সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
প্রায় আট বছর আগে তৎকালীন সরকার কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেয়। তবে সেই স্বীকৃতিদানের পর আরো প্রায় ছয় বছর ক্ষমতায় থাকলেও এই স্বীকৃতি কার্যত বাস্তবায়ন হয়নি। কাগজে-কলমে স্বীকৃতি দিলেও এর প্রতিফলন ঘটেনি কোথাও। ফলে ‘সরকারিভাবে স্বীকৃত’ এমন একটি আত্মতৃপ্তি ছাড়া কওমিপড়ুয়াদের তেমন কোনো অর্জন নেই সেই স্বীকৃতি ঘোষণায়।
এর আগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়েও এ ধরনের একটি স্বীকৃতি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে সেটাও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলই কাগজে-কলমে কওমি মাদরাসা শিক্ষিতদের স্বীকৃতি দিয়েছে; যদিও কেউই সেই স্বীকৃতি বাস্তবায়ন করেনি।
স্বীকৃতি ঘোষণার এত বছর পর এসে সেটা বাস্তবায়নের জোর দাবি উঠছে কওমি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে।

গত কয়েক বছর ধরে যাঁরা কওমি মাদরাসা থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করছেন তারা খুব করে চাচ্ছেন যাতে রাষ্ট্র তাঁদের সনদের স্বীকৃতি কার্যকর করে। এর মাধ্যমে যেন তাঁরাও রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের প্রাপ্য অধিকারটুকু বুঝে নিতে পারেন। কিন্তু নানা কারণে সেই স্বীকৃতি আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কেউ স্বীকৃতি বাস্তবায়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা করলেও এর কোনো প্রতিফলন আমরা দেখিনি।
এবারের নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে সেখানে স্পষ্ট করে কওমি সনদের স্বীকৃতি পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার তাদের এক মাসের মধ্যেই প্রতিশ্রুতির অনেক কিছু বাস্তবায়নের সূচনা করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সরকারের পক্ষ থেকে যেমন কওমি সনদ বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগের কথা শোনা যায়নি, তেমনি কওমি কর্তৃপক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে কোনো দাবি তোলা হয়নি। এতে কওমিপড়ুয়াদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে।
কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নের বিষয়টি অনেকটা কওমি কর্তৃপক্ষের কারণেই আটকে আছে। যাঁরা কওমি মাদরাসার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরাই মূলত এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেননি। ২০১৮ সালে যখন সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তখন কওমি মুরব্বিদের দাবি ছিল, কোনো ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবেন না। তৎকালীন সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে এই দাবি মেনেই স্বীকৃতি দেয়। যেহেতু স্বীকৃতি কার্যকর করতে হলে সরকারি হস্তক্ষেপের একটা প্রশ্ন আসে, এ জন্য শুরু থেকেই কওমি কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে তেমন কোনো তৎপরতা দেখায়নি। আনুষ্ঠানিক একটি স্বীকৃতি ঘোষণা হয়েছে, এতেই তারা তৃপ্ত—এমনটা আঁচ করা গেছে বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে কথা বলে। যেহেতু যাঁরা কওমি মাদরাসাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁদের নিজেদের স্বীকৃতির তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। সুতরাং তাঁদের মধ্যে এই স্বীকৃতি বাস্তবায়নের গরজও কম লক্ষ করা গেছে। কিন্তু যাদের জন্য এই স্বীকৃতি, সেই ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস লক্ষ করা গেছে এই স্বীকৃতি নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে যখন এই স্বীকৃতি ঘোষণার পরও শিক্ষার্থীরা কোথাও কোনো সুবিধা পাননি তখন পুরোই হতাশ হয়েছেন। এই হতাশা ও ক্ষোভের বিষয়টি আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেতেও দেখেছি।
শিক্ষার্থীদের দাবি ও চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আল-হাইয়্যাতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের পক্ষ থেকে একটি চিঠি নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল শিক্ষাসহ কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল। প্রতিনিধিদল দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃত সনদের কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশসেবা ও উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টার সহযোগিতা কামনা করে। তারা সরকারের সব মন্ত্রণালয়সহ সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সনদের মান কার্যকর করার জন্য প্রজ্ঞাপন জারিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানায়।
