অর্থ ও বাণিজ্য

যেভাবে বদলে যাচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্যের নিয়ম-কানুন

নিউজ ডেস্ক৩ মে ২০২০৪ মিনিট পড়া

বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন থেকেই প্রথম করোনাভাইরাস শুরু হয়। এর ফলে শিল্প কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়। ভ্রমণ, দোকান পাট এবং বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম থিম পার্ক বন্ধ হয়ে হয়। চলাফেরায় ফেস মাস্ক বাধ্যতামুলক করা হয় এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এখন ক্রমান্বয়ে খুলতে শুরু করেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও লকডাউন শিথিল করে অর্থনীতির কিছু অংশ খুলে দিতে শুরু করেছে। কম্পানিগুলো শুরুর দিকে কারখানা বন্ধ করে দিলেও এখন তারা নতুন নতুন ধারণা কাজে লাগিয়ে কাজে নেমেছে। যা অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও বড় শিক্ষণীয় হতে পারে।

চীনের পরিস্থিতিতে কম্পানিগুলো কিভাবে ব্যবসা চালাচ্ছে তা উঠে এসেছে ওয়াল স্ট্রিটের এক বিশ্লেষণে। নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছে নিক, স্টারবাকস ও ডিজনের মতো কম্পানিগুলো। নিক জানায়, চীনের সংকটের উল্টোপিঠে তারা দেখেছে এবং ব্যবসা বাণিজ্যের ভালো উপায় শিখেছে। যা অন্যান্য দেশগুলোও অনুস্বরণ করতে পারে। এ সপ্তাহে গাড়ি কম্পানি ফক্সভাগেন যখন জার্মানির ওফসবার্গে তাদের বৃহৎ কারখানাটি খুলে দিল তারা জানাল, চীনের ৩৩ কারখানার ৩২ টিতে যেভাবে ব্যবসা শুরু করেছে সে অভিজ্ঞতাই কাজে লাগাচ্ছে।

ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, কম্পানিগুলো নতুন যে কৌশল গ্রহণ করছে তাতে জীবন আগের মতো স্বাভাবিক হবে না। কিন্তু আমরা যেখাবে কাজ করি, কেনাকাটা করি এবং ব্যবসা বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা করি এ সংকট তা স্থায়ীভাবে বদলে দেবে। আইবিএম চায়নার সিইও অ্যালেইন বেনিচো বলেন, ‘এটাই হচ্ছে নতুন স্বাভাবিকতা। এ মুহুর্তে আমরা যেভাবে কাজ করছি তাতে বদলে যাবার অনেক আহবান আছে।’

উদ্ভাবন ও ব্যবসা বাণিজ্যে উদীয়মান অনুশীলন নিয়ে কাজ করেন ডেসপিনা ক্যাটসিক্যাকিস। যিনি বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট ফার্ম কুশম্যান ও ওয়াকফিল্ডের একজন অংশীদার। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী কম্পানিগুলোকে আহবান জানিয়েছে কাজে ফেরার জন্য। তারা ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি কর্মীকে কাজে ফিরতে সহায়তা করেছে। ক্যাটসিক্যাকিস এর মতে- ‘এ সংকট আমাদের কাজের ধরণ শুধু বদলে দেয়নি, কারখানার কর্মপরিবেশে আমাদের এক দশক এগিয়ে দিয়েছে। যা আমরা ভবিষ্যতে গ্রহণ করতাম।’

