সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ দূর-দূরান্তে সফর করে। সফরের সময়টি মানুষের জন্য স্পর্শকাতর। পরিবার-পরিজন, চেনাজানা পরিবেশ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে দূরে থাকার কারণে একদিকে মানুষ অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, অন্যদিকে অনেক সময় নিজের আচার-আচরণে ভারসাম্য হারায়। তাই ইসলাম সফর বা দূরযাত্রায় সংযত ও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করার নির্দেশ দেয়।
নিম্নে সহযাত্রী হিসেবে মুমিনের ১০টি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হলো।

সফরে সদাচার কেন প্রয়োজন
সফরের সময় প্রতিটি মানুষ অন্যের কাছ থেকে সহনশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশা করে। কেননা এই সময় সে নানা ধরনের ক্লান্তি ও বিষাদে ভোগে। মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিসে সফরের মনস্তাত্ত্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে।
তিনি বলেছেন, ‘সফর আজাবের একটি টুকরা, যা তোমাদের সফরকারীকে নিদ্রা ও আহার থেকে বিরত রাখে। তাই তোমাদের কারো প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে সে যেন শীঘ্র তার পরিবারের কাছে ফিরে আসে।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৪২৯)
সহযাত্রী হিসেবে মুমিনের বৈশিষ্ট্য
সফরসঙ্গী বা সহযাত্রী হিসেবে মুমিনের ভেতর যেসব গুণ থাকা আবশ্যক তার কয়েকটি হলো—
১. তাকওয়া অবলম্বন : সহযাত্রী হিসেবে মুমিন তাকওয়া বা আল্লাহভীতির অধিকারী হবে। কেননা নবীজি (সা.) সফরসঙ্গী হিসেবে মুত্তাকিদের বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘তুমি মুমিন ছাড়া কারো সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাবার যেন মুত্তাকি ব্যক্তিরা খায়।’
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩২)
২. সহনশীল হওয়া : সফরের সময় মুমিন তাঁর সহযাত্রীর প্রতি সহনশীল হবে। কারো কাছ থেকে কষ্ট পেলে ধৈর্য ধারণ করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কোরো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৪৬)
৩. ঝগড়া-বিবাদ পরিহার : মুমিন সফরের সময় সঙ্গীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করবে না।
কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে।’
(সুরা : আনফাল, আয়াত : ৪৬)
৪. সহযোগী হওয়া : সফরের সময় মুমিনরা পরস্পরকে সহযোগিতা করবে, তবে তারা অন্যায় কাজে সহযোগিতা করবে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করবে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
৫. পরিত্যাগ না করা : সফরের সময় কারো সঙ্গে কোনো কারণে মনোমালিন্য হলেও মুমিন তাঁর সহযাত্রী ভাইকে পরিত্যাগ করে না, বরং সে সহযোগিতা অব্যাহত রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার প্রতি জুলুম করে না এবং তাকে (জুলুম ও বিপদের মধ্যে) ছেড়ে দেয় না।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২৮০)
৬. চলাফেরায় নম্র হওয়া : মুমিন মুসাফিরের বৈশিষ্ট্য হলো সে তার চলাফেরা ও আচরণে বিনম্র হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৬৩)
৭. হাসিমুখে থাকা : ইসলামের শিক্ষা হলো সহযাত্রী পুরোপুরি মনঃপূত না হলেও তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তোমার ভাইয়ের সামনে উপস্থিত হওয়া তোমার জন্য সদকাস্বরূপ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫৬)
৮. নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা করা : সফরের সময় নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা করা আবশ্যক। কেননা বিশৃঙ্খল আচরণ সবাইকে কষ্টের ভেতর ফেলে দেয়। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তিনজন সফরে বের হয়, তখন তাদের একজনকে যেন তারা আমির নিযুক্ত করে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৬০৮)
৯. ভারসাম্য রক্ষা করা : সফরের সময় সহযাত্রীদের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে কারো সঙ্গে অতি বন্ধুত্ব বা অতি দূরত্ব যেন তৈরি না হয় সে দিকে লক্ষ রাখা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘নিজের বন্ধুর সঙ্গে ভালোবাসার আধিক্য প্রদর্শন করবে না। হয়তো সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। তোমার শত্রুর সঙ্গেও শত্রুতার চরম সীমা প্রদর্শন করবে না। হয়তো সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে।’
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৯৭)
১০. অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া : মুমিন বান্দা সফরের সময় অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেবে। এতে সফরে কলহ-বিবাদ হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)
সফরের কিছু করণীয়
সফররত ব্যক্তি সফরের মাসনুন দোয়াগুলো পাঠ করবে এবং সঙ্গীদেরও মাসনুন দোয়াগুলো পাঠ করতে উদ্বুদ্ব করবে। কেননা মাসনুন দোয়াগুলোর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর দয়া ও নিরাপত্তা লাভ করে। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সফরের সময় দোয়া কবুল হয়। তাই মুমিনের উচিত সফরের সময় বেশি দোয়া করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া সন্দেহাতীতভাবে কবুল হয় : ক. (সন্তানের জন্য) পিতার দোয়া, খ. মুসাফিরের দোয়া ও মজলুম ব্যক্তির দোয়া।’
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৬)
সফরের সময় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দলচ্যুত হয়ে বা একাকী চলাচল না করা। কেননা নবীজি (সা.) একাকী চলাফেরা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি লোকেরা একা সফরে কী ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোনো আরোহী রাতে একাকী সফর করত না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৯৯৮)
আল্লাহ সবাইকে উত্তম সফরসঙ্গী হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।









