অর্থ ও বাণিজ্য

সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নে সুদবিহীন আমানত

নিউজ ডেস্ক১৮ ডিসেম্বর ২০১৯৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

শিল্পঋণে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে বিপুল অঙ্কের এ আমানত খাটালে কোনো সুদ গুনতে হবে না। বর্তমানে সরকারি আমানত রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে সুদবিহীন ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার আমানত পাবেন বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকরা। যদিও এর আগে বহু সুবিধা নিয়েছেন তারা; কিন্তু সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন করেননি।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের আভাস, এবার সিঙ্গেল ডিজিট কার্যকর না করলে কঠোর হবে সরকার। নতুন নিয়মে ঋণের সুদ ৯ শতাংশ কার্যকর হবে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। সব মিলিয়ে সিঙ্গেল ডিজিট কার্যকরে চলতি সপ্তাহেই প্রজ্ঞাপন জারি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির একাধিক সদস্য মঙ্গলবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, সুদহার কমানোর সুপারিশ চূড়ান্ত করে যথাযোগ্য জায়গায় জমা দেয়া হয়েছে।

সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা বাধ্যতামূলক এবং তা হবে শূন্য শতাংশ সুদে। সেটি এখন সার্কুলার আকারে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে দ্রুতই আসছে বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মঙ্গলবার বলেন, বৃহস্পতিবারের মধ্যেই প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হবে। এমনকি বুধবারও (আজ) হতে পারে। এখন প্রস্তুতি চলছে। এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। প্রসঙ্গত, এ সার্কুলার জারি হলে এটিই হবে সুদ কমানো সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম সার্কুলার।

জানা গেছে, উল্লিখিত সুযোগ-সুবিধাসহ বেশকিছু সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে এ সংক্রান্ত গঠিত কমিটি।

কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা ছিল ১০ ডিসেম্বর; কিন্তু ভাষাগত কিছু জটিলতার কারণে প্রতিবেদনটি জমা দেয়ার সময় দুইদিন পেছানো হয়। ফলে সুদহার কমানোর সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদনটি ১২ ডিসেম্বর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তিনি।

এর আগে ১ ডিসেম্বর রাতে ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই দিন দুপুরে এ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। কমিটিকে কীভাবে ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে একটি সুপারিশ উপস্থাপনের নির্দেশনা দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘নয়ছয় ফর্মুলা’ ভুলে যান। এখন থেকে ব্যাংকিং খাতে আমানতে ৬ ও ঋণে ৯ শতাংশ সুদহারের ফর্মুলা থাকবে না। নতুন পদ্ধতিতে সুদের হার কমানো হবে। তবে এখানে ব্যবসা করতে হলে শিল্পঋণে সুদের হার ৯ শতাংশের বেশি এক পয়সাও নেয়া যাবে না।

ব্যাংক সূত্র জানায়, শুধু শিল্পঋণে ৯ শতাংশ সুদ কার্যকরের বিষয়ে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে চলতি মূলধন ঋণ, প্রজেক্ট লোনসহ শিল্প খাতের বড় ঋণগুলো থাকবে। তবে ভোক্তা ঋণ এর আওতায় পড়বে না।

জানা গেছে, ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে বা সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এখনও মানছেন না বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকরা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ৭ বার এবং বর্তমান ও সাবেক অর্থমন্ত্রী ১১ বার নির্দেশনা দিয়েছেন।

সূত্রমতে, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত দেড় বছরে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক দফায় দফায় ৯টি সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু সরকারি ব্যাংক এবং কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ছাড়া বাকিগুলো ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামায়নি। সুদহার এক অঙ্কে না এলেও ৯টি সুবিধার চারটিতেই ব্যাংকগুলো প্রায় ২৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছে।

ব্যাংকগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে নগদ জমা সংরক্ষণ হার (সিআরআর) কমিয়ে দ্বিসাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে ৫.৫ শতাংশ এবং দৈনিক ভিত্তিতে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসাবে ব্যাংকগুলো এক্ষেত্রে ১১ হাজার ১১২ কোটি টাকার সুবিধা পেয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যাংকের কর্পোরেট করহার ৪২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এতে ব্যাংকগুলো ২.৫ শতাংশ ট্যাক্স সুবিধা পায়। ফলে ১৩ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকার সুবিধা পেয়েছেন ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকরা।

ব্যাংক সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি খাতে প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে রক্ষিতব্য সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণের হার ২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে এতে ব্যাংকগুলো ৫৩৪ কোটি টাকা সুবিধা ভোগ করেছে।

একইভাবে গৃহায়ন খাতে রক্ষিতব্য সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণ হারেও সুবিধা দেয়া হয়। গৃহায়ন খাতে সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণের হার ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ২৫৫ কোটি টাকা সুবিধা পায়।

সব মিলিয়ে শুধু এ সুবিধাগুলো থেকে ব্যাংকগুলোর লাভ হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় সরকারি তহবিল জমার হার বৃদ্ধি, পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত থাকার মেয়াদ ও একক পরিবারের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১০ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল এবং ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালা শিথিলকরণ সুবিধা দেয়া হয়েছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দেড় বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি এক অঙ্কের সুদহার। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একপ্রকার বাধ্য হয়েই সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। সে কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রজ্ঞাপন জারি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।