে খরচাক্কার প্রতিরোধ স্থলে বিশেষ কাজে আসার সময় মটর সাইকেল চাকা লিক হয়ে গেলে সেটি এক বাড়িতে রেখে রাস্তায় হাটার সময় দেখেন রাজশাহী থেকে দুটি গাড়ি যাচ্ছে গাড়ি দুটি কে থামালে দেখেন সামনের গাড়িতে রাজশাহীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক রশীদুল আলম, রহিম নাজির ও একজোন অফিসার পেছনের গাড়ীতে ইপিআর বাহিনী।

তারা জেলা প্রশাসককে পৌছে দিতে অনুরোধ করলে তিনি রাজি হন। তিনি নানা কথা বলে পরিস্থিতির জন্য তাদের দায়ী করলে তারা কোন কথা না বলে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌছে জেলা প্রশাসককে আত্মসমর্পন করান ইপিআর বাহিনী গ্রাম বাসির সাথে সংপৃক্ত হয়ে গেল। সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসককে বন্দি করে চাপাইনবাবগঞ্জ মহকুমায় নিয়ে গিয়ে নওগা মহকুমা ইপিআর ৭ নম্বর উইংয়ের সহ অধিনায়ক ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দীন আহম্মেদ কে তা জানানো হয়। কিন্তু কৌশলে মুক্ত হয়ে রাজশাহী জেলা সদরে ফিরে আসেন।

পাবনা থেকে পালিয়ে আসা পাকিস্তানি সৈন্যরা নাটোর সহ বিভিন্ন জায়গায় বাধাগ্রস্ত হয়ে ধরাসায়ী হতে থাকে। আড়ানী ব্রিজে তাদের কয়েকজন নিহত হয়। ৩০ মার্চ রাজশাহী জেলার চারঘাট থানার নন্দনগাছী ও আশেপাশের গ্রাম উত্তাল হয়ে উঠে। নন্দনগাছী গ্রামের গণযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরাসায়ী হয়ে নিহত হয়। গণ উত্তালে তাদের রক্ষা করা যায় নি এ সময় প্রতিরোধ যোদ্ধা গ্রাম বাসি শহিদ ও আহত হন ৩১ মার্চ ক্যাপ্টেন রশিদ, অধ্যাপক এবি সিদ্দিক, নায়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দীন লস্কর তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে চারঘাট অঞ্চল থেকে রাজশাহী জেলা সদরে অ্যাডভান্স করেন। নায়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দীন লস্কর তার বাহিনী নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে প্রশাসন ভবনের ছাদে ওপি বসালে উপাচার্য সাজ্জাদ হোসেন রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে খবর দিয়ে দেন।

এ খবর তার বাড়ির কাজের ছেলের কাছে শুনে নায়েক সুবেদার সিরাজউদ্দীন লস্কর তার বাহিনী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বে জেবের মিয়ার ইট ভাটায় গিয়ে অবস্থান নেন। অন্য দুই বাহিনী ও সেখানে চলে যায় অভিযোগ রাজশাহী জেলা প্রশাসক তার বাড়িতে থাকা রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার শাহ আব্দুল মজিদের কথা পাকিস্তানি সৈন্যদের জানিয়ে দিলে তারা আলোচনার নামে পরিবারের সামনে থেকে রুমাল দিয়ে চোখ বেধে নিয়ে গেলে তিনি আর ফেরেননি। তথ্য সূত্রঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার মেজর সিরাজ উদ্দীন লস্কর, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহাতাব উদ্দীন।

লেখক, তথ্য সংগ্রাহক, সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজশাহী
০১৯১১৮৯৪২৬০