মতামত

লো-প্রোটিন ডায়েট: কিডনি রোগীদের জন্য আশীর্বাদ না বিপদ?

নিউজ ডেস্ক৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য সমস্যা হল কিডনি রোগ বা ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD)| বাংলাদেশেও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই শেষপর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই খাদ্যনিয়ন্ত্রণে থাকলে জটিলতা এড়াতে পারতেন। কিডনি রোগীদের খাদ্যাভ্যাসে প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এবং এখানেই উঠে আসে ‘লো-প্রোটিন ডায়েট’ বা কম প্রোটিনভিত্তিক খাদ্যতালিকার বিষয়টি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ডায়েট আশীর্বাদ না বিপদ?

আমাদের শরীরের গঠনের অন্যতম উপাদান হলো প্রোটিন। তবে যখন কিডনি যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না, তখন অতিরিক্ত প্রোটিন ভেঙে যে বর্জ্য (যেমন ইউরিয়া) তৈরি হয়, তা শরীর থেকে সহজে বেরিয়ে যেতে পারে না। ফলে রক্তে টক্সিন জমে নানা জটিলতা তৈরি হয়।

(Asia Pacific Journal of Medical Innovations; Hasan et al. 2024) গবেষণায় দেখা গেছে, Stage 3-4 CKD রোগীদের জন্য নিয়ন্ত্রিত প্রোটিন ডায়েট কিডনি ফাংশন রক্ষা করে এবং eGFR হ্রাসের হার কমায়। কিন্তু এ ধরনের ডায়েট কেবলমাত্র পুষ্টিবিদের তত্ত্বাবধানে হতে হবে, না হলে অপুষ্টি, পেশিশক্তি হ্রাস বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

লো-প্রোটিন ডায়েট মূলত দৈনিক ০.৬ থেকে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রতি কেজি ওজন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এ হার থাকে ১ গ্রাম বা তার কিছু বেশি। CKD রোগীর ক্ষেত্রে এই পরিমাণ কমিয়ে আনা হয় যাতে বর্জ্য পদার্থ কম তৈরি হয় এবং কিডনির ওপর চাপ কমে।

তবে এটি একপেশে নয়। রোগীর স্বাস্থ্য, বয়স, অন্যান্য জটিলতা, ওজন এবং কার্যরত কিডনির মাত্রা দেখে পরিকল্পনা করতে হয়। শুধুমাত্র প্রোটিন কমালেই চলবে না, একইসাথে পর্যাপ্ত ক্যালোরি নিশ্চিত করতে হবে যেন শরীর শক্তি হারিয়ে না ফেলে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা নিয়মিতভাবে পরিমিত প্রোটিন গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে ডায়ালাইসিস শুরু হওয়ার সময়কাল কিছুটা পিছিয়ে যায়। এছাড়া ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন বৃদ্ধির হারও তুলনামূলকভাবে ধীর হয়।

তবে বিপদ তখনই, যখন রোগী নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে হঠাৎ প্রোটিন পুরোপুরি বন্ধ করে দেন বা না বুঝে শুধু উদ্ভিজ্জ প্রোটিন গ্রহণ শুরু করেন। এতে শরীরের নেগেটিভ নাইট্রোজেন ব্যালান্স তৈরি হতে পারে, যা দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া এবং রোগ প্রতিরোধ হ্রাসের দিকে নিয়ে যায়।

তাই লো-প্রোটিন ডায়েট হতে পারে একদিকে যেমন কিডনি রোগীদের জন্য আশীর্বাদ, ঠিক তেমনই ভুলভাবে প্রয়োগ করলে তা বিপদও ডেকে আনতে পারে। এর জন্য চাই একটি সুপরিকল্পিত খাদ্যব্যবস্থা যেখানে পুষ্টিবিদ, নেফ্রোলজিস্ট ও রোগী একসাথে কাজ করবেন।

সাধারণভাবে, Stage 1-2 রোগীদের খুব বেশি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ দরকার না হলেও Stage 3-4 এবং প্রি-ডায়ালাইসিস রোগীদের ক্ষেত্রে এই ডায়েট অনেক সময় লাইফসেভিং সিদ্ধান্তে রূপ নেয়। আমার গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা বলে, যে রোগীরা শুরু থেকেই পরিমিত প্রোটিন নিয়ন্ত্রণে আসেন, তাদের Dialysis এর প্রয়োজন অনেকটা বিলম্বিত হয়।
উপসংহারে বলা যায়, লো-প্রোটিন ডায়েট কিডনি রোগীদের জন্য একটি কার্যকর চিকিৎসা সহায়ক পদ্ধতি, তবে তা হতে হবে নির্ভরযোগ্য পরামর্শ ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশনার আলোকে। অন্ধভাবে অনুকরণ নয়, বরং ব্যক্তিভিত্তিক পরিকল্পনাই হোক কিডনি সুস্থ রাখার পথ।

 

 

হাসিবুল হাসান
এম.এসসি (ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগ), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
ইন্টার্ন ডায়েটিশিয়ান, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট, ঢাকা।
ই-মেইল: hasib0642@scholarsjp.org