বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর। সেই লক্ষ্য পূরণে দেশের মাদরাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
বাংলাদেশ তার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী নিয়ে গর্ব করে। আমরা প্রায়ই বলি, এ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আমাদের তরুণ প্রজন্ম, আর তাদের হাত ধরেই আসবে তথাকথিত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুফল। কিন্তু এই সুফল কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। কেবল বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী থাকলেই কোনো দেশ সমৃদ্ধ হয় না।

সমৃদ্ধ হয় তখনই, যখন সেই তরুণরা আধুনিক অর্থনীতির উপযোগী জ্ঞান, দক্ষতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে।
এই প্রেক্ষাপটে চলতি সপ্তাহে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দেওয়া একটি তথ্য জাতীয় পর্যায়ে আরো বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে।
তিনি জানান, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ২৫ হাজার কওমি মাদরাসায় প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর পাশাপাশি ৯ হাজারেরও বেশি আলিয়া মাদরাসায় রয়েছে আরো প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী।
এ ছাড়া হাজার হাজার ইবতেদায়ি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির একটি বড় অংশ মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সেই বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুত করছি, যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আমরা দেখি?
সরকার বাংলাদেশকে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও সেবা খাতের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইলেকট্রনিকস, ওষুধ শিল্প, তথ্য-প্রুক্তি, লজিস্টিকস, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং অন্যান্য উন্নত খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্য রয়েছে। এসব লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও অর্জন করা অসম্ভব নয়।
কিন্তু শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিনিয়োগ টানে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন করেন। দেশে কি দক্ষ টেকনিশিয়ান পাওয়া যাবে? পর্যাপ্ত প্রকৌশলী আছেন? দক্ষ প্রোগ্রামার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর বা মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া সম্ভব? কর্মীদের কি ডিজিটাল দক্ষতা রয়েছে? তারা কি কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বিনিয়োগের পরিবেশ নির্ধারণ করে। এখানেই বাংলাদেশের সামনে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, কওমি মাদরাসায় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের কোনো সমন্বিত নীতি বর্তমানে নেই। ধর্মীয় পাঠ্যক্রম অক্ষুণ্ণ রেখে ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এটিকে বৃহত্তর সংস্কারের সূচনা হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। ঐতিহাসিক সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইসলামী পণ্ডিত তৈরি করে আসছে। ধর্মীয় শিক্ষার সমাজে গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে এবং তা ভবিষ্যতেও থাকবে।
তবে এটিও সত্য যে অনেক কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী দীর্ঘ বছর পড়াশোনা করেও আধুনিক শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায় না। উচ্চতর গণিত, পরীক্ষাগারভিত্তিক বিজ্ঞান, কম্পিউটার শিক্ষা, ব্যবসায় শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সঙ্গে তাদের পরিচয় সীমিত থাকে। ফলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। এটি তাদের মেধা বা আন্তরিকতার অভাবের কারণে নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ফল। এ ক্ষতি শুধু তাদের নয়, পুরো বাংলাদেশের।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স তুনিওন সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ কেবল আরো বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়; বরং শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার একই ধরনের দক্ষতার ঘাটতির কথা বলছে—যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে দ্রুত শেখার সক্ষমতা।
বর্তমান বিশ্বে এগুলো আর বিশেষায়িত দক্ষতা নয়; বরং মৌলিক কর্মদক্ষতা।
যে দেশে কোটি কোটি তরুণ এই দক্ষতা ব্যবস্থার বাইরে থাকে, সে দেশ কখনোই দক্ষ মানবসম্পদনির্ভর অর্থনীতি গড়তে পারে না।
অনেক মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ বহু আগেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছে। তুরস্ক ঐতিহ্যগত মাদরাসাব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ইমাম হাতিপ বিদ্যালয় চালু করেছে, যেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ভাষা ও সাধারণ শিক্ষা পড়ানো হয়। সৌদি আরবেও জাতীয় পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত ও আধুনিক ভাষা সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশকে অবশ্যই অন্য দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করতে হবে—এমন নয়। প্রতিটি দেশের ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন।
তবে একটি শিক্ষা গ্রহণ করা যায়—ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
এই আলোচনার আরেকটি দিকও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাকিস্তানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা-সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতা স্বাভাবিক এবং তা নিজেই কোনো সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞান, শিক্ষক ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য একসঙ্গে কাজ করে।
তবে শিক্ষা-সহযোগিতা কেবল জ্ঞান বিনিময়ের বিষয় নয়; এটি পাঠ্যক্রম, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই যেকোনো দেশের সঙ্গে এমন সহযোগিতা হওয়া উচিত স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং যথাযথ সরকারি তদারকির আওতায়।
বিশেষ করে যখন অংশীদার দেশ নিজেও শিক্ষা সংস্কার, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং সহিংস উগ্রবাদের উত্তরাধিকার মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের উচিত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এসব সহযোগিতা মূল্যায়ন করা। এটি কোনো দেশের প্রতি অবিশ্বাস নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, শিক্ষার মান এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উগ্রবাদ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কেবল নজরদারি নয়; বরং সুযোগ সৃষ্টি এবং মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করা।
যে তরুণের হাতে কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা, সম্মানজনক কাজ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ থাকে, সে বিভ্রান্তিকর বা চরমপন্থী মতাদর্শের প্রতি কম আকৃষ্ট হয়। বিপরীতে, দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত তরুণরা হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাবে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের বহু সমাজে দেখা গেছে এমন একটি বাস্তবতা।
তাই সমাধান কখনোই মাদরাসা শিক্ষাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা নয়। অধিকাংশ মাদরাসা শিক্ষার্থীই সৎ নাগরিক, আলেম, শিক্ষক, ইমাম এবং সমাজের সম্মানিত সদস্য হিসেবে গড়ে ওঠেন। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই একজন শিক্ষার্থী পড়ুক না কেন, সে যেন আধুনিক অর্থনীতিতে সফল হওয়ার মতো দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং গঠনমূলক নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে বের হতে পারে।
আসলে এই আলোচনা শুধু মাদরাসা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ সত্যিই কি দক্ষ মানবসম্পদভিত্তিক অর্থনীতি গড়তে চায়।
একদিকে আমরা জনমিতিক সুফলের কথা বলব, অন্যদিকে কোটি কোটি তরুণকে দক্ষতা উন্নয়নের মূলধারা থেকে বাইরে রাখব—এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দক্ষ কর্মশক্তির প্রতিশ্রুতি দেব, অথচ শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখব—এটিও সম্ভব নয়। একইভাবে অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের লক্ষ্য অর্জন করাও কঠিন হবে, যদি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাখাত জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সমন্বিত না হয়।
বাংলাদেশের এমন মাদরাসা স্নাতক প্রয়োজন, যারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একটি কারখানা, সফটওয়্যার কম্পানি, ব্যাংক, হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর বা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন এবং কখনো মনে করবেন না যে তাদের শিক্ষা তাদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। এটাই হওয়া উচিত আমাদের জাতীয় লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ কি এমন একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে, যেখানে কোটি কোটি তরুণ দেশের দক্ষতা বিপ্লবের বাইরে থেকে যাবে?
একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়তে আগ্রহী দেশের জন্য এর উত্তর হওয়া উচিত স্পষ্ট—না।









