অর্থ ও বাণিজ্য

রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি বেসরকারিকরণে তোড়জোড়

নিউজ ডেস্ক৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

তরল জ্বালানির রিফাইনারি দেওয়ার বেসরকারিকরণে তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও সরকারের জ্বালানি বিভাগ। দেশে গ্যাস ও তরল জ্বালানিতে নানামুখী সংকটের মধ্যেই দ্রুততার সঙ্গে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

জানা যায়, দেশের একটি বড় শিল্পগ্রুপকে বেসরকারিতে জ্বালানি তেল পরিশোধন আমদানি ও বিপণনের সুযোগ করে দিতে ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি জ্বালানি নীতিমালা-২০২৩ করেছিল। এতে দেশের বিশিষ্টজনের দ্বিমত থাকলেও শেষমেষ ওই শিল্পগ্রুপকে বেসরকারিতে সুযোগ দিতে পারেনি।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরপরই পরের ২৫ সেপ্টেম্বর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক প্রক্রিয়াকরণ, মজুত ও বিপণনের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে আবেদন করে চট্টগ্রামভিত্তিক টিকে গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড (এসপিএল), বর্তমানে এসপি পিএলসি।
আবেদনে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টন পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করলেও বিনিয়োগের আর্থিক কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ওই আবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরের ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি বিভাগ বিষয়টিতে মতামত চেয়ে বিপিসিকে চিঠি দেয়। এ নিয়ে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. জাহিদ হোসাইনকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করে বিপিসি।

২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল প্রতিবেদন জমা দেয় ওই কমিটি। প্রতিবেদনটিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পে আর্থিক বিনিয়োগের কোনো তথ্য দেওয়া ছিল না।
এরপর অতিগোপনে গত বছরের ২০ এপ্রিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেডকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করে জ্বালানি বিভাগের সচিবকে চিঠি দেন বিপিসির সদ্য ওএসডি হওয়া চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সময়ে বার্ষিক ১৫ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতার একটি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠায় ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়বে।

এ পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির প্রায় সবই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে।
সূত্র জানায়, ৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় জুম প্ল্যাটফর্মে বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভার জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি ডি নথিতে একটি নোটিশ দেন বিপিসি সচিব শাহিনা সুলতানা। বোর্ডসভার ৩ নম্বর আলোচ্যসূচিতে ছিল ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড (এসপিএল) কর্তৃক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি প্রদান প্রসঙ্গে।’ কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারির সেই মিটিং একদিন এগিয়ে এনে ৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় আয়োজন করা হলে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিপিসি ও অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোতে অসন্তোষ তৈরি হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসি ও অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ইআরএলের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ইআরএল-২ প্রকল্পটি এখনো শুরুই হয়নি।

এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নতুন রিফাইনারির অনুমতি দিয়ে ইআরএল-২ প্রকল্প আবার ঝুলে যাবে। কারণ বেসরকারি শিল্পগ্রুপগুলো প্রভাবশালী। তারা রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে ইআরএল-২ প্রকল্পটি বিলম্বিত করবে। বিগত সময়ে দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রে ইআরএল-২ প্রকল্পটি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। যেটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার শেষ সময়ে কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই পিপিপিতে সমালোচিত শিল্পগ্রুপ এস আলমকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’
একদিন এগিয়ে এনে মিটিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে একটি গণমাধ্যমকে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘আমি আদিষ্ট হয়ে নোটিশ করেছি। আগামীকাল (৯ ফেব্রুয়ারি) মিটিংটি হওয়ার কথা ছিল। আমি নির্বাচনের দায়িত্বে বাইরে আছি। মিটিংটি আগামীকালের (৯ ফেব্রুয়ারি) পরিবর্তে আজ (রবিবার) হয়েছে।’

৮ ফেব্রুয়ারি পর্ষদের জুম সভায় বিপিসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মণি লাল দাশ উপস্থাপিত ১০১৭তম বোর্ডসভার কার্যপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় প্রাথমিক অনুমতি প্রদানের বিষয়টি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক বিবেচনা করা যেতে পারে’ বলে সুপারিশ করা হয়।

কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ন্যাফতা ও কনডেনসেট প্ল্যান্টের প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা বার্ষিক সাড়ে ছয় লাখ টন। (যা বর্তমানে চালু আছে)। ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণের লক্ষ্যে স্থাপন হতে যাওয়া প্ল্যান্টের বার্ষিক প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা প্রায় সোয়া ১৯ লাখ টন। বেসরকারি নীতিমালার আওতায় বেসরকারি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান দেশে নিজস্ব কিংবা যৌথ মালিকানায় বার্ষিক ন্যূনতম ১৫ লাখ টন ক্ষমতাসম্পন্ন অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন/প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতাসম্পন্ন রিফাইনারি স্থাপন করতে পারে; নীতিমালার শর্ত অনুযায়ী এসপিএলের নিজস্ব জেটি সুবিধা রয়েছে। নদীর ড্রাফট বিবেচনায় বর্তমানে জেটিতে ১০০০-১২০০ টনের ধারণক্ষমতার জাহাজ থেকে তেল বোঝাই ও খালাস করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত প্রসেসিং ক্ষমতা অনুযায়ী রিফাইনারি স্থাপিত হলে বিদ্যমান জেটি সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন হবে। প্রতিষ্ঠান আর্থিক সক্ষমতার স্বপক্ষে ব্যাংক থেকে সচ্ছলতার সনদ দাখিল করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আবেদনের সময় বিপিসির অনুকূলে এক কোটি টাকার পে-অর্ডার দিয়েছে।

