ধর্ম

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও আল্লাহর পরিকল্পনা

নিউজ ডেস্ক৪ মার্চ ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, মানুষের মধ্যকার নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে সরাসরি মানবিক মূল্যবোধ অধঃপতনের কারণে।

বর্তমান বিশ্ব অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আধ্যাত্মিক বা নৈতিক অবক্ষয়, নৈরাজ্যবাদী কর্মকাণ্ড, মানসিক বৈকল্য, যৌন বিপথগামিতা, অ্যালকোহল ও ড্রাগ আসক্তি, জীবিকা নির্বাহের অত্যধিক চাপ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিনোদন, সাম্প্রদায়িকতা, উপনিবেশিকতা, রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ, ক্ষমতার লড়াই, নিউক্লিয়ার অস্ত্র বানানোর নেশা, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি। এসব সমস্যা ও পতনের অমানবিক যন্ত্রণা বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের মন ও মননকে বিষময় করে তুলছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো বর্তমানে ধর্মীয় নির্দেশনা, বিভিন্ন মতবাদ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ঈর্ষণীয় উন্নতি মানব সমাজের এই অধঃপতনকে রুখতে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

ইসলাম, এর আসমানি কিতাব কোরআন—যা এখন থেকে সাড়ে ১৪০০ বছর আগে নাজিল হয়েছিল, মানুষের নৈতিক ও মানবিক মর্যাদার কার্যকর বিধান প্রণয়ন করেছিল। এরই আলোকে মহানবী (সা.) এবং সাহাবিরা সভ্যতার সামনে মানবিক মর্যাদাপূর্ণ সমাজের একটি চিরস্থায়ী মডেল উপস্থাপন করেছিলেন। কোরআনের এই শিক্ষাগুলো শুধু দার্শনিক যুক্তিনির্ভরই ছিল না, বরং ইসলামের সমগ্র ধারণা ও বিধি-বিধান ছিল জীবনের বাস্তবতার নিরিখে প্রবর্তিত।

মহানবী (সা) তার জীবনে ইসলামের প্রতিটি বিধান বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। আর এ জন্যই আল্লাহ তাআলা নবীজিকে উদ্দেশ্য করে সুরা কলমের ৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি উত্তম আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’

প্রকৃত অর্থে মহানবী (সা.) ছিলেন একজন সত্যিকার আদর্শ মানুষ, যিনি তাঁর আদর্শ বাস্তবায়ন করে আগামীর মানবসভ্যতার জন্য একটি সর্বোত্কৃষ্ট মডেল উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবিক অর্থে তিনি ছিলেন মানবতার স্বপ্নদ্রষ্টা।

মহানবী (সা.) তাঁর শিক্ষার মাধ্যমে ‘কিভাবে বাঁচতে হবে’ তার নমুনা পেশ করে গেছেন। নবীজির নবুয়তের মূল কথা ছিল মানবিক চরিত্রকে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত করা। আর সেই অবস্থান মানব সমাজের ইতিহাসে পর্যায়ক্রমে আরো শাণিত ও উচ্চকিত হয়েছে। এভাবে ইসলামী আদর্শ ও ইসলামী সমাজের মডেল সভ্যতাকে একটি সঠিক গতিপথ দিতে সক্ষম হয়েছিল।

মানুষ সৃষ্টির সময় থেকে আল্লাহ তাআলা মানুষের মর্যাদাকে অনেক ওপরে স্থান দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা প্রথম মানব আদম আলাইহিস সালামকে জ্ঞান ও মর্যাদার দিক থেকে ফেরেশতার চেয়েও উচ্চ বলে ঘোষণা করেছেন। তাই মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের মাটির তৈরি আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করার হুকুম দিয়েছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা বাকারার ৩৪ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘তারপর আমি যখন ফেরেশতাদের আদেশ দিলাম, আদমের সামনে নত হও, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই নত হলো।’ এর আগে মানুষ সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, ‘আমি দুনিয়াতে আমার খলিফা সৃষ্টি করতে চাই।’ এভাবে মহান প্রভু মানুষকে খলিফা বা আল্লাহর প্রতিনিধির মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। তা ছাড়া মানুষের অবস্থানকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া এবং এর বৈষয়িক মূল্যের চেয়েও বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ মানুষ হলো আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত। সুরা আল-ইসরার ৭০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।’

