সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১০ বছরে বেশ জোরাল হয়েছে। তারপরও ৫টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- কর্মসংস্থানহীনতা, শ্রমিক ও পেশাজীবীদের দক্ষতার ঘাটতি, আয়বৈষম্য, সারা দেশে প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টনের অভাব এবং শিল্পের অবকাঠামোগত স্বল্পতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকা রয়েছে। তবে এর আগে সরকারকে সঠিক নীতি গ্রহণ করতে হবে।
রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে শনিবার বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সেমিনারে মূল প্রবন্ধে সংগঠনটির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ এসব কথা বলেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। আলোচনায় অংশ নেন সংসদ সদস্য সেলিমা আহমাদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইয়াসু ইজুমি।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, প্রতিবছর চাকরির বাজারে ২২ লাখ মানুষ প্রবেশ করছে এবং তা ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। এর বিপরীতে ২০১৮ সালে ১৬ লাখ মানুষ চাকরি পেয়েছে। যুবকদের বেকারত্বের হার ক্রমেই বাড়ছে। শ্রমিক ও পেশাজীবীদের দক্ষতায়ও প্রচুর ঘাটতি আছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। জিডিপিতে এ দুই শহরের অবদান যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ ও ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। ৮০ শতাংশ উৎপাদনশীল শিল্প এ দুই শহরে অবস্থিত। তবে অনেক সম্ভাবনাও আছে। যেমন ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৭৬ শতাংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে। ১৫-৩০ বছর বয়সীদের সংখ্যা ৫ কোটি। উর্বর জমি, বিদ্যুতের সন্তোষজনক উৎপাদন ও ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি, চামড়াজাত পণ্য, হালাল খাদ্য, সমুদ্র অর্থনীতি ও আইটি খাতে রফতানির প্রচুর সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে সারা দেশে প্রচুর কর্মসংস্থান করা সম্ভব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ব্যবসায় অনেক সমস্যা ও সম্ভাবনা আছে। ব্যবসায়ীরা বিচ্ছিন্নভাবে সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। কিন্তু তা সমাধান হয় না, শুধু সেমিনারে আলোচনাই হয়। তাই বিডা, এনবিআর, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করা দরকার। যেখানে ব্যবসায়ীদের সব সমস্যা শোনার পাশাপাশি একাধারে সমাধানও দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা তৈরি পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থান থেকে সরে তৃতীয় অবস্থানে এসেছি। এটা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয় কিছু পদক্ষেপ নিলে আবারও দ্বিতীয় স্থানে পৌঁছানো যাবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইয়াসু ইজুমি বলেন, ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে উন্নতি করতে হলে বিদ্যমান দেশি-বিদেশি শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। ট্যাক্স-ভ্যাট ইস্যুগুলো সমাধান করতে হবে। এক্ষেত্রে জাপান সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে, ১৬৮তম। সূচকের অগ্রগতির জন্য বিডা সরকারের প্রতিটি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। আগামী বছর সূচকে বড় উন্নতি হবে বলে আশা করছি। এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এইচএসবিসি তাদের পূর্বাভাসে বলেছে, বাংলাদেশ হবে দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। তাহলে ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে পিছিয়ে থাকলে তো ক্ষতি হচ্ছে না। এ সূচক তৈরির সময় বিশ্বব্যাংক কিছু উন্নতি সরাসরি গ্রহণ করতে চায় না, তারা অনুমানকে গ্রহণ করে। যেমন একটি সূচকে মাইনরিটি ইনভেস্টমেন্টকে সুরক্ষা দেয়ার কথা বলা আছে, বাংলাদেশে তো এ ধরনের বিনিয়োগকারীদের সমস্যা হচ্ছে না। আবার ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি ও ট্যাক্স পরিশোধ সূচকে যে নম্বর দেয়া হয়েছে, তাতেও দুর্বলতা আছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে পিছিয়ে আছি রিপোর্টিংয়ের কারণে। অর্থাৎ আমরা ছাত্র ভালো; কিন্তু লেখার ধরন বুঝছি না। অনেক ক্ষেত্রে শুধু রিপোর্টিংয়ের অভাবে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে অগ্রগতি অনেক। তিনি আরও বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগে বাধা। তবে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি করা হয়। আগামী দিনে ব্যক্তিপর্যায়ে এ চুক্তি করা হবে।
সংসদ সদস্য সেলিমা আহমাদ বলেন, বাজেটে স্টার্টআপদের জন্য ১০০ কোটি টাকা তহবিল রাখা হয়েছে। এ টাকার রোডম্যাপ কী? এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোক্তা টাকা পেয়েছে, নাকি এ ফান্ড নারী উদ্যোক্তাদের দেয়া ১০০ কোটি টাকার মতো হবে। তিনি আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ে অনেক খাস জমি আছে। এগুলো স্থানীয় মাস্তানরা দখল করে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করছে। এ জায়গাগুলোকে ছোট ছোট অর্থনৈতিক অঞ্চল করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দেয়া যেতে পারে।
বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার কারিকুলাম নির্ধারণ করা উচিত। তা না হলে প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। একটি ছেলে বা মেয়ে ৮ম-৯ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে যাতে দক্ষ শ্রমিক হয়ে উঠতে পারে, তা মাথায় রেখে কারিকুলাম করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও কী পড়ানো হচ্ছে, সেদিকে নজর দিতে হবে। অধিকাংশ অনার্স-মাস্টার্স পাস শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা নেই।
মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি রেজাউল করিম রেজনু, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাসান, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ।









