সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ বড় ধরনের অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করেছে। এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ জব্দ করা ও ওইসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনি কাঠামো প্রয়োগ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য মানি লন্ডারিং আইন প্রয়োগের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও ওইসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা এবং নীতি ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় সমন্বয় কমিটির এক বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে এই অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে এপিজি সরকারকে সব ধরনের কারিগরিক সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকাণ্ড তদারকি করে এপিজি। সংস্থাটির বিভিন্ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেছে।
এপিজির মিউচ্যুয়াল ইভাল্যুয়েশনবিষয়ক পরিচালক ডেভিড শ্যানন ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, এপিজি মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কৌশলগত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ভিজিটের আওতায় বাংলাদেশের অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে। তিনি অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও বিভাগ কর্তৃক অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের পদক্ষেপগুলো মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে তিনি আরও জানান, প্রায়ই মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে তথ্য আদান-প্রদান বিষয়ে বিশেষ করে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও রাষ্ট্রগুলো থেকে সহযোগিতামূলক আচরণ পাওয়া যায় না। তথ্য আদান-প্রদানের অসহযোগিতার বিষয়টি এপিজি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে থাকে এবং এসব রাষ্ট্রের মিউচ্যুয়াল ইভুাল্যুয়েশনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। যেসব দেশ তথ্য আদান-প্রদান করছে না এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- দুবাই, হংকং ও সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো।
তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে অনেক রাষ্ট্র তথ্য আদান-প্রদানে সক্রিয় রয়েছে। এ লক্ষ্যে তিনি পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, সরকার মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অঙ্গীকারবদ্ধ। মিউচ্যুয়াল ইভাল্যুয়েশনের পরবর্তী ফলোআপে বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন ট্রাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) সুপারিশে রেটিংয়ের পদ্ধতি উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে রিপোটির্ং এজেন্সির জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, তত্ত্বাবধান, সন্ত্রাসে অর্থায়ন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কার্যক্রম, মামলা পরিচালনা, সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এছাড়া সব সফল কার্যক্রমের পাশাপাশি সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কতিপয় অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যেমন স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, মিউচ্যুয়াল ইভাল্যুয়েশনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত ৯৯টি অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিগুলোর মধ্যে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা জারি, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে জাতীয় কৌশলপত্র ২০১৯-২০২১ প্রণয়ন, জাতীয় ঝুঁকি নিরূপণ রিভিউ, ঝুঁকিভিত্তিক সুপারভিশন ম্যানুয়াল প্রণয়ন, রিপোর্টিং এজেন্সির জন্য বিষয়ভিত্তিক গাইড লাইন প্রণয়ন, ফিট অ্যান্ড প্রপার গাইড লাইন প্রণয়ন এবং এনজিও খাত পর্যালোচনা উল্লেখযোগ্য।
সূত্র জানায়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ সংশোধন কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে কার্যকর তদন্তের জন্য সরকার একাধিক অভিযোগের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে যৌথ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউটরদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থা কর্তৃক বিভিন্ন খাতে দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
গত বছরগুলোতে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাস কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও সমন্বয় জোরদার হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ও গোয়েন্দা তথ্য শেয়ারের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বেড়েছে- যা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সক্ষমতা বেড়েছে।
বৈঠকে বলা হয়, বাংলাদেশ দুর্নীতিবিষয়ক অপরাধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করছে। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা হচ্ছে। সম্পত্তি জব্দ করা, বাজেয়াপ্ত করা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং এ সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একইভাবে শুল্কসংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রেও মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইন এবং বিধিমালার আওতায় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও এর কার্যকর ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তবে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা এবং স্বতন্ত্র প্রসিকিউশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো গতিশীল ও কার্যকর করতে পদক্ষেপ গ্রহণে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।









