সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
রাসুল (সা.) এমন এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল মমতা, সৌজন্য ও উদারতার অপূর্ব সমন্বয়। বিশেষ করে তার আতিথেয়তা ছিল অতুলনীয়। তিনি অতিথিকে সম্মান করতেন নিজের পরিবারের সদস্যের মতো, কখনো নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রেখে অতিথির প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতেন।
তার ঘর ছিল সরল, কিন্তু হৃদয় ছিল অপরিসীম উদার—যেখানে ধনী-গরিব, পরিচিত-অপরিচিত সবাই পেতেন ভালোবাসা ও সম্মান।

এমনকি তার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাইতো মহানবী (সা.) ঘোষণা করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানের সমাদর করে।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭৯)
সালমান ফারসি (রা.) বলেন, একবার আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে এলাম। একটি বালিশে হেলান দিয়ে তিনি বসা ছিলেন।
আমাকে দেখে তিনি বালিশটি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। বললেন, ‘সালমান, যখন কোনো মুসলমান তার ভাইয়ের কাছে আসে, তখন তার সম্মানে যদি একটি বালিশও সে এগিয়ে দেয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (হায়াতুস সাহাবা, পৃষ্ঠা : ৪৪৬)
সর্বজনীন আতিথেয়তা :
রাসুল (সা.)-এর আতিথেয়তায় শর্তের কোনো বেড়াজাল ছিল না। ধনী-দরিদ্রের তফাত ছিল না।
মুসলিম-অমুসলিমের তারতম্য ছিল না। শত্রু-মিত্রের কোনো ফারাক ছিল না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে অলিমায় শুধু ধনীদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং গরিবদের বাদ দেওয়া হয়, তা সবচেয়ে নিকষ্ট খাবার।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৭৯৯)
সাহাবি রুশদ ইবনে আবদুর রহমান বলেন, ‘ইসলাম গ্রহণের আগে আমি রাসুল (সা.)-এর মেহমান হয়েছিলাম। তিনি আমার খোঁজখবর নিলেন।
তার কাছে আমাকে বসালেন। যতক্ষণ আমি তার কাছে ছিলাম ততক্ষণ তার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম। তার এই অসাধারণ আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হয়ে আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।’ (হায়াতুস সাহাবা, পৃষ্ঠা : ৪৪৭)
শত্রু যখন অতিথি :
আরবের মুহারিব গোত্র খুবই উগ্র ও কট্টর ইসলামবিরোধী ছিল। ইসলামের মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে যখন মানুষ দলে দলে মদিনায় আসতে লাগল, তখন মুহারিব গোত্রেরও ১০ জন লোক মদিনায় এলো। রাসুল (সা.) তাদের অভ্যর্থনা-আপ্যায়নের জন্য বেলালকে (রা.) দায়িত্ব দেন। সকাল-বিকেল তাদের আহারের সুব্যবস্থা করেন। এতে তারা মুগ্ধ-বিস্মিত হলো এবং ইসলাম গ্রহণ করে নিজ দেশে ফিরে গেল। (আসাহহুস সিয়ার, পৃষ্ঠা : ৪৪৪)
তিনি অতিথির অসৌজন্যতায় ধৈর্যধারণ অতিথিদের নানা দুর্ব্যবহারে সহনশীলতার পরিচয় দিতেন। তাদের অসৌজন্যতা নীরবে সয়ে যেতেন। ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিতেন তাদের। একটু কটুবাক্যও তিনি কখনো বলতেন না। অন্যদেরও কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। এক গ্রাম্য লোক নবী (সা.)-এর কাছে এলো। হঠাৎ সে মসজিদে নববীর ভেতরেই প্রস্রাব করতে লাগল। সাহাবায়ে কেরাম তাকে বাধা দিতে গেলে রাসুল (সা.) বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। তোমরা কঠোর হওয়ার জন্য নয়, বরং নম্র ব্যবহারের জন্য প্রেরিত হয়েছ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২২০)
মেহমানের খাতির-যত্ন ও আদর-আপ্যায়ন :
অতিথির আদর-আপ্যায়ন ও খাতির-যত্নে রাসুলের কোনো সংকোচবোধ ছিল না। তিনি মেহমানের সঙ্গে একই পাত্রে বসে খেতেন। মেহমান তৃপ্তিসহকারে খেয়ে না ওঠা পর্যন্ত তিনি উঠতেন না, বসে থাকতেন। ভালো খাবারগুলো মেহমানের দিকে এগিয়ে দিতেন। নিজের পরিবারকে অভুক্ত রেখে তিনি মেহমানদের খাওয়াতেন। মক্কা বিজয়ের পর মদিনায় অতিথির কোনো অভাব ছিল না। রাসুল (সা.) নিজেই তাদের খেদমত আঞ্জাম দিতেন। আর সাহাবি বিলালকে (রা.) রাষ্ট্রীয় মেহমানদের বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন। (সীরাতুন নবী, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৫০৪)
বিদায়কালে উপহার প্রদান :
বিদায়কালে রাসুল (সা.) মেহমানদের পথখরচ ও উপহার দিতেন। কখনো পর্যাপ্ত উপহার দিতে না পারলে অল্প হলেও দিতেন এবং মেহমানের কাছে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কামনা করতেন। কখনো বিশেষ সাহাবিকে বলে দিতেন, যাতে তিনি তাদের পথখরচ দিয়ে দেন। অন্যান্য উপহার তো থাকতই। বিশেষত যখন কেউ তার কাছে উপহার নিয়ে আসতেন তখন তিনি তা গ্রহণ করতেন এবং তাকে বিদায়কালে নিজের পক্ষ থেকে অবশ্যই উপহার দিতেন। হারিস ইবনে আউফের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল রাসুলের মেহমান হলো। বিদায়কালে রাসুল (সা.) তাদের প্রত্যেককে ১০ উকিয়া পরিমাণ রুপা দিলেন। সাহাবি হারিসকে দিলেন ১২ উকিয়া পরিমাণ। (আসাহহুস সিয়ার, পৃষ্ঠা : ৪৪৩)
প্রিয়নবী (সা.)-এর আতিথেয়তা মুসলমানদের অনুপম আদর্শ। আধুনিক যুগেও এসব সুন্নাহই আভিজাত্যের নিদর্শন। আজকের ব্যস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনে তার এই আদর্শ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—অতিথিকে সম্মান করা শুধু একটি সুন্দর অভ্যাস নয়, বরং এটি মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি আমরা তার এই গুণকে নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের সমাজ আরও সহানুভূতিশীল, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও মানবিক হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।