এ ছাড়া প্রতিনিধিদল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইসলামী গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে নিয়োগ, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মসজিদের ইমাম ও খতিব পদে নিয়োগসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানে কওমি মাদরাসার সনদধারীদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে যৌক্তিকতা তুলে ধরে। তবে সেই চিঠি পাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার আরো প্রায় আট মাস ক্ষমতায় ছিল। সেই সরকার কিংবা আল-হাইয়্যা কর্তৃপক্ষ কারো পক্ষ থেকে কওমি সনদের স্বীকৃতি প্রসঙ্গে কোনো আপডেট আমরা জানতে পারিনি। শুধু সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিবাহের কাজি নিয়োগে কওমি সনদধারীরাও আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি সেক্টরে কওমি সনদধারীদের নিয়োগের ব্যাপারে আন্তরিক ভূমিকা পালন করেন। এর বাইরে সরকারের কোনো উদ্যোগের কথা জানা যায়নি।
কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নে কিছু জটিলতা শুরু থেকেই চলে আসছে। সরকার শুধু দাওরায়ে হাদিসকে স্বীকৃতি দিয়েছে, নিচের স্তরগুলোকে স্বীকৃতি দেয়নি। সরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করলে শুধু মাস্টার্সের সার্টিফিকেট দিলেই হয় না, নিচের স্তরগুলোর সার্টিফিকেটও প্রদান করতে হয়। যেহেতু কওমিপড়ুয়াদের নিচের স্তরের কোনো সার্টিফিকেট নেই, এ জন্য তাঁরা কোথাও আবেদন করতে পারেন না। সরকারি স্বীকৃতি কার্যকর করতে চাইলে এই সমস্যার সমাধান সবার আগে করতে হবে। কিন্তু কওমি কর্তৃপক্ষ নিচের স্তরের স্বীকৃতির ব্যাপারে সম্মত হতে পারেনি। অনেকেই মনে করেন, এভাবে স্বীকৃতি কার্যকর করলে কওমি মাদরাসার পরিণতি আলিয়া মাদরাসার মতো হবে। কওমিপড়ুয়ারা শেষ পর্যন্ত এখানে থাকবে না।
সরকারি স্বীকৃতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলে কওমি মাদরাসা যে আলিয়া মাদরাসার মতো পরিণতি হতে পারে সেই শঙ্কা শুরু থেকেই করা হচ্ছে। মুরব্বিদের অনেকেই এ জন্য কওমি সনদের স্বীকৃতির পক্ষেই ছিলেন না। এ কারণেই মুরব্বিদের একটি বড় অংশ এখনো মনে করে, শুধু দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি পর্যন্তই ঠিক আছে, স্কুল-কলেজ ও আলিয়ার সঙ্গে মিল রেখে সব স্তরে স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। কেননা এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে কওমি শিক্ষার কারিকুলামে হাত দিতে হবে। এখানে অনেক কিছু রদবদল করা লাগবে। দারুল উলুম দেওবন্দের যে উসুলে হাশতেগানা বা অষ্টমূলনীতি আছে সেটা থেকে বিচ্যুত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে কওমি মাদরাসা তার স্বকীয়তা ও আদর্শ হারাবে।
মুরব্বিদের এই শঙ্কা যে অমূলক সেটা বলা যাবে না। আলিয়া মাদরাসার করুণ পরিণতির বিষয়টি আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। তবে এটাও সত্য, অন্ধ হলেই কিন্তু প্রলয় বন্ধ থাকে না। দুনিয়ার সব কিছু যখন আমূল পাল্টে যাচ্ছে তখন আপনি চাইলেই জোর করে শত বছর আগের অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন না। সেখান থেকে আপনাকে কিছুটা হলেও ছাড় দিতে হবে। কওমি মাদরাসায় পড়ুয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যেক একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া সমীচীন হবে না। কিভাবে স্বকীয়তা ও আদর্শের ওপর টিকে থেকেও সনদের স্বীকৃতি কার্যকর করা যায় সেটা নিয়ে জোরালোভাবে ভাবতে হবে।
কওমি সনদকে রাতারাতি স্কুল-কলেজ বা আলিয়া মাদরাসার সনদের সমতুল্য করা যাবে না। আর এটা করা উচিতও হবে না। তবে এই সনদ দিয়ে নিজেদের গণ্ডির ভেতরে থেকে, আদর্শ ও স্বকীয়তা বিসর্জন না দিয়ে কোথায় কোথায় কিভাবে সুবিধা নেওয়া যায় সেটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। দাওরায়ে হাদিসের সনদের স্বীকৃতি যখন দেওয়া হয় তখন কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেওয়া হয়নি। শুধু ইসলামিক স্টাডিজ ও অ্যারাবিকে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ ও অ্যারাবিকে পড়াশোনা করে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, কওমি শিক্ষার্থীরাও সেটা পাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সেই দুই বিষয়ের সুবিধাও কওমিপড়ুয়ারা পাচ্ছেন না। এই জটিলতা কিভাবে কাটানো যায় সেটা সরকারের সঙ্গে কওমি কর্তৃপক্ষ আলোচনা করতে পারে। এই সনদ দিয়ে প্রাসঙ্গিক আর কোন কোন জায়গায় কওমি শিক্ষার্থীরা চান্স পেতে পারেন সেটা নিরূপণ করা যেতে পারে। যেমন—সরকারি মসজিদের ইমাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন পদ, বিয়ের কাজি, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর ধর্মীয় শিক্ষক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক—এসব পদে কওমিপড়ুয়ারা উপযুক্ত হতে পারেন।
এ ছাড়া এই সনদ যেন দেশে-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রহণযোগ্য হয় সেটাও নিশ্চিত করা যেতে পারে। পুরোপুরি না হোক, অন্তত নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে কোনো না কোনো জায়গায় কওমিপড়ুয়ারা তাদের ন্যায্য অধিকারটুকু হাসিল করতে পারে এটা নিয়ে বেফাক-হাইয়্যাসহ বিভিন্ন বোর্ডের কর্তৃপক্ষকেই ভাবতে হবে। সুযোগ থাকার পরও এ ব্যাপারে না ভাবলে অবশ্যই আগামী প্রজন্ম সংশ্লিষ্টদের ক্ষমা করবে না।
লেখক : আলেম সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদক









