আন্তর্জাতিক

মার্কিন সৎকার কেন্দ্রে মিলল ৫৬ পচনধরা মরদেহ

নিউজ ডেস্ক৮ আগস্ট ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর একটি সৎকার কেন্দ্রে ৫৬টি মরদেহ ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি মরদেহ বিভিন্ন মাত্রায় পচে গিয়েছিল।

এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের কর্তৃপক্ষ।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিকাগোর সাউথ শিকাগো চ্যাপেলে এসব মরদেহ পাওয়া গেছে। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালকের লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে।

ঘটনাটি আরো গুরুতর হয়ে উঠেছে। কারণ, সাউথ শিকাগো চ্যাপেলের সঙ্গে যুক্ত এক দম্পতি আগে একটি মরদেহ দাহ করার প্রতিষ্ঠান চালাতেন। সেখানেও ঠিকভাবে রাখা হয়নি এমন মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল। দাহ করার পর পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়া শত শত মানুষের দেহাবশেষও সেখানে পাওয়া যায়।

পরে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার কয়েক মাস আগে স্থানীয় বাসিন্দারা সাউথ শিকাগো চ্যাপেল থেকে তীব্র দুর্গন্ধ আসার অভিযোগ করেছিলেন। পরে সেখানে পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

কুক কাউন্টি মেডিকেল পরীক্ষকের কার্যালয় জানিয়েছে, ইলিনয় অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্মকর্তারা তাদের জানান, সাউথ শিকাগো চ্যাপেলে ৫৬টি মরদেহ ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। এরপর বৃহস্পতিবার সেখানে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মরদেহ পরীক্ষার বিশেষজ্ঞদের পাঠানো হয়।

তারা মরদেহগুলোর অবস্থা পরীক্ষা করছেন। একই সঙ্গে মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার নথি এবং মৃত্যুসনদও খোঁজা হচ্ছে। মেডিকেল পরীক্ষকের কার্যালয় জানিয়েছে, মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানো হবে।
পুলিশ শুক্রবার জানায়, এ ঘটনায় আগে দেওয়া একটি বিবৃতিতে ভুল তথ্য ছিল। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, দমকল বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলকে বিপজ্জনক পদার্থের ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। পরে পুলিশ জানায়, এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে শিকাগো পুলিশ জানিয়েছে, গোয়েন্দারা ঘটনাটি তদন্ত করছেন। সৎকার কেন্দ্রটির বক্তব্য জানতে শুক্রবার ফোনে এবং প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

 

শুক্রবার সৎকার কেন্দ্রটির বাইরে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা এবং স্বজনদের বিষয়ে তথ্য জানতে আসা মানুষ জড়ো হন। ৫৫ বছর বয়সী লাতাশা জনসন জানান, বৃহস্পতিবার ওই সৎকার কেন্দ্রে তার মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরে কর্তৃপক্ষ সেখানে যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, সেখানে বেশ কিছু মরদেহ পাওয়া গেছে। জনসন বলেন, কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, তার মায়ের মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে হবে। এক বা দুই দিনের মধ্যে তাকে নিজের মায়ের মরদেহ শনাক্ত করতে হতে পারে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, ‘আমি কী করব বুঝতে পারছি না। আমার হৃদয় ভেঙে গেছে।’ নিজেকে এলাকার একজন সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্লেইজ ফন ব্রুখহয়জার বলেন, কয়েক মাস ধরেই ওই সৎকার কেন্দ্র থেকে ভয়াবহ দুর্গন্ধ বের হওয়ার অভিযোগ ছিল। এরপর সেখানে পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়ার বিষয়টি খুবই কষ্টদায়ক। ইলিনয়ের ব্যবসায়িক নথি অনুযায়ী, সৎকার পরিচালক ইয়োহানা মরগান ২০২২ সালে সাউথ শিকাগো চ্যাপেল ইনকরপোরেটেড প্রতিষ্ঠা করেন।

বুধবার তার সৎকার পরিচালকের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। ইলিনয় আর্থিক ও পেশাগত নিয়ন্ত্রণ বিভাগ জানিয়েছে, মরগানকে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে দেওয়া হলে তা জননিরাপত্তা, জনস্বার্থ ও মানুষের কল্যাণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ কারণেই তার লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। বিভাগটি আরো জানিয়েছে, মরগান একাধিক মৃত ব্যক্তির মরদেহ ফ্রিজ ছাড়া একটি খারাপ অবস্থার জায়গায় রেখেছিলেন। সেখানে ইঁদুরের উপদ্রবও ছিল। ফলে মরদেহগুলো পচে যায় এবং তাতে পোকামাকড়ের লার্ভা জন্ম নেয়। অঙ্গরাজ্যের ব্যবসায়িক নথিতে ক্লার্ক মরগানের নাম সাউথ শিকাগো চ্যাপেলের সভাপতি হিসেবে রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি ইয়োহানা মরগানের স্বামী।

 

ইলিনয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ক্লার্ক মরগানের সৎকার পরিচালকের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও লাইসেন্স ছাড়া কাজ করা এবং ‘অপেশাদার আচরণের’ অভিযোগে তার লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তবে সেই আচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ইলিনয়ের নিয়ন্ত্রক সুসানা মেন্ডোজা শুক্রবার জানান, ইয়োহানা ও ক্লার্ক মরগান এর আগে শিকাগোর দক্ষিণে শিকাগো হাইটস এলাকায় একটি মরদেহ দাহ কেন্দ্র পরিচালনা করতেন। সেই প্রতিষ্ঠানেও কর্তৃপক্ষ ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা মরদেহ এবং পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়া শত শত দাহ করা দেহাবশেষ পেয়েছিল। এসব ঘটনার পর গত বছর প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

এক বিবৃতিতে মেন্ডোজা বলেন, আবারও একটি ভয়াবহ ঘটনা সামনে এসেছে। তিনি বলেন, সাউথ সাইডের একটি সৎকার কেন্দ্রে দাফনের অপেক্ষায় থাকা পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়া যাওয়ার ঘটনা হৃদয়বিদারক এবং অত্যন্ত নিন্দনীয়। তিনি আরো বলেন, ‘এরা মানুষ—কারও মা, বাবা, বোন, ভাই, সন্তান বা বন্ধু। তাদের আরো ভালো আচরণ পাওয়ার অধিকার ছিল।’ কুক কাউন্টির আদালতের নথিতে ইয়োহানা ও ক্লার্ক মরগানের নাম হাইটস ক্রিমেটরি-সংক্রান্ত একটি মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছে।

 

শুক্রবার মরগান দম্পতির জন্য সরকারি নথিতে দেওয়া ফোন নম্বরগুলোতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাদের ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে নথিতে যে আইনজীবীর নাম রয়েছে, তার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, মরগান দম্পতি শিকাগোর উপশহর এভারগ্রিন পার্কে বসবাস করেন। গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের মরদেহ ও দেহাবশেষ ঠিকভাবে সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনা না করার বেশ কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে।

গত মাসে কলোরাডোর পুয়েবলোতে পুলিশ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে একটি সৎকার কেন্দ্রের গোপন দরজার পেছনে পাওয়া অন্তত ২৪টি পচে যাওয়া মরদেহ ও অন্যান্য দেহাবশেষ ঠিকভাবে না সামলানোর অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে জর্জিয়ার একটি সৎকার কেন্দ্রে বিভিন্ন মাত্রায় পচে যাওয়া ১৮টি মরদেহ পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে কলোরাডোর একটি ভবনে প্রায় ২০০টি পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়া যায়। একই বছর ইন্ডিয়ানার একটি সৎকার কেন্দ্র থেকেও ৩১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শিকাগোর সাউথ শিকাগো চ্যাপেলে পাওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করতে এখন তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের স্বজনদের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।