প্রতিষ্ঠানটি এখন আশা করছে এ পরিবর্তন থেকে তারা লাভবান হবে। তারা গ্রাহকদের জন্য ভিজ্যুয়াল গাইড তৈরি করছে। যারা নাম দেয়া হয়েছে ‘ছয় ফুট অফিস’। আমস্টারডামে কুশম্যান ও ওয়াকফিল্ডের অফিসে একটি ‘জীবনযাপন ল্যাবরেটরি’ করা হয়েছে। যেখানে চীন ও পুরো বিশ্বের কারখানাগুলোতে কাজকর্মের নতুন নতুন রীতি, ব্যবসায়ী ও কর্মীদের প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয় সন্নিবেশিত করা হচ্ছে এবং নতুন ধারণা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। ক্যাটসিক্যাকিস জানান, এ ল্যাবের মূল উদ্দেশ্যে হচ্ছে মানুষকে সমাধান নিয়ে ভাবতে আগ্রহী করে তোলা। কিভাবে সামাজিক দূরত্ব রক্ষাকে একটি আবশ্যকীয় কাজে পরিণত করবে, কিভাবে কারখানা ভবন প্রস্তুত করতে হবে, এবং মানুষকে সত্যিকার অর্থে ভিন্ন ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে তোলা।

নতুন এ আচরণ ও রীতি অনুযায়ী একজনের ডেস্কের সঙ্গে অন্যজনের দূরত্ব হবে ছয় ফিট। পুরো বছর ধরেই স্বাস্ব্যকর্মীরা এ ব্যাপারে মানুষদের উপদেশ দিচ্ছে এ দূরত্ব বজায় রাখতে। যাতে ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা যায়। কর্মীদের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে ঘড়ি ধরে একপথে হাটতে। সবাই একই গতিতে। যাতে কারো গায়ে কেউ না লাগে। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে আমরা স্বাস্থ্যকর পরিবেশের দিকে যাচ্ছি।’

তিনি জানান, আগামী কয়েকবছরে অফিসে প্রবেশের ক্ষেত্রে আর স্পর্শ প্রযুক্তি থাকবে না, সেখানে জায়গা নেবে সেন্সর। অফিসে প্রবেশে এন্টি পাস ব্যবেহারের বদলে ব্যবহার করতে হবে চেহারা সনাক্তকরণ ক্যামেরা বা নিজের ফোনে কিউআর কোড। এছাড়া অফিস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, জীবাণুমুক্ত রাখা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও কম্পানিগুলো বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

কম্পানির বৈঠক বা সভা সরাসরি না হয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হবে। সবাই নিজের সিটে বসে বা বাসায় বসে তাতে যোগ দেবেন। যারা বাসায় বসে কাজ করা সম্ভব হবে তাদের বাসায় কাজ করার সুযোগ দেয়া হবে। এতে কম্পানির খরচ কমবে, একইসঙ্গে করোনার ঝুঁকিও কমবে।

করোনায় মাইক্রোসফটের এটারপ্রাইজ সফটওয়্যারের ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। মাইক্রোসফট-৩৬৫ এর করপোরেট ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যারর্ড স্প্যাটেরো বলেন, আমাদের ম্যাসেজ ও ভিডিও কনফারেন্স পোগ্রাম বর্তমানে প্রতিদিন ব্যবহার হয় ৭৫ মিলিয়ন। এর ব্যবহার একমাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৭০ শতাংশ।
অন্যদিকে অনলাইন কেনাকাটাতেও মানুষ আরো বেশি আগ্রহী হচ্ছে। খেলার সামগ্রী বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিক জানায়, তাদের অনলাইন বিক্রি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তিনমাসের ব্যবধানে চীনে তাদের বিক্রি বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

দীর্ঘ লকডাউনের ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া বিঘ্ন হচ্ছে প্রায় প্রতিটি দেশেই। উৎপাদন প্রক্রিয়া এভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ রাখার ফলে অর্থনৈতিক মন্দা দ্রুত বাড়ছে। অটোমেটেশনের মাধ্যমে উৎপাদন ও গ্রাহকের দ্বারপ্রান্তে সরবরাহের প্রচেষ্টা করা হবে আগামীতে। এর মধ্যেই চীনের আলিবাবা, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজন অটোমেটেড সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে চীন এবং অন্য দেশগুলো অটোমেশন প্রক্রিয়াকে দ্রুত গ্রহণ করবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন না ঘটে।

 

সুত্রঃ কালের কণ্ঠ