তবে বিপিসির কাছে দেওয়া প্রকল্পের ইয়েল্ড প্যাটার্ন অনুযায়ী বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা দেখানো হয়েছে ২২ লাখ টন। ওই কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রস্তাবিত প্ল্যান্টে বার্ষিক ২২ লাখ টন ক্রুড অয়েল/কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হলে সেক্ষেত্রে প্রধানত বছরে প্রায় ৯ লাখ ২৩ হাজার ৬৭০ টন ডিজেল, ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৮২০ টন ফার্নেস অয়েল, ৪ লাখ ৫ হাজার ৮২২ টন অকটেন, ১ লাখ ৯ হাজার ৭১০ টন বিটুমিনসহ অন্য পণ্য উৎপাদন হবে। প্ল্যান্টটিতে বিটুমিন, এমটিটি, সলভেন্ট ও স্বল্পমাত্রা বিভিন্ন পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য উৎপাদিত হবে। কার্যপত্রের একটি অংশে বলা হয়- ‘নীতিমালা অনুযায়ী এসপিএল যে পরিমাণ (নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রথম ৩ বছর ৪০ শতাংশ ও পরবর্তী দুই বছর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ) ডিজেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণন করবে, ওই পরিমাণ ডিজেলের চাহিদা ক্রমান্বয়ে কয়েক বছরের মধ্যে সমন্বয় হবে।’

কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়, এসপিএল বিপণনে যুক্ত হলেও তেল বিপণন কোম্পানির ডিলাররা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এ মুহূর্তে এসপিএলের বিপণন নেটওয়ার্কের বিষয়ে কমিটির কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকায় বিপণন কোম্পানি ডিলাররা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেল বিপণনে বিপিসিকে প্রতি লিটারে এক টাকা হারে সার্ভিস চার্জ দেবে।

এরই মধ্যে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল তাদের বর্তমান প্ল্যান্টের ন্যাফতা নিয়ে এবং উৎপাদিত তরল পণ্য বিপিসিকে সরবরাহ করার জন্য কর্ণফুলী নদীর তলদেশে পাইপলাইন নির্মাণ করেছে। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই পাইপলাইনের আবেদন করা হয়। নসরুল হামিদের সুপারিশে ওই পাইপলাইনের আবেদন করা হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর পতেঙ্গা মেইন ইনস্টলেশনের মধ্যে পাইপলাইনটি স্থাপন করা হয়। পাইপলাইনটিতে এখনো অপারেশন শুরু হয়নি। কিন্তু বিপিসির মহাব্যবস্থাপকের কার্যপত্রে পাইপলাইনের বিষয়টি নিয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ নেই।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে রিফাইনারি দেওয়ার তোড়জোড়ের বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মীরজাফর ব্রিটিশদের হাতে দেশ তুলে দিয়েছিল। এখন এরা বেসরকারি অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে দেশ তুলে দিচ্ছে। আগে আওয়ামী লীগ সরকার ইআরএল-২ এস আলমের হাতে তুলে দিয়েছিল। এখন একই কাজ করা হচ্ছে, তবে লোক আলাদা। যাদের ওপরে এতবড় আমানত, তারা খেয়ানত করছে, এটার বিচার আল্লাহর ওপর দিলাম।’

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বেসরকারিতে রিফাইনারি করার জন্য এখনো পর্যন্ত সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

বিপিসির মিটিংয়ের বিষয়কে প্রক্রিয়াগত উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘ওরা (এসপিএল) আগেও আবেদন করেছিল। যে-ই আবেদন করবে, তারটাই মিটিংয়ে যাবে। এখানে কোনো টেন্ডার হবে না। যাদের ফ্যাসিলিটিজ আছে, তারাই আবেদন করতে পারে। যারাই আবেদন করবে, তাদের আবেদনগুলো বিপিসিতে পাঠানো হবে। আর কেউ আবেদন করলে তারটিতেও একই হবে।’

বিপিসি তড়িঘড়ি করে মিটিং করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তড়িঘড়ি করে কোনো মিটিং করার জন্য বিপিসিকে বলিনি। এখানে আমার নিজের কোনো প্রভাব নেই।’

সূত্র : জাগো নিউজ।