সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানুষের জীবনে বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট কিংবা আকাঙ্ক্ষা পূরণের আশায় অনেকেই বিভিন্ন ধরনের মান্নত করে থাকে। বিশেষ করে সমাজে একটি প্রচলিত রীতি হলো-মৃত ব্যক্তিদের মাজারে গিয়ে টাকা-পয়সা, বিভিন্ন পশু, মোমবাতি, তেল বা অন্যান্য বস্তু মান্নাত হিসেবে প্রদান করা। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এ কাজের হুকুম কী-তা জানা অত্যন্ত জরুরি। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ কোনো ‘বাহিরাহ’ (ঐ জন্তুকে বলা হত, যার দুধ দোহন করা হত না এবং বলা হতো যে, এ দুধ প্রতিমার জন্য), ‘সা-ইবাহ’ (ঐ জন্তুকে বলা হয়, যাকে মূর্তির নামে স্বাধীন ছেড়ে দেওয়া হত), ‘ওয়াসিলাহ’ (ঐ উটনীকে বলা হত, যা প্রথমবার একটা মাদী বাচ্চা প্রসব করার পর দ্বিতীয় বারেও মাদী বাচ্চা প্রসব করত) বা ‘হাম’ (ঐ ষাঁড় উটকে বলা হত, যার বীর্যে বহু বাচ্চা জন্মলাভ করত তখন তার দ্বারা বোঝা বহন করা হত না এবং তার উপর আরোহণ করাও হত না) প্রবর্তন করেননি।
বরং যারা কুফর করে, তারা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে। আর তাদের অধিকাংশই বুঝে না।’ (সুরা : মাইদাহ, আয়াত : ১০৩)

এগুলি ঐ সকল পশুর বিভিন্ন নাম, যা আরবের বাসিন্দারা তাদের প্রতিমার নামে উৎসর্গ করত। তখন আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে স্পষ্ট করে দেন যে, আল্লাহর নামে মনগড়া ইবাদত বা প্রথা চালু করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
তাই মাজারকেন্দ্রিক মান্নতও তেমনই একটি ভিত্তিহীন প্রথা, যার কোনো শরয়ি অনুমোদন নেই। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)
ইসলামী ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে, ‘মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে মান্নাত করা, কিংবা তাদের নৈকট্য লাভের আশায় মাজারে অর্থ, মোম, তেল ইত্যাদি প্রদান করা সর্বসম্মতভাবে বাতিল ও হারাম। কারণ, মান্নত একটি ইবাদত, আর ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্ধারিত। কোনো সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদত করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
আরেকটি কারণ হলো, যার কাছে মানত করা হয় সে মৃত, এবং মৃতদের কোনো কিছুর মালিকানা থাকে না। অধিকন্তু, যদি কেউ বিশ্বাস করে যে মৃত ব্যক্তির আল্লাহর বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষমতা রয়েছে, তবে এই বিশ্বাস করা কুফরের শামিল। তাই কেউ যদি বিপদে পড়ে বা কোনো প্রিয়জন অসুস্থ হলে বলে, ‘অমুক পীর সাহেব, আমার কাজটি হয়ে গেলে আমি আপনাকে এত কিছু দেব।’ শরিয়তের দৃষ্টিতে এটা সম্পূর্ণ বাতিল। কারণ এটি আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
(তাহতাওয়ি আলাদদুর, খন্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৭১, রাদ্দুল মুহতার-যাকারিয়া, খন্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৪২৭, কারতাশি, খন্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৩৯, ফাতাওয়া হিন্দিয়্যা, খন্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২১৬)
এছাড়া, মাজারে যে জিনিসপত্র মান্নত হিসেবে রাখা হয়, সেগুলোর ব্যবহার সম্পর্কেও শরিয়তের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। এসব জিনিস ব্যবহার করা জায়েজ নয়। কারণ, এগুলো যিনি রেখে গেছেন, প্রকৃতপক্ষে তার মালিকানাই বহাল থাকে, শরিয়তসম্মতভাবে তা কারো জন্য হালাল হয়ে যায় না। অন্যের সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া গ্রহণ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমানের জন্য তার ভাইয়ের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা বৈধ নয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ২৩৬০৫)
তাই মাজারে মান্নাত করা জিনিসপত্র অন্য কেউ ব্যবহার করা বৈধ নয়, বরং তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। অতএব, মাজারে মান্নাত করা এবং সেখানে কোনো কিছু উৎসর্গ করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। একজন সচেতন মুসলমানের উচিত-সব ধরনের ইবাদত, দোয়া ও মান্নত একমাত্র আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যেই করা। তবেই সে সঠিক আকিদা ও বিশুদ্ধ আমলের পথে থাকতে পারবে।









