সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানব জীবনে বিচারের মানদণ্ড এবং দায়বদ্ধতা ইসলামী আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিগুলোর একটি হলো: ‘দায়বদ্ধতা জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত।’ মানুষ আগে জানবে, তারপর সে দায়িত্বশীল হবে। অচেতন, অক্ষম, অথবা অজ্ঞানতার আবরণে ঢাকা অবস্থাকে ইসলাম কখনোই বিচারযোগ্য আচরণ হিসেবে গণ্য করে না।
এই নীতির সবচেয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় হাদিসে বর্ণিত সেই তিন শ্রেণির মানুষের প্রসঙ্গে, যাদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘তাদের ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে’ অর্থাৎ শরীয়ত তাদের উপর কোনো পাপ-দোষ আরোপ করে না।
সুনানে আবু দাউদের কিতাবুল হুদুতে এসেছে-

عَنْ أَبِي ظَبْيَانَ، قَالَ هَنَّادٌ الْجَنْبيُّ: قَالَ: أُتِيَ عُمَرُ بِامْرَأَةٍ قَدْ فَجَرَتْ، فَأَمَرَ بِرَجْمِهَا، فَمَرَّ عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، فَأَخَذَهَا فَخَلَّى سَبِيلَهَا، فَأُخْبِرَ عُمَرُ، قَالَ: ادْعُوا لِي عَلِيًّا، فَجَاءَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، فَقَالَ: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، لَقَدْ عَلِمْتَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ، عَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَبْلُغَ، وَعَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ المَعْتُوهِ حَتَّى يَبْرَأَ، وَإِنَّ هَذِهِ مَعْتُوهَةُ بَنِي فُلَانٍ، لَعَلَّ الَّذِي أَتَاهَا وَهِيَ فِي بَلَائِهَا، قَالَ: فَقَالَ عُمَرُ: لَا أَدْرِي، فَقَالَ عَلِيٌّ عَلَيْهِ السَّلَام، وَأَنَا لَا أَدْرِي
যিবয়ান (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, হান্নাদ আল-জানবী বলেছেন: একদা এক যেনাকারিনীকে উমার (রা.)-এর নিকট হাযির করা হলে তিনি তাকে পাথর মেরে হত্যার আদেশ দেন। এসময় আলী (রা.) ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ছেড়ে দিলেন।
উমার (রা.) এ সংবাদ পেয়ে আলী (রা.)-কে ডেকে পাঠান। আলী (রা.) তার নিকট এসে বলেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন প্রকার লোকের ওপর থেকে কলম তুলে রাখা হয়েছে—(১) নাবালেগ, যতক্ষণ না বালেগ হয়, (২) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয় এবং (৩) পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ হয়। আর এ তো অমুক গোত্রের পাগলিনী। সে যা করেছে, সম্ভবত উম্মাদ অবস্থায় তা করেছে।
বর্ণনাকারী বলেন। উমার (রা.) বলেন, আমার বিষয়টি জানা নেই। অতঃপর আলী (রা.) বলেন, আমিও জানতাম না।(আবু দাউদ, হাদিস : ৪৪০২)
ইসলামী ফিকহ এই হাদিসটিকে ‘الأساس الشرعي لرفع المسؤولية’—দায়বদ্ধতা-অবসানের শরঈ ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
(১) নাবালেগ; যতক্ষণ না বালেগ হয়
ইসলামের আইন শিশুকে বিচারযোগ্য বিবেচনা করে না।
কারণ শিশুর মন, বিচারবুদ্ধি, নৈতিক উপলব্ধি; সবই পরিপূর্ণতার অপেক্ষায় থাকে। শিশু ভুল করলেও সেটিকে নৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না।
ইমাম নববী রহ. বলেন: “শিশুর উপর কোনো নামাজ, রোজা বা শাস্তিযোগ্য অপরাধ প্রযোজ্য নয়; কারণ তার জ্ঞান এখনো পূর্ণ হয়নি।” (শারহ্ মুসলিম লিন নববী)
পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে:
وَلَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
‘আমি কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দিই না।’ (সূরা আল-আন‘আম, আয়াত : ১৫২) এ আয়াত শিশুর মানসিক অক্ষমতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই শরীয়ত শাস্তি নয়, বরং নৈতিক শিক্ষাই শিশুর জন্য সঠিক পথ বলে মনে করে।
(২) ঘুমন্ত ব্যক্তি; যতক্ষণ না জাগ্রত হয়
ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ জ্ঞানশূন্য থাকে। তার কোনো কাজকে ইচ্ছাকৃত বলা যায় না। তাই ইসলাম বলেছে, ঘুমন্ত অবস্থায় কোনো পাপ বা দায়িত্ব জন্মায় না। ইবনুল কাইয়্যিম রহ. ব্যাখ্যায় বলেন:
“الأحكام إنما تتعلق بالمكلفين، والعقل هو آلة التكليف، فإذا زال العقل زال التكليف.”
“হুকুমগুলো মূলত মুকাল্লাফদের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর বুদ্ধিই দায়িত্ব আরোপের মাধ্যম। বুদ্ধি না থাকলে দায়িত্বও বিলুপ্ত হয়।” (ই‘লামুল মুওয়াক্কি‘ইন, প্রথম খন্ড পৃষ্ঠঅ ১১৩-১১৪)
শরীয়ত বাস্তবাদী; তাই মানুষের প্রকৃত অবস্থা স্বীকার করে নিয়ে বিধান দেয়। ফলে কেউ ঘুমের ঘোরে কথা বললে, শপথ নিলে বা তালাক দিলে তা কার্যকর হয় না। এটি ইসলামী আইনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
(৩) উন্মাদ বা মানসিক অক্ষম ব্যক্তি; যতক্ষণ না সুস্থ হয়
এই অংশটি হাদিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের কর্মকাণ্ড ইসলাম কোনো অবস্থাতেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না। উপরে বর্ণিত হাদিসের ঘটনাটি এরই স্পষ্ট প্রয়োগ।
আলী (রা.) যখন উমর (রা.)-কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই নারী মানসিক বিকারগ্রস্ত, তাই তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। তখন উমর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। এটি ইসলামের বিচারপ্রক্রিয়ার এক অনন্য উদাহরণ।
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন:
“والمجنون لا يلزمه حكم حتى يفيق.”
“উন্মাদের ওপর কোনো হুকুম (দায়/শাস্তি) বাধ্যতামূলক হয় না, যতক্ষণ না সে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।” (আল-উম্ম, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৮৬)
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যতা
মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির অপরাধবোধ, নিয়ন্ত্রণশক্তি ও বিচক্ষণতা হ্রাস পায়। এটি আধুনিক বিজ্ঞান স্বীকার করেছে। তাই ইসলাম যে ১৪০০ বছর আগে থেকেই মানসিক রোগীর দায় অবসানের নীতি দিয়েছে, এটি তার মানবিকতার উজ্জ্বল দলিল।
তিন ব্যক্তির উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে”- এই হাদিস কেবল একটি আইনি নীতি নয়; বরং ইসলামের মানবিকতা, বাস্তববাদ, এবং গভীর ন্যায়বোধের বহিঃপ্রকাশ। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম শাস্তি দিতে নয়, সংশোধন করতে চায়; কঠোর হতে নয়, বরং মানুষের সীমাবদ্ধতাকে বুঝে ন্যায় দিতে চায়।
এই নীতি আজও মুসলিম বিচারব্যবস্থার জন্য এক চিরপ্রাসঙ্গিক আলো; যা সমাজকে ভুল দোষারোপের অন্ধকার থেকে বাঁচিয়ে ন্যায় ও করুণার পথ দেখায়।