মানুষের মূল্য কতটা বেশি তার উপমা দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা সুরা আল মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন, ‘যে একজন মানুষকে বাঁচালো, সে যেন পুরো মানবজাতিকে বাঁচালো।’ মানুষের সীমাহীন মর্যাদার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অন্য মুসলমানের জন্য হারাম। (সহিহ বুখারি)

মানবজাতিকে সমগ্র সমাজের মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছে ইসলাম। কোরআনে সুরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে চিনতে পারো।’

সুরা বাকারার ২১৩ আয়াতে আল্লাহ আরো বলেন, ‘সব মানুষ এক জাতি ছিল।’

মানবজাতি একটি উৎস থেকে সৃষ্টি হয়েছে, এ কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা সুরা আন-নিসার ১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন, ‘তিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।’ মানুষ যেহেতু এক জাতি, তাই তাদের সমাজও একটি আদর্শের ভিত্তির ওপরই প্রতিষ্ঠিত থাকা বাঞ্ছনীয়। সমগ্র মানবজাতি মিলে একটি ‘আন্তর্জাতিক সমাজ’ প্রসঙ্গে এর বৈশিষ্ট্যগুলো আল্লাহ তাআলা সুরা আল-মুমিনুনের প্রথম দিকের আয়াতগুলোতে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘১. সফল হয়েছে মুমিনরা, ২. যারা তাদের সালাতে বিনীত, ৩. যারা আত্মোন্নয়নে থাকে সক্রিয়, ৪. যারা নিজেদের যৌন জীবনকে করে হেফাজত, ৫. নিজেদের স্ত্রী এবং অধিকারভুক্ত দাসীদের ছাড়া, তাতে তারা হবে না তিরষ্কৃত, ৬. কিন্তু যারা এ ছাড়া অন্য কাউকেও কামনা করবে, তারা অবশ্যি গণ্য হবে সীমা লঙ্ঘনকারী বলে, ৭. আর তারা রক্ষা করে নিজেদের আমানত ও অঙ্গীকার. ৮. তা ছাড়া তারা যত্নবান থাকে তাদের সালাতের প্রতি, ৯. এরাই হবে ওয়ারিশ, ১০. তারা ওয়ারিশ হবে ফেরদাউসের এবং সেখানেই হবে তারা চিরস্থায়ী।’

ওপরের আয়াতগুলোতে মানুষের সফলতার জন্য বড় দাগে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, বিশ্বাসীদের দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার জন্য তার এক আল্লাহর ওপর ঈমানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা তাকে ভালো কাজের দিকে পরিচালিত করবে। দ্বিতীয়ত, তার কার্যকারিতার জন্য সৎকাজকে শর্ত হিসেবে আরোপ করা হয়েছে। এই সৎ বা পুণ্য কাজ নিঃসন্দেহে মানুষের চরিত্র গঠন এবং একটি পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এই দুইয়ের যথাযথ কার্যকারিতা ইসলামের দুটি মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর তা হলো আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করা ও বিচার দিবসের ওপর বিশ্বাস করা। এই বিশ্বাসের ফলে মানুষ তার মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও দুনিয়ার কোনো শক্তির বলয় থেকে নিজেকে মুক্ত করে। আর মানুষকে এই ধারণায় বদ্ধমূল করে যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর চেয়ে কোনো কিছুই বড় নয়। তখন বিশ্বাসীরা ভালো কাজ করতে সক্ষম হয়, যদিও তারা এর সব ফল এই দুনিয়ায় নাও পেয়ে থাকে। তাদের বিশ্বাস, অন্তত আখিরাতে সে তার ভালো কাজের ফল অবশ্যই পাবে।

এভাবে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহর পরিকল্পনা হচ্ছে, ভালো কাজের মাধ্যমে মানুষকে এই সুযোগ দান করা, যাতে সে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন লাভ করতে পারে। আর এই সমৃদ্ধ জীবনযাপনের কৌশল মানুষ সৃষ্টির পর থেকেই অনুসরণ করে আসছে। প্রকৃত পক্ষে এটি মানুষের প্রতি মহান আল্লাহর একটি করুণা, যার ফলে মানুষ মানবিক মর্যাদাপূর্ণ জীবন লাভ করতে সক্ষম হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, সাবেক ডিএমডি ইসলামী ব্যাংক ও এএমডি